বিশ্ববিদ্যালয় ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা: সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট

Share this:

এই আলোচনাকে কেবল বাকস্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তরে লুকিয়ে থাকা ‘পরাধীনতা’র সন্ধান পাবো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর মধ্যে যে হুমকি রয়েছে সেদিকেও আমাদের নজর দেয়া দরকার। মনে রাখা দরকার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্নভাবে নিজেদের কাঠামোর জিনিসপাতি দিয়েই ‘চাকরিচ্যুতি’ ঘটানোর কাজটা সেরেছে। অন্যভাবে বললে, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কেবল হস্তক্ষেপ নয়, একে রীতিমতো শাস্তিযোগ্য আইনি অপরাধ হিসেবে দেখার যন্ত্রাদি এখানে উপস্থিত রয়েছে।

 

বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এতোটা খতরনাক অবস্থানে আগে কখনো পড়েছিল কি না জানা নেই; তবে এটা নিশ্চিত যে, অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গনে এই স্বাধীনতার এমন ‘অধীনতা’ পূর্বে কখনো ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান কাঠামোতে জ্ঞানজাগতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোনো অস্তিত্ব নেই- এ কথাগুলো তাত্ত্বিকভাবে বহুদিন ধরে অনেকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু গত কয়েক দিনে এর বাস্তবিক ও প্রায়োগিক কদর্য রূপ দেখার সৌভাগ্য ও দূর্ভাগ্য আমাদের হয়ে গেলো।

গত সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মার্কেটিংয়ের শিক্ষক মোর্শেদ হাসান খানকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে সংবাদ পত্রে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তিনি “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কটূক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত” করেছেন। সহজভাষায় বলা যায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে মত প্রকাশের দায়ে, যে মত তিনি প্রকাশ করেছেন সেটা কর্তৃপক্ষ নামধারী ব্যক্তিবর্গের নিকট সহি না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিষয়টা তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘পরিহাসের বিষয় যে বিশ্ববিদ্যালয় যে আইনের ধারায় তাঁকে চাকুরিচ্যুত করেছে সেটি তৈরি  হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্ত্বশাসন নিশ্চিত করতে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে। ঐ আদেশের ৫৬ ধারার ২ উপধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তার রাজনীতি করার তথা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। ঐ আইনে একজন শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করার বিধানও আছে, তাতে বলা হয়েছে একজন শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করা যাবে যদি তিনি নৈতিক স্খলনের  (মোরাল টার্পিচ্যুড) কিংবা দায়িত্ব পালনে অপরাগতার (ইনএফিসিয়েন্সি) অভিযোগে অভিযুক্ত হন (ধারা ৫৬, উপধারা ৩)। মো মোর্শেদ হাসান খান এই দুই অভিযোগের কোনটাতেই অভিযুক্ত হননি। ফলে এই চাকুরিচ্যুতি মতপ্রকাশের জন্যেই সেটা স্পষ্ট। এটি আইনের ‘লেটার’ এবং ‘স্পিরিট’ দুইয়ের বিপরীত।’ উল্লেখ্য, অধ্যাপক মোর্শেদের সঙ্গে তার লেখা যে দুই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তার দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। মোর্শেদ ভিন্ন ভিন্ন সমুয়ে ‘স্মৃতিময় জিয়া’ এবং ‘জ্যোতির্ময় জিয়া’ নামে দুটো লেখা লিখেছিলেন।

যদিও তার এই চাকরিচ্যুতির বিরুদ্ধে অনেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, অনেকে ‘অনাকাঙ্খিত’ বলে বর্ণনা করেছেন। এই নিবন্ধে তিনি যা লিখেছিলেন তার জন্য কিছু পরবর্তীতে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাও করেছিলেন। ফলে, প্রতিবাদকারীর একটা বড়ো অংশের দাবি হচ্ছে, ‘নিবন্ধটি প্রত্যাহার, দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা সত্ত্বেও’ কেন তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ফলে, যারা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারাও অনেক ‘যদি-তবে-কিন্তু’ দিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। একটা রাষ্ট্রের শিক্ষাঙ্গন মত প্রকাশের সবচেয়ে বড়ো স্বাধীন প্রাঙ্গন হওয়ার কথা ছিল। এই অধ্যাপক যদি তার প্রকাশিত মতের জন্য দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা নাও করেন, তবু তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যাবে না।

চাকরিচ্যুত বা বহিষ্কারাদেশ সংক্রান্ত আলাপ আলোচনা মূলত ঘুরপাক খাচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নিয়ে। ‘ইতিহাস বিকৃতি’ করা হয়েছে এই অভিযোগে কেউ কেউ আবার একে ‘মত-প্রকাশের স্বাধীনতা’ বর্গতেই ফেলতে চাচ্ছেন না। তাদের খায়েশ হচ্ছে ইতিহাসের সত্য মিথ্যা নির্ণয়ের ভার কখনো-সখনো আইনের হাতে তুলে দেয়া। যেহেতু ‘ইতিহাস বিকৃতি’ জড়িত সেহেতু অনেকেই চাকরিচ্যুতির প্রতিবাদ জানাতে ইতঃস্তত বোধ করছেন। কারণ, দেখা যাচ্ছে অধ্যাপকের প্রকাশিত মতের সাথে অনেকেই একমত নন। কিন্তু আমাদের জোরের সাথে বলা দরকার, আমি কারো মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো মানে তার প্রকাশিত মতকে সমর্থন করা না। আওয়ামীলীগ ফ্যাসিবাদের দালাল বুদ্ধিজীবীরা এই সমীকরণকে সরলভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন; যারা অধ্যাপকের মত প্রকাশের পক্ষে দাড়াচ্ছেন তাদেরকে সেই মতের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অধ্যাপক যে মত প্রকাশ করেছেন সেই মতের পক্ষে যুক্তি দাখিল করার দায় কেবল উনারই। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে তার মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো, এমনকি এই অধ্যাপক যদি এমন কিছু বলেন যার সাথে এক বর্ণও আমি একমত নই। বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার একেবারে প্রাথমিক বোঝাপড়া এটাই।

কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ফেইসবুকে ‘আপত্তিজনক’ মন্তব্য করায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক একেএম ওয়াহিদুজ্জামানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জানানো হয় যে, প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উক্ত শিক্ষকের অশালীন ও চরম আপত্তিজনক মন্তব্যের জন্য এবং তার নিরুদ্দেশ থাকার বিষয়টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বিধি অনুযায়ী তদন্ত প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ অনুসরণ করে ৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটর ২০৯তম সভায় ওয়াহিদুজ্জামানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

কিন্তু, এই ঘটনাগুলোর কোনোটাই অভূতপূর্ব বা বিচ্ছিন্ন নয়। করোনার সময়ে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিল। শাবিপ্রবি প্রশাসন মামলা করেছিল এই অভিযোগে যে, শিক্ষার্থীর ফেসবুক স্ট্যাটাসে নাকি খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানহানি হয়েছে।

কিন্তু, এই আলোচনাকে কেবল বাকস্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তরে লুকিয়ে থাকা ‘পরাধীনতা’র সন্ধান পাবো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর মধ্যে যে হুমকি রয়েছে সেদিকেও আমাদের নজর দেয়া দরকার। মনে রাখা দরকার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্নভাবে নিজেদের কাঠামোর জিনিসপাতি দিয়েই ‘চাকরিচ্যুতি’ ঘটানোর কাজটা সেরেছে। অন্যভাবে বললে, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কেবল হস্তক্ষেপ নয়, একে রীতিমতো শাস্তিযোগ্য আইনি অপরাধ হিসেবে দেখার যন্ত্রাদি এখানে উপস্থিত রয়েছে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই যে ‘স্বাধীনতার’ অনুপস্থিতি সেটাকে ক্ষণিক বা সাময়িক উপস্থিতিকে ভাবলে খুব ভুল হবে। ৭৩ এর অধ্যাদশকে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনতাকামী চরিত্রের অধিকারী বলে ভাবা হলেও এর স্বাধীনতার স্বরূপটাকে আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। কোন ধরণের স্বাধীনতা? ৭৩ এর অধ্যাদেশে যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় সেগুলোতে যা আছে তা হচ্ছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মোটেও কোনো জ্ঞানজাগতিক স্বাধীনতা নয়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলতে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের যোগ দেয়ার অধিকার। এখন যদি এই স্বাধীনতা না-ই থাকে তাহলে ‘জ্ঞানজাগতিক স্বাধীনতা রয়েছে’ এমন একটা অনুমান কীভাবে গড়ে উঠলো? ‘স্বাধীনতা’র অস্তিত্ব নিয়ে এমন কথা চাউর হইলো কীভাবে? সৈয়দ নিজার তাঁর ‘বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভব, বিকাশ ও বিউপনিবেশায়ন’ বইতে জানাচ্ছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসলে গবেষণা ও আলোচনা নেই বলেই রাজনৈতিক স্বাধীনতাকেই জ্ঞানজাগতিক স্বাধীনতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিও লিবারেল জমানায় এসে এর কদর্যরূপ বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ছে।

৭৩ এর অধ্যাদেশের মাধ্যমেই রাষ্ট্র দমনমূলক শুঁড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রবেশ করিয়ে রেখেছে এবং ভয়ংকর এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক জী-হুজুর ক্ষমতাকাঠামো নির্মাণ করেছে; তার বিস্তর বিবরণ আরিফ রেজা মাহমুদ দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন স্বাধীনতাহীনতা ও ক্ষমতাকাঠামোকে পাঠ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে উপাচার্যের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে কর্তৃত্ব-ক্রমতন্ত্র, এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগতভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনের জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি – অধ্যাদেশের এই তিনটি বিষয় দিয়েই ‘বিশ্ববিদ্যলয়ের স্বায়ত্বশাসন পরিণত হয় আয়ত্বশাসনে।’

এই ৭৩ এর অধ্যাদেশের ‘সৌভাগ্যবান’ চারটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেসব অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে এদের অবস্থা আরো করুণ; সেখানে জ্ঞানজাগতিক স্বাধীনতা দূরে থাক, রাজনৈতিক স্বাধীনতাও নেই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরির শর্তাবলীতে সরাসরি উল্লেখ করা আছে, ‘কোন শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য হইতে পারিবেন না।’ আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা নাই বললাম, কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করলে কর্তৃপক্ষ চাইলে চাকরিচ্যুতও করতে পারে। এর একটা জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্য করায়  শিক্ষকের চাকরিচ্যুতি। প্রাইভেটে তো চাকরিরই নিশ্চয়তা নেই।

ফলে সৈয়দ নিজার জানাচ্ছেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাবেই উপনিবেশের উত্তরাধিকার নয়, আইনিভাবেও উপনিবেশের উত্তরাধিকার।’

কিন্তু যে ‘গজবে’র উপস্থিতি আগে প্রত্যক্ষ ছিল না, সেটা এই রেজিমে দিবালোকের মতন স্পষ্ট হচ্ছে। এই দিক থেকে চিন্তা করলে এই রেজিমকে ধন্যবাদ দিতেই হয়; অন্তত মুখোশ সরিয়ে আসল চেহারাকেই আমাদের সামনে হাজির করেছে। জারি থাকা গজবের সাথে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ৫৭ ধারার মতো জিনিস। অনাগত দিনে আরো আরো যুক্ত হবে। তাই, বাংলাদেশে আসলে যে হাল দাঁড়িয়েছে তার সহজ সরল অনুমান হচ্ছে, এখানে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরণের জ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়। কেবল চর্বিতচর্বন ছাড়া। জ্ঞান উৎপাদনের প্রাথমিক উপাদান হচ্ছে ‘স্বাধীনতা’; এই স্বাধীনতা ব্যতীত সম্মিলিত জ্ঞান উৎপাদন অসম্ভব। মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা বাক স্বাধীনতা ছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা কোনো অর্থ বহন করে না।

তবে এতেও কিছু কিছু গবেষণা হতেই পারে। ব্যক্তি নিজের প্রচেষ্টায় কিছু কিছু গবেষণা করতে পারতেন। কিন্তু ব্যক্তির এমন বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাগুলো কেবল ‘সেলিব্রেট’ করা যাবে, তা দিয়ে জ্ঞানগত কোনো সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব না। তবে বাংলাদেশে নিওলিবারেল পুঁজির যে উলঙ্গ দৌরত্ব আমরা দেখতে পাই, তা কেবল কারখানাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর ভয়াবহ চাপ আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরনির্ভর-রাষ্ট্র সেই পুঁজি ও বাজারের বিরুদ্ধাচরণ করতে অপারগ; তাই দেখা যায় ব্যক্তি যদি নিজস্ব উদ্যোগেও গবেষণা চালিয়ে যান, এবং তা কোনোভাবে বাজারের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তার উপরে আইনি খড়গ নেমে আসতে পারে সহজে। যেমন, গতবছর দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষক তাদের অনুসন্ধান শেষে জানিয়েছিলেন, বাজার থেকে যেসব কোম্পানির পাস্তুরিত দুধ আমরা কিনে খাই, তাতে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই খবর দুধের বাজারে বেশ প্রভাব ফেলে। ফলে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরাও গবেষকদের হুমকি-ধামকি দেয়া শুরু করে দেন। রাষ্ট্রের কাছে গবেষণার ফলাফলের থেকে মুনাফাকেন্দ্রিক বাজারের কদর বেশি ছিল। আবার, করোনা মহামারির মডেলিং করার জন্য ব্র্যাকের শিক্ষকের ঘটনা তো সাম্প্রতিক। বাংলাদেশে করোনার ভয়াবহতা কেমন হতে পারে তার একটা পূর্বাভাস দিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন ব্র্যাকের এই শিক্ষকসহ দেশি-বিদেশী কয়েকজন গবেষক। নেত্র নিউজের তথ্যমতে, তাদের ‘রিপোর্টটিতে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ ভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমণ, চিকিৎসা ব্যবস্থায় এর চাপ এবং সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে পূর্বাভাষ ছিল।’ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানিয়েছিল। ফলে বাংলাদেশে সম্মিলিত জ্ঞান চর্চা দূরে থাক, ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাতেও জ্ঞান উৎপাদন বা চর্চা সম্ভব নয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে সবধরণের ‘স্বাধীনতা’র প্রকট অভাবের গল্পই হাজির করেছে। টেরি ইগলটনের একটা লেখা আছে, দ্যা স্লো ডেথ অফ ইউনিভার্সিটি নামে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় আসলে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে না, বরং এখনো শ্বাস নেয়ার জন্যই ছটফট করছে, জন্ম নেয়ার জন্য আকুতি মিনতি করছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমাদেরকেই বাঁচাতে হবে। এই লড়াই এখনই শুরু করতেই হবে। এই লড়াই আমাদের রাষ্ট্রকে ঠিক-ঠাক করার লড়াইয়েরই অংশ। এটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্বাস নেয়ার অধিকারের লড়াই, আমাদের শ্বাস নেয়ার অধিকারের লড়াই।

 

Sohul Ahmed, activist, and author. Topics of interest are politics, history, liberation war, and genocide. Published Books: Muktijuddhe Dhormer Opobabohar (2017), Somoyer Bebyocched (2019), and Zahir Raihan: Muktijuddho O Rajnoitik Vabna (2020)

 

 

 

More Posts From this Author:

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top