বেলার বেতার

Share this:

বেলার বেতার

১.
আমি এমন একটা সময়ের কথা বলছি যখন পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ মানুষ অদৃশ্য হয় গিয়েছিল, অদৃশ্য  হয়েছিল এই গ্যালাক্সির বহু দূরের এক সভ্যতার অবিমৃশ্যকারিতার জন্য। তবে সেই সভ্যতাকে যে পুরোপুরি দোষ দেয়া যায় এমন না। ওই সভ্যতা এতই উন্নত ছিল যে, তারা তাদের জৈবিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বদলেছিল দীর্ঘজীবী যান্ত্রিক অংশ দিয়ে, শুধু তাই নয় শেষ পর্যন্ত তারা তাদের মস্তিষ্ককে প্রতিস্থাপিত করেছিল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক সার্কিট দিয়ে। এটা তাদের শুধু দীর্ঘজীবীই করেনি, মহাকাশের শূন্যতায় সহজে ভ্রমন করার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারল যে, এই যান্ত্রিকতা তাদের সমস্ত সৃজন আর সমস্ত প্রাকৃতিক অনুভূতিকে হরণ করছে। তারা আবার তাদের জৈবিক উৎসে ফিরে যেতে চাইল, কিন্তু কয়েক হাজার বছর পরে তাদের উৎসের সমস্ত তথ্য হারিয়ে গিয়েছিল। তখন তারা গ্যালাক্সিতে জৈবিক উন্নত প্রাণের খোঁজ করা শুরু করল। এর জন্য তারা এমন একটি কোয়ান্টাম তরঙ্গ সৃষ্ট করে মহাশূন্য পাঠাল যা কিনা কোনো উন্নত সচেতন মস্তিষ্কের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করতে পারে, এবং সেই বিক্রিয়ার সংবাদ তাদের কাছে ফিরে আসতে পারে।

দুঃখের বিষয় পৃথিবীর উন্নত প্রাণের জন্য এই মিথষ্ক্রিয়া সুখকর হলো না। দেহ গঠনের জন্য মৌলিক কণাগুলোকে একটা কোয়ান্টাম সম্ভাব্যতার জগৎ থেকে বাস্তবে ক্রমাগতই রূপায়িত করতে হয়। গ্রহান্তরের সেই কোয়ান্টাম তরঙ্গ মানুষের মস্তিষ্কের তড়িৎচুম্বকীয় ভিত্তিভূমির সাথে এমনভাবে বিক্রিয়া করল যে, মৌলিক কণাগুলোর বাস্তবে রূপায়ণ বন্ধ হয়ে গেল। যে সব মানুষের দুর্ভাগ্য হলো সেই কোয়ান্টাম তরঙ্গের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ার তাদের শরীর আর পুনর্গঠিত হলো না, তারা বাস্তব থেকে অন্তর্হিত হলো। শুধুমাত্র যে সমস্ত মানুষ অপর একটি মানুষের দৃষ্টিগোচরে ছিল, কিংবা নিজেকে ক্রমাগতই ভিডিও করতে পেরেছিল শুধুমাত্র তারাই অদৃশ্য হলো না। কারণ সেই ক্ষেত্রে ওই কোয়ান্টাম তরঙ্গ অপর মানুষটির তরঙ্গ, কিংবা ভিডিও ক্যামেরায় ধারণকৃত ছবির ভবিষ্যৎ দর্শকের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকায় মূল মানুষটির দেহ গঠনের কণাগুলোর বাস্তবায়নে বাধা দিতে পারল না। এটাকে কোয়ান্টাম জিনো এফেক্ট বলা চলে।

যারা এই তরঙ্গ পাঠিয়েছিল তারা তাদের ভ্রান্তি বুঝতে পেরে সংকেত বার্তা বন্ধ করে দিলেও, আলোর গতিবেগের সীমাবদ্ধতার জন্য পাঁচ বছর লাগল পৃথিবীতে সেই তরঙ্গের ধ্বংসলীলা বন্ধ হতে। এই পাঁচ বছরে শুধুমাত্র যে অনেক মানুষ অদৃশ্য হলো তাই নয়, পৃথিবীর সমস্ত সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধসে পড়ল। আধুনিক রাষ্ট্র বলে যা ছিল তা আর রইল না, ছোট ছোট অপরাধী সংগঠন অধিকার করে নিল পাড়া, মহল্লা, ছোট বড় শহর, পুরো জেলা। আমাদের এই কাহিনি সেই পাঁচ বছর পার হবার পরের কাহিনি যখন ঢাকা শহর দখল করে ছিল কালো পতাকাবাহী এক চরমপন্থী দল যারা শহরটিকে আর পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে দিল না।

২.
এক তেরো-তলা দালানের চার তলায় একটি ফ্ল্যাটে থাকে নওশাদ, পুরো বিল্ডিং-এ আর কেউ নেই, তার উপস্থিতি কেউ জানে না। এরকম বহু বাড়ি জনশূন্য পড়ে আছে এই শহরে এখন। গত একবছর ধরে শহর থেকে বের হতে চাইছে সে, পারছে না। কালো-পতাকারা সবদিকে চেক পয়েন্ট বসিয়েছে, তার মতো অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সীদের হয় তাদের বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করছে, নয় মেরে ফেলছে। নওশাদ শুনেছে শহরের গণ্ডির অল্প বাইরে, নারায়ণগঞ্জের দিকে, কালো-পতাকাদের ক্ষমতা নেই। কিন্তু এই গ্রিন রোডের বাড়ি থেকে সে বেশি দূর যেতে পারে না। বাড়িটির পেছন দিকে একটা জানালার গ্রিল কেটে সে দড়ি ঝুলিয়েছে, সেটা ধরেই নামা ওঠা করে, সিঁড়ি ব্যবহার করে না, সদর দরজা দিয়ে যাওয়া আসা করে না।

পৃথিবীর এই দুর্যোগের আগে নওশাদ সাংবাদিক হিসেবে একটা টেলিভিশন স্টেশনে কাজ করত। সেই-ই প্রথম ওই অদৃশ্য-করা তরঙ্গের সতর্কবাণী প্রচার করে। এরপরে যখন সবাই অদৃশ্য হতে আরম্ভ করল সে নিজেকে ক্রমাগত ক্যামেরাতে ভিডিও করে বাঁচিয়ে রেখেছিল। শহরের আইন শৃঙ্খলার পতনের পরে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের কর্মীরা যার যার নিজের মতো কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চাইল, কিন্তু সেসব কিছুই টিঁকল না। স্থানীয় গুন্ডারা বড় দল করে বিভিন্ন এলাকা দখল করে নিল। আর শেষাবধি এল এই কালো-পতাকার দল। তারা এক কঠিন আদর্শে বিশ্বাস করত। পৃথিবীর এই দুর্যোগ যে তাদেরকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার জন্যই হয়েছে এই ছিল তাদের ধারণা, আর এই ধারণা তাদের এমনই শক্তি দিয়েছিল যা স্থানীয় গুন্ডাদের অরাজকতাকে সহজেই হার মানালো।

নওশাদ তার নিকট সবাইকে মারণ তরঙ্গে হারিয়েছিল, তার কোথাও আর ফিরে যাবার জায়গা ছিল না। স্থানীয় গুন্ডাদের সাথে সে একটা পারস্পরিক সমঝোতার মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, কিন্তু কালো-পতাকাদের সাথে সেরকম কিছু করা সম্ভব ছিল না, এখন সে শহর থেকে নিরাপদে পালাতে চাইছিল।

৩.
নওশাদের বড় দালানের পেছনে ‘কাঠালবাগান’ নামে পাড়াটায় আগে একটা বাজার বসত আগে, এখন সেই ধারণা উঠে গেছে। কালো-পতাকারা কোথাও কোনো জনসমাবেশ হতে দেয় না। তারা গাড়ি নিয়ে আসে এক এক জায়গায়, খাদ্য থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সেখানে থাকে, লোকজন লাইন দিয়ে তা কেনে। টাকা বলতে যা বোঝানো হতো তার পালা বহু আগেই সাঙ্গ হয়েছে, মানুষ মূল্যবান সম্পদের বিনিময়ে জীবন বাঁচানোর দ্রব্য পেত। নারীদের বাড়ির বাইরে বের হওয়া একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল, শুধুমাত্র এই সময়েই নারীদের সুযোগ দেয়া হতো বাইরে এসে জিনিস কিনবার। প্রহরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খেয়াল করে লোকদের মধ্যে তাদের দৃষ্টিতে সন্দেহজনক কেউ আছে কিনা। নওশাদের সেখানে যাবার প্রশ্নই ছিল না। তার বাড়ির পেছনে ছোট গলিগুলোতে অনেকে চাল-ডাল বিক্রি করে, তাদের কাছ থেকে সে খাবার কেনে। নওশাদ তার তেরো তলা বাড়ির বিভিন্ন ফ্ল্যাটে পরিত্যক্ত জিনিসগুলোর বিনিময়ে সেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনত।

এর মধ্যে একজন ছিল নিয়মিত বিক্রেতা, খাবার বিক্রেতা নয়, তার কাছ থেকে টুকিটাকি অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যেত। নওশাদের থেকে বয়সে অনেক বড়, বছর ষাট হবে, হয়তো অতীত জীবনে সে ছিল স্কুলের শিক্ষক কি সরকারি আমলা। পুরোনো জীবন নিয়ে কাউকে কেউ এখন প্রশ্ন করে না। তবে নওশাদ তার নাম জিজ্ঞেস করেছিল, ভদ্রলোক উত্তর দিয়েছিল, ‘সাউদাজি’। পরে নওশাদ জেনেছিল সেটা একটা পর্তুগিজ কথা যার অর্থ হলো ফেলা আসা কিছুর প্রতি আকাঙ্ক্ষা যা কিনা ফিরবে না, সেটা প্রেমসহ অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। এই সাউদাজির কাছ থেকে নওশাদ শুনেছিল যে,শহরের বাইরে একটা রেডিও স্টেশন আছে যেখান থেকে কালো-পতাকাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়।

তার বিল্ডিং-এর একটা ফ্ল্যাটে একটা পুরোনো ট্রানজিস্টর রেডিও নওশাদ খুঁজে পেয়েছিল, কিন্তু সেটার ব্যাটারি ছিল না। সাউদাজিকে ব্যাটারির কথা বললে সে কয়েকদিন সময় চাইল। মাসখানেক পরে ব্যাটারির খোঁজ মিলল, জাপানি ব্যাটারি, পুরোনো স্টকের, শহরের কোথাও কোনো পরিত্যক্ত বাড়িতে ছিল নিশ্চয়। কিন্তু রেডিওতে সেই স্টেশন খুঁজে পেল না নওশাদ, চীনা একটি স্টেশন অল্পবিস্তর শোনা যাচ্ছিল,মনে হলো তারা একই বার্তার পুনরাবৃত্তি করছে। এর পরে নওশাদ সিদ্ধান্ত নিল সে নিজেই একটি এ.এম. ট্রান্সমিটার বানাবে। এর জন্য আবার তাকে সাউদাজির শরণাপন্ন হতে হলো, এবং সাউদাজিও মাস দুয়েকের মধ্যে কিছু ইলেকট্রনিক চিপ, রেজিস্টর আর বৈদ্যুতিক তার জোগাড় করে দিল।

ট্রান্সমিটারের আরও কিছু অংশ আনতে সময় গেল, যাইহোক অবশেষে একটা ভালো এন্টেনা বসিয়ে কাজটা শেষ হলো, এবং রেডিওতে নিজের বার্তা ধরে নওশাদ তার ট্রান্সমিটার যে কাজ করে সেটাতে নিশ্চিত হলো। এর পরে শুরু হলো তার নতুন কার্যক্রম, প্রতিদিন প্রতিরাতে সে বেতার-বার্তা পাঠাতে শুরু করল, “হ্যালো, হ্যালো, কেউ কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? আমি ঢাকায় আটকা পড়েছি, আমি শহর থেকে বের হবার একটা নিরাপদ রাস্তার খোঁজ করছি।”

কালো-পতাকারা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সমস্ত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ নিষিদ্ধ করেছিল, তাতে বেতার, টেলিভিশন সবই ছিল, কিন্তু নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে তারা বেতার ব্যবহার করত। তবে নওশাদ তার বেতার বার্তা যে কালো-পতাকারা ধরতে পারবে সেই ভয় করত না। সে জানত যে, কালো-পতাকারা কারিগরি জ্ঞানের মূল্য সেরকম দেয় না এবং তারা তড়িৎ-চুম্বকীয় স্পেকট্রামকে নিয়মিত টহলও দিত না।তারা যে স্বয়ংক্রিয় বন্দুক, কামান, ট্যাঙ্ক এসব ব্যবহার করত সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, এর পরে তারা ছোরা, তরবারি এসব ব্যবহার করতে শুরু করেছিল।

৪.
অবশেষে এক গভীর রাতে, নওশাদ তার রেডিওতে শুনতে পেল, “হ্যালো, হ্যালো, যারা কালো-পতাকাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে চান তারা এই চ্যানেলটিতে কান পেতে রাখুন। কোড ১৬০ ১২০ ৮০ ৪০, রিপিট কোড ১৬০ ১২০ ৮০ ৪০, কোড ১৬০ ১২০ ৮০ ৪০, রিপিট। প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে বেলা আপাতত সাইন-অফ করছি।” একটি মিষ্টি নারী কন্ঠ, নওশাদের মনে হলো যেন স্বর্গীয় কোনো দড়ি কেউ তার হাতে তুলে দিল। সেই দড়ি ধরে সে এই শহর থেকে পালাতে পারবে।

নওশাদ সাথে সাথে তার ট্রান্সমিটার খুলে বার্তা পাঠাতে আরম্ভ করল, “হ্যালো, হ্যালো, বেলা, আমার নাম নওশাদ, আমি ঢাকায় আটকা পড়েছি, আমি শহর থেকে বের হবার একটা নিরাপদ রাস্তার খোঁজ করছি।” আধঘন্টা ধরে নওশাদ একই কথা বলে চলল, কিন্তু অন্যদিক থেকে কোনো সাড়া মিলল না। নওশাদ মনোক্ষুণ্ন হলো বটে, কিন্তু প্রতিরোধের রেডিও বার্তা যখন পাওয়া গেছে তার মানে সব হারিয়ে যায়নি। শহরের বাইরের মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, কালো-পতাকারা সব দখল করে নিতে পারেনি।

পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় নওশাদের। মাথার কাছে রাখা রেডিও থেকে শব্দ ভেসে আসে, “নওশাদকে বলছি, নওশাদকে বলছি। কোড ১৬০। কোড ১৬০”। এটুকুই। নওশাদ উল্লাসে চাপা চিৎকার দিয়ে ওঠে, তার বার্তা পৌঁছেছে, সে এখন একা নয়। কিন্তু ১৬০ মানে কী? নওশাদ রেডিওর ডায়াল ঘুরিয়ে ১৬০ কিলোহার্টজ কম্পাঙ্কে রাখে। পাঁচ মিনিট পরে বেলার কন্ঠ শোনা যায়, “নওশাদ, আপনাকে নদী পার হয়ে রোহিতপুর পৌঁছাতে হবে। ওইদিকে কালো-পতাকাদের চেক পয়েন্ট নেই।” নওশাদ তার প্রেরক যন্ত্রের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ঠিক করে একই তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বার্তা পাঠায়, “বেলা, আমার এলাকা থেকে বের হব কেমন করে?”

সারাদিন অপেক্ষা করে নওশাদ, কিন্তু কোনো উত্তর আসে না। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে নওশাদের মনে পড়ে তার কী করা উচিত, সে রেডিওর ডায়াল ঘুরিয়ে ১২০ কিলোহার্টজ বেছে নেয়। তারপর কয়েকবার “নওশাদ বলছি” বলে। ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগে রেডিও প্রাণ পায়। বেলার কন্ঠ, “আপনি সেন্ট্রাল রোডের পেছনের বাড়িগুলির মধ্য দিয়ে কাঁটাবন পার হবেন। আজিমপুর দিয়ে লালবাগে ঢুকবেন। নদী আপনাকে সাঁতড়ে পার হতে হবে রাতে।” নওশাদ রুদ্ধশ্বাসে বলে, “তারপর?” আবার সারাদিন নিস্তব্ধতা। সন্ধ্যায় নওশাদ ৮০ কিলোহার্টজে বার্তা পাঠায়, “নদীর ওপাড়ে কি প্রতিরোধ কমিটির কেউ থাকবে?” ভোরে বেলার কন্ঠ ভেসে আসে, “না আপনাকে ধলেশ্বরী পর্যন্ত হেঁটে আসতে হবে, আমি সেখানেই আছি।”

ব্যাটারিগুলোর চার্জ ফুরিয়ে যাচ্ছে। সাউদাজিকে নওশাদ অনুরোধ করল জরুরি ভিত্তিতে যদি ব্যাটারি কিছু পাওয়া যায়। এক সপ্তাহ সময় চাইল সাইদাজি। ওই রাতে বেলার সঙ্গে ৪০ কিলোহার্টজে সরাসরি কিছু কথোপকথন হলো নওশাদের।

“হ্যালো, বেলা, শহর থেকে কি আরও অনেকে বের হচ্ছে এই পথে?”

“আমি তো আপনাকে এই তথ্য দিতে পারব না।”

“আর আপনি, আপনি কি অনেকদিন ধরে যুক্ত প্রতিরোধের সঙ্গে?”

“হ্যাঁ, অনেকদিন, কালো-পতাকারা শহর দখল করে নেবার আগে থেকেই? ওরা যে নারীদের সব অধিকার কেড়ে নেবে সে তো আমি জানতামই।”

“কিন্তু অনেক নারীই তো প্রতিরোধে যোগ দেয়নি!”

“না দেয়নি, কারণ মানুষ অনেক ধরনের সমঝোতা করে, তারা বেঁচে থাকার জন্য নিজের সাথে একটা মীমাংসায় এসেছে।”

নওশাদ ভাবল তার কথায় বেলা অসন্তুষ্ট হয়েছে কিনা। সে বলল, “আমার ব্যাটারি ফুরিয়ে যাচ্ছে, ব্যাটারি পেতে আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগবে, আমাকে ভুলে যাবেন না।”

পরদিন ১৬০ কিলোহার্টজে কথা বলার সময় ব্যাটারি ফুরিয়ে গেল, বেলার শেষ কথা ছিল রোহিতপুরে একটি অর্ধ-সমাপ্ত চার তলা বাড়িতে তাকে পাওয়া যাবে। তার সাথে প্রতিরোধের আরও মানুষ আছে কিনা সেটা জানতে চেয়েছিল নওশাদ, বেলা উত্তর দিল না। নিরাপত্তার জন্য প্রশ্নটা করা হয়তো উচিত ছিল না, নওশাদ ভাবল।

৫.
চারদিনের দিন ব্যাটারি পেয়ে যায় নওশাদ। যাত্রার জন্য খাবারসহ দরকারি জিনিসপত্র একটা ব্যাকপ্যাকে ভরল। ট্রানজিস্টর রেডিওটা খুব ভারি না হলেও তার আকারটা তুলনামূলকভাব বড়, কিন্তু সেটাকে তো রেখে যাবার প্রশ্ন ওঠে না। সেই রাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে সে সেন্ট্রাল রোডের আর একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নেয়। গভীর রাতে ১২০ কিলোহার্টজে বেলার সঙ্গে কথা হয় তার।

“বেলা, অদৃশ্য তরঙ্গ আসার আগে কী করতেন আপনি?”

“তরঙ্গ আসার আগে? অন্য সবাই যা করত তাই?”

এই প্রশ্নটিও বেলা এড়ালো, হয়তো নিরাপত্তার জন্যই। নওশাদ জিজ্ঞেস করে, “যখন কালো-পতাকারা পরাজিত হবে তখন আপনি কী করবেন?” একটি মানুষের সঙ্গে সাধারণ কিছু কথা বিনিময়ের জন্য নওশাদ অস্থির হয়ে ছিল। বেলা সময় নেয় উত্তর দিতে, “আমি আবার গান করব। মন খুলে গাইব, আবার আগের মতো।”

“আগে কী গাইতেন?”

“আগে গাইতাম কিনা? সবাই যেরকম গায় সেরকমই গাইতাম।”

কালো-পতাকারা গান বন্ধ করে দিয়েছিল।

নওশাদের মনে হলো বেলা গুনগুন করছে, “নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগল…।”

দু’রাত পরে সে উঠে এলো লালবাগ কেল্লার কাছে আর এক পরিত্যক্ত বাড়িতে। বেলাই তাকে নির্দেশ দিয়েছিল কখন রাস্তায় বের হতে হবে, কোথায় কোথায় চেক পয়েন্ট থাকে, কীভাবে সেগুলো এড়ানো যাবে। এর দুদিন পরে রাতের আঁধারে নদী সাঁতরালো সে। সমস্ত কলকারখানা বন্ধ, কয়েক বছর ধরে নদীর জল ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক রঙ ফিরে পাচ্ছিল, কয়েক বছর আগের আলকাতরার মতো বর্জ্য প্রলেপ এখন নেই। নদীর এপারেও প্রচুর জনবসতি ছিল, মনে হলো কালো-পতাকার এদিকে খুব একটা আসে না, তবু স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস করে না নওশাদ। লোকালয় পার হয়ে যেতে অনেকটা সময় নেয়, এর পরে যদি কোনো বাধা না আসে সে এক রাতেই হেঁটে রোহিতপুর পৌঁছে যেতে পারে। দিনের বেলা সে আর একটি পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বেলা ঠিক জানত কোথায় সে উঠেছে।

“বেলা, কাল আপনার সঙ্গে দেখা হবে।”

“হ্যাঁ, কাল দেখা হবে।”

“আপনার কী মনে হয়, বেলা, আমি কীরকম দেখতে?”

“আপনি উচ্চতায় সাড়ে পাঁচ ফুট মতন, কালো চুল, ঘন ভুরু, টিকোলো নাক, থুতনিতে টোল।”

“বাহ, আপনার অনুমান তো বেশ ভালো। আমি তাহলে আপনাকে বর্ণনা করি।”

“বলুন।”

“আপনি পাঁচ ফুট তিন, কালো লম্বা চুল ছিল আপনার, এখন কেটে ফেলেছেন অনেকখানি। আপনি হাসলে গালে টোল পড়ে। আপনার গালের হাড় আপনার মুখকে একদিকে যেমন শ্রী অন্যদিকে তেমনই একটা কর্তৃত্বের রূপ দিয়েছে। প্রতিরোধের লোকজন আপনাকে মান্য করে। ঠিক বললাম কিনা?”

“কাল এলেই দেখতে পাবেন।” হাসে বেলা। তার হাসি শুনে নওশাদ কল্পনা করে নেয় তার গালের টোল।

৬.
রাত একটু ঘন হলে বেরিয়ে পড়ে নওশাদ। বিদ্যুৎ বহুদিন আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাতের আকাশ ওপরে ঝলমল করে। পৃথিবীতে বায়ুদূষণ কমে গেছে অনেক, কালপুরুষ হেলে পড়েছে একদিকে, লুব্ধক, আলদেবরন, কৃত্তিকা। সূর্য ওঠার সময়ই রোহিতপুর পৌঁছায় নওশাদ। ছন্নছাড়া অপরিকল্পিত কিছু বাড়ি, এর মধ্যে দশ তলা বিল্ডিংও আছে। উৎফুল্ল ছিল নওশাদের মন, প্রতিরোধের জায়গায় এসে পড়েছে সে। তবুও নদীর তীরে বেলা যে বাড়িটার কথা বলছিল সেখানে সে সোজাসুজি যায় না। রাস্তায় কিছু মানুষ বের হয়েছে, সে জানে না তারা আসলেই প্রতিরোধের প্রতি সহানুভূতিশীল কিনা। দ্রুত রাস্তা পার হয়ে সে নদীর দিকে চলে যায়, তারপর নদীর ধার ঘেঁষে বাড়িটার দিকে এগোয়। একটা জায়গা খুঁজে পায় যেখান থেকে সহজে বেলার বাড়িটি দেখা যায়। রেডিওটা বার করে সেদিনের কম্পাঙ্কে কাঁটাটা রাখে। ঘন্টাখানেক পরে বেলার কন্ঠস্বর শোনা যায়, “নওশাদ, আপনার তো এতক্ষণে পৌঁছে যাবার কথা। আপনাকে নিয়ে চিন্তা করছি।”

নওশাদ বাড়িটা থেকে কাউকে বার হতে বা ঢুকতে দেখে না। সবকটি জানালা বন্ধ। সামনের দিক থেকে ঢোকা কি ঠিক হবে? এই নিয়ে কোনো কথা হয়নি বেলার সাথে। বাড়িটির ওপর কি কালো-পতাকারা নজর রাখছে? আরও এক ঘন্টা পরে সে সিদ্ধান্ত নেয় নদীর দিক থেকে বাড়িটার দোতলায় উঠবার। এসব করতে এখন নওশাদ সিদ্ধহস্ত, তার ব্যাকপ্যাকে দড়ি ছিলই, কিন্তু এখানে দড়ি লাগল না, দেয়ালে উঠে লাফ দিয়ে জানালার নিচের সমতল জায়গাটা ধরে ছেঁচড়ে নিজেকে ওঠায় নওশাদ। জানালাটা পুরো কাচের, হাত দিয়ে আলো আড়াল করে নওশাদ ভেতরের দিকে তাকায়, হালকা বিন্দু বিন্দু আলো দেখা যায়। চোখটা সয়ে এলে মনে হয় পুরোনো দিনের বাক্সের মতো কম্প্যুটারে ঘরটা ভর্তি। তাহলে বেলা এখান থেকেই তার সাথে কথা বলে। নওশাদ জানালার কাচটা টানে, সেটা সরে যায়। চৌকো জানালার মধ্য দিয়ে গলে গিয়ে ঘরে লাফ দিয়ে ঢোকে সে। বেলা কোথায়?

ঘরটা থেকে বের হলে একটা করিডর, নওশাদ করিডর ধরে এগিয়ে দুপাশের ঘরগুলো দেখে। কোনোটা বন্ধ, কোনোটা খোলা। খোলা ঘরগুলোর ভেতরে যা ছিল তা মনে হয় বহু আগে লুট হয়ে গেছে। নিচের তলা আর তৃতীয়, চতুর্থ তলা আর ছাদ দেখে আবার দোতলার সেই যন্ত্রের ঘরে ফিরে আসে নওশাদ। পরিশ্রান্ত হয়েছিল সে, কিন্তু বুঝতে পারছিল না কেন বেলা সেখানে নেই। ব্যাকপ্যাক থেকে রেডিও আর ট্রান্সমিটারটা বার করে সে মেঝেতে রাখে। রেডিওটা চালু রাখে।

“হ্যালো, নওশাদ, শুনতে পাচ্ছেন। আপনি কোথায়?”

ধড়মড় করে উঠে বসে নওশাদ। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। ট্রান্সমিটারটা চালু করে সে বলে, “বেলা, আপনি কোথায়? আমি আপনার বাড়িতে অপেক্ষায় করছি।”

“আপনি এখানে? ও মা! দোতলায় চলে আসুন, সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাঁ-দিকে গেলেই প্রথম ডানদিকের ঘরটায় আমি আছি।”

নওশাদ উঠে ঘরের বাইরে যায়, সিঁড়ির কাছে এসে ফিরে আসে, বাঁ-দিকে গেলে প্রথম ডানদিকের ঘরেই সে এতক্ষণ ছিল। ফিরে আসে, বেলাকে বার্তা পাঠায়, “আমি সেই ঘরেই আছি, বেলা, আপনি আসুন।”

“আপনি এখানে? কিন্তু আপনাকে আমি তো দেখতে পাচ্ছি না।”

নওশাদ ধীরে ধীরে চোখ তোলে বড় বাক্সগুলির দিকে, সেখানে সারি সারি আলোর বিন্দু, সেগুলো জ্বলছে নিভছে।

“আপনাকে কেন দেখছি না, নওশাদ?” বেলার কন্ঠে ভয়। নওশাদ খেয়াল করল, বেলার কথা বলার সাথে সেই আলোর বিন্দুগুলোর উজ্জ্বলতা ওঠানামা করছে। সে একটা বাক্সের কাছে গিয়ে বলে, “বেলা, আপনি যে ঘরটা দেখছেন সেটি বর্ণনা করতে পারবেন?”

বেলা ঘরটার বর্ণনা করে, সেই ঘরটা ছিল সেই ঘরই যেখানে নওশাদ দাঁড়িয়ে ছিল। বেলার কন্ঠের সঙ্গে আলোগুলো ওঠানামা করে।

নওশাদ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ। বেলা বলে ওঠে, অধৈর্য গলা তার, “আপনি কথা বলছেন না কেন, নওশাদ?” নওশাদ কী বলবে ভেবে পায় না, তারপর ধীরে ধীরে বলে, “বেলা, আপনার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে?”

বেলা উত্তর দেয়, “এটা এখন কেন জিজ্ঞেস করছেন? আমার বাবা মা দুজনেরই সরকারি চাকরি ছিল, দুজনেই বিভিন্ন জেলায় ঘুরেছেন, আমি বড় হয়েছি ময়মনসিংহে, রংপুরে, বরিশালে।”

নওশাদ এবার বাক্সগুলো খুঁটিয়ে দেখে। নিখুঁত ধাতব কাজ, কালো মসৃণ তল, এক কোনায় কিছু লেখা, কিন্তু সেই লেখা সে পড়তে পারে না। এই বর্ণমালা সে আগে দেখেনি। সে জিজ্ঞেস করে, “বেলা, আপনি এই বাড়িতে কবে এসেছেন? আপনি কি এখানে আসার পরে বের হয়েছেন?”

“আমি ঠিক বলতে পারছি না কবে এসেছি, এটা তো আমার জানার কথা তাই না, কিন্তু মনে করতে পারছি না। আর আমি কি বের হয়েছি এই বাড়ি থেকে? তাও ঠিক বলতে পারছি না। আমি করিডরে হাঁটি, কিন্তু বাইরে যাই না।”

“আপনার খাওয়াদাওয়া আসে কোনখান থেকে?”

“প্রতিদিন একজন দিয়ে যায়।”

“তার সম্বন্ধে কিছু বলতে পারেন?”

“সে বাইরে খাবার রেখে যায়।”

“তাহলে কী খাবার খান?”

সময় নেয় বেলা, তার মনে করতে যেন কষ্ট হয়, “সালাদ, বার্গার।”

“এই ক’বছর একই খাবার খাচ্ছেন?”

“তাই তো, আগে এই নিয়ে ভাবিনি।”

“বেলা,” সাহস সঞ্চার করে বলে নওশাদ, “আপনার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই, আপনি একটি সচেতন কৃত্রিম মস্তিষ্ক।”

“কী যা তা বলছেন আপনি। আপনি কি কালো-পতাকাদের চর?”

“বেলা, মনোযোগ দিয়ে শুনুন, আপনার ঘরটার বর্ণনা আমি দিচ্ছি এখন।” নওশাদ ঘরটার কথা বলে, কালো বাক্সগুলোর কথা, আলোর সারির উজ্জ্বলতার কথা। আমি আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি, আপনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না, কিন্তু আপনার যান্ত্রিক বা জৈবিক মস্তিষ্কে কিছু স্মৃতি স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোই আপনি অনুভব করছেন।”

“আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না।”

“যদি না করেন, তবে হেঁটে এই ঘরের বাইরে যেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে শহরের রাস্তায় যান।”

“ঠিক আছে, আমি এই ঘরের বাইরে গেলাম, এখন করিডর দিয়ে হাঁটছি, এই তো সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে নামছি, কিন্তু, কিন্তু … এই সিঁড়ি তো কোথাও যায়নি, কেমন যেন শূন্যে মিলিয়ে গেছে।”

“আর আপনি, বেলা, এই যে বাইরে গেলেন আপনার বেতার বার্তা আমি কীভাবে শুনতে পেলাম, আপনি তো সাথে করে ট্রান্সমিটার নিয়ে যাননি।”

বেলা চুপ করে থাকে, নওশাদের মনে হয় একটা চাপা কান্নার শব্দ কোনো গভীর গিরিখাত থেকে ভেসে আসে। “এটা কেমন করে হলো?” অবশেষে বেলা জিজ্ঞেস করে।

ছ’বছর আগে গ্রহান্তরের আগন্তুকেরা পৃথিবীতে এসেছিল। তাদের অবিমৃশ্যকারিতার জন্য ক্ষমা চাইতে। কিন্তু আসলেই কি তাই? তারা জৈবিক সচেতন প্রাণের খোঁজ করছিল। তারা এতই উন্নত ছিল যে তাদের পক্ষে সবই সম্ভব ছিল, হয়তো বেলা তাদের জন্য একটা এক্সপেরিমেন্ট ছিল। পৃথিবীর জৈবিক সচেতন মস্তিষ্কের সাথে তাদের যান্ত্রিক সচেতন মস্তিষ্কের মিথষ্ক্রিয়া। এরকমই কিছু ভাবে নওশাদ। এরকমই কিছু বলে বেলাকে। শুধু বলে না যে, বেলা নামে হয়তো এক তরুণী ছিল যে বড় হয়েছে ময়মনসিংহে, রংপুরে, বরিশালে।

কান্নাটা থেমে যায়। বেলা বলে, “আপনাকে এখান থেকে এখন দ্রুত চলে যেতে হবে। আমি খবর পেয়েছি কালো-পতাকারা রোহিতপুরে আসছে। হয়তো ওরা আমাদের বেতার তরঙ্গ অবশেষে ধরতে পেরেছে। দুটো বাড়ি পরে একটা নৌকো তীরে উঠানো আছে, ওটা নিয়ে আপনি চলে যান। মেঘনা পাড়ি দিতে হবে আপনাকে।”

নওশাদ এই সংকটকালে বেলার ভূমিকার কথা ভাবে। সেই গ্রহান্তরের সভ্যতা কি বেলার বর্তমান চরিত্রটা ঠিক করে গিয়েছিল। এভাবে যে পৃথিবীর সভ্যতার পতন হবে সেটা তারা বুঝতে পেরেছিল, সেজন্য বেলার মতো একটি সচেতন মস্তিষ্ক কি তারা রেখে গিয়েছিল? রেখে গিয়েছিল তথ্য পাবার পথগুলো, নইলে বেলা কী করে কালো-পতাকাদের চেক পয়েন্ট সম্বন্ধে জানে।

“আপনি দেরি করবেন না, নওশাদ?” বেলার কন্ঠে আর্তি, “আপনি যান এখন, আপনাকে ওরা এখানে পেলে আমিও আর বাঁচব না। আর প্রতিরোধ যদি বিজয়ী হয় তবে আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবেন।”

“কিন্তু প্রতিরোধ বলে তো কিছু নেই,” বিড়বিড় করে নওশাদ, “শুধু বেলাই আছে।” জানালা দিয়ে আবার বের হয় নওশাদ। নিচে নেমে গেলে ওপরের দিকে তাকালে দেখে ওই ঘরটার দেয়ালের দিকটা কাঁপছে, তারপর আবার সব আগের মতনই।

সন্ধ্যার অপস্রিয়মাণ আলোয় ধলেশ্বরী দিয়ে নৌকো বায় নওশাদ। বেলাকে যেমন সৃষ্টি করেছিল সেই গ্রহান্তরের সত্তারা, বেলাকে রক্ষা করার উপায়ও নিশ্চয় তারা করে গিয়েছিল। “বিদায় বেলা,” ঠোঁট নড়ে নওশাদের, “আবার আমাদের দেখা হবে যখন কালো-পতাকা থাকবে না, কোনো রঙিন সূর্যোদয়ে।” মাথার ওপরে কালপুরুষ তখন সবে ফুটে উঠছে। সাথে লুব্ধক, আলদেবরন, কৃত্তিকা।

 

 

প্রশ্নোত্তর

শুদ্ধস্বর: গল্প লেখার ব্যাপারে আপনার তাড়নার জায়গাটা কোথায়? অর্থাৎ কোন বিষয় এবং ঘটনাগুলো আপনাকে গল্প লেখার জগতে পৌঁছে দিলো?

দীপেন ভট্টাচার্য: এই তাড়নাটিকে ধর্ম বলা যায়, অর্থাৎ লেখকের বৈশিষ্ট্য– সে না লিখে পারে না। সে নিজেও জানে না তার তাড়নার উৎস কী? ছাত্রাবস্থায় আমি এমন একটি বিশাল দালানে থাকতাম যেটি আমার মনে বিশেষ রেখাপাত করে, সেটির প্রভাবে ‘প্রাসাদ’ নামে একটি গল্প লিখি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বহু গল্পে ১৯৭১ ও তৎপরবর্তী অভিজ্ঞতা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে এসেছে। এই বিষয়বস্তুগুলো যে সচেতনভাবে এসেছে এমন নয়, বরং অবচেতনায় প্রোথিত ছিল বলেই উঠে এসেছে। গল্প পরিকল্পনা করে লিখতে পারি না, যদি কোনো আইডিয়া মনে জমাট বাঁধতে শুরু করে তখনই তা নিয়ে কাজ করতে পারি। সেই জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াটা কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস বা কয়েক বছরও হতে পারে।

আমি পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিদ্যার ছাত্র। মহাকাল ও অনন্ত মহাকাশের মাঝে আমাদের ক্ষুদ্র পৃথিবী ও তাতে সচেতন বুদ্ধিমত্তার দার্শনিক অবস্থান আমাকে ভাবায়। আমাদের ছোট জীবনের মধ্যে অসীম মহাবিশ্বকে অনুধাবন করা এই ধারণাটি আমাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে।

শুদ্ধস্বর: কীভাবে আপনার ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা আপনার গল্পকে আকার দেয়?

দীপেন ভট্টাচার্য: ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে আমি গল্পের বিষয়বস্তু নেওয়া থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকি, বরং একটি স্থান, সময় ও সামগ্রিকভাবে মানুষের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে লেখার চেষ্টা করি। ওপরে যা বলেছি আমার বিজ্ঞান অনুশীলনের অভিজ্ঞতা আমার গল্পের প্রেক্ষাপট হিসেবে সব সময়ই থেকেছে।

শুদ্ধস্বর: আপনি কি মনে করেন সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব কথাসাহিত্যের উপর রয়েছে বা থাকা উচিত? আপনার অভিজ্ঞতা এবং পঠনপাঠনের আলোকে বলুন।

দীপেন ভট্টাচার্য: পৃথিবীর বুকে একজন সচেতন সত্তা হিসেবে রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কাজেই সেটির প্রভাব অবশ্যই থাকবে। তবে এখানে সমস্যা হলো দুটি, প্রথমটি হলো লেখকের কাছে যা আপাত সত্য তা সবার কাছে সত্য নয়, দ্বিতীয়টি হলো সামাজিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে সাহিত্যের কাঠামোয় পরিবেশন করা। সাহিত্যের কাজ সংবাদ পরিবেশন নয়। তাই লেখককে যেকোনো রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এমন আঙ্গিকে উপস্থাপনা করতে হবে তা যেন পাঠককে বিচ্ছিন্ন না করে দেয়।

ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজারাবল’ থেকে তলস্তয়ের ‘যুদ্ধ ও শান্তি’, রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ইত্যাদি রচনা এই বাস্তবতাকে সাহিত্যমূল্য দিয়ে নিয়ে এসেছে। হেমিংওয়ের ‘ফর হুম দি বেল টোলস’ই ধরুন – স্পেনের গৃহযুদ্ধের এরকম একটা কাহিনি কিছু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর টানা-পোড়েনের ওপর দাঁড়ানো। হেমিংওয়ের ভাষাতে কোনো মিষ্টত্ব নেই, কিন্তু সেই ভাষা অলঙ্কারমুক্ত বলিষ্ঠ। আমরা বারেবারে এই বইগুলোতে ফিরে আসি।

শুদ্ধস্বর: এমন একটি ছোটোগল্প সম্পর্কে বলুন যা আপনাকে কাঁদিয়েছে বা আপনার চিন্তা ও বোধকে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিয়েছে।

দীপেন ভট্টাচার্য: অনেক গল্পই আছে, বাংলা ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের। প্রয়াতা মার্কিন লেখক উরসুলা লে গুইনের “যারা ওমেলাস ছেড়ে চলে যায়” এরকম একটি গল্প। সমুদ্রের তীরে পাহাড় ঘেরা একটি সুন্দর সাজানো-গোছানো শহর, সেখানে দুঃখ-দারিদ্র নেই, তার অধিবাসীরা খুবই সুখী। উৎসব হয় সেই শহরে, তাতে যোগ দেয় সারা শহর। কিন্তু এই আনন্দকে অধিবাসীদের কিনতে হয়েছে একটা মূল্য দিয়ে। একটি শিশুকে আটকে রাখতে হয়েছে শহরের এক বাড়িতে, একটা ছোট খুপড়িতে। শর্ত হলো সেই তাকে খাওয়াদাওয়া দিয়ে বাঁচিতে রাখা যাবে, কিন্তু তার প্রতি কোনো সহৃদয়তা দেখানো যাবে না। কার সঙ্গে এই শর্ত তা আমরা জানি না। শিশু বড় হয়ে এখন কৈশোর অতিক্রম করছে। শহরের মানুষ এই শর্ত সম্পর্কে অবগত, তারা তাদের সন্তানদের কিশোরকে দেখাতে নিয়ে আসে, তারা বুঝতে সক্ষম হয় যে তাদের সুখ ওই কিশোরের দুদর্শার বিনিময়ে প্রাপ্ত, এটা তাদের করে তোলে সংবেদনশীল, তারা এই সুখকে সহজেই প্রাপ্ত বলে মনে করে না। তারা তাদের বাড়িতে ফিরে যায়, কিন্তু কেউ কেউ বাড়িতে আর ফিরতে পারে না, তারা ওমেলাস ছেড়ে চলে যায়।

আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনটি এরকমই, আমরা অজস্র সমঝোতার মধ্যে বাস করি – কম্প্রোমাইজ। অনেকে এটা বোঝে, অনেকে বোঝে না। না বুঝলে মানুষ এক ধরনের হিপোক্রিসির জগতে বাস করে, আর যারা বোঝে তাদের মধ্যে খুব কম লোকই আছে যারা ওমেলাস ছেড়ে চলে যেতে পারে।

শুদ্ধস্বর: আপনার গল্প লিখতে আপনি কীভাবে কাঠামো, ভাষা এবং ব্যাকরণ নির্মাণ/ব্যবহার করেন? আপনি কি নিজস্ব ফর্ম গড়তে এবং ভাঙতে অভ্যস্ত?

দীপেন ভট্টাচার্য: লেখক পাঠকের কাছে সময়ের দাবি করেন, সেখানে পাঠকের কাছে নতুন কিছু নিয়ে আসা লেখকের জন্য কর্তব্য। এই জায়গায় একটি গল্পের প্লট আমার কাছে মুখ্য। প্লট থেকে কাঠামো, আর কাঠামোটা যাতে সহজবোধ্য হয় সেই চেষ্টাটা করি। ভাষার ব্যবহারে আমি সচেতন, যেহেতু বাস্তব সামাজিক গল্প খুব কম লিখি সেখানে ইংরেজি শব্দ সচেতনভাবে পরিহার করি। গল্প যদি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি হয় সেখানে বাংলা পরিভাষা ও বাক্য গঠনে আনুষ্ঠানিকতা থাকে। এই পরিবেশনটা বাস্তব সামাজিক কাঠামোয় আরোপ করা সম্ভব নয়। সেই ক্ষেত্রে পাঠক এটিকে গ্রহণ করে মনে হয় আমাকে কিছুটা ছাড় দেন।

আর ফর্ম সচেতনভাবে ভাঙি না। বরং বিষয়বস্তু নতুন হলে তার সঙ্গে ফর্মটিও নতুন। আর বিষয়বস্তু ভিন্ন না হলে নতুন একটি গল্পে হাত দিই না।

শুদ্ধস্বর: আপনার কাছে একটি সার্থক ছোটোগল্পের মূল উপাদান কী?

দীপেন ভট্টাচার্য: গল্পের কাছ থেকে পাঠকের কিছু পেতে হবে। গল্প পাঠ করে পাঠক যেমন আনন্দ পাবেন, গল্প শেষ করে পাঠক সেটির রেশে ডুবে থাকবেন এবং ভাববেন। গল্পের ফলাফল অনেক সময় উন্মুক্ত হতে পারে, অর্থাৎ লেখক শেষটা খোলাসা করলেন না, পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে লেখককে একটু সাবধান হতে হবে, গল্পের কাজ গাণিতিক সমস্যা পাঠকের কাছে উপস্থাপনা নয়, বরং পাঠককে বহু সূত্র দিয়ে পাঠককে লেখকের জগৎটা যে কী সেটার আঁচ দেওয়া।

আর গল্প লেখা যদি লেখকের আয়ের মূল উৎস না হয়, তবে নতুন কিছু না হলে লেখকের ভাবতে হবে তাঁর গল্পটি লেখা উচিত কিনা। পৃথিবীতে তো ইতিমধ্যে চমৎকার সব সাহিত্য রচিত হয়ে গেছে, সেই ক্ষেত্রে লেখককে এমন কিছু নিয়ে আসতে হবে যাতে সে নিজে যেমন তৃপ্ত, পাঠকও তেমনি।

শুদ্ধস্বর: লেখকের রাজনৈতিক বোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ? রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অন্যায্যতার বিরুদ্ধে লেখককের কোন ধরনের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

দীপেন ভট্টাচার্য: রাজনৈতিক বোধ তো থাকা দরকার। আমরা ওমেলাসে থাকব, কিন্তু শহর কী করে চলছে সেই সম্পর্কে অচেতন থাকব তা তো হয় না। রাষ্ট্রীয় অন্যায্যতা সম্পর্কে লেখকের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। লেখককে যে এই নিয়ে রাস্তায় বের হতে হবে তা নয়, কিন্তু কোনো না কোনো সময় তাঁর লেখায় এর সামান্য হলেও প্রতিফলন থাকবে। একই সাথে লেখককে ওই প্রতিফলনের সাহিত্য মূল্য সম্বন্ধে ভাবতে হবে। ওপরে বলেছি সাহিত্যের কাজ সংবাদ পরিবেশন নয়।

শুদ্ধস্বর: আপনি এখন কী লিখছেন? আপনার বর্তমান লেখালেখি সম্পর্কে পাঠকদের জন্য কিছু বলুন!

দীপেন ভট্টাচার্য: সামাজিক কাঠামোর বাইরে একক মানুষের সঙ্গে সময় ও প্রকৃতির মিথষ্ক্রিয়া নিয়ে আমি ভাবি। আমার অনেক গল্পই এরকম। অন্যদিকে সামাজিক আদর্শগত সংঘাত ‘দিতার ঘড়ি’র মতো উপন্যাসে এসেছে। সেখানে ‘চিতা’ বাহিনী সমতলের মানুষদের সময় নির্ধারণের জন্য ঘড়ির ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। এটা ছিল ১৯৭১’-এর যুদ্ধেরই রূপক। বর্তমানে একদিকে আদর্শগত চরমপন্থা ও বাকস্বাধীনতার অবক্ষয়, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্ভব নিয়ে আমাদের জীবনে প্রভাব রাখছে। সেগুলো লেখায় কিছু কিছু আসছে।

‘নক্ষত্রের ঝড়’ নামে আমার একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি অনেক বছর আগে বের হয়েছিল। তাতে ভিনগ্রহ থেকে পাঠানো একটি কোয়ান্টাম তরঙ্গের সঙ্গে বিক্রিয়া করে পৃথিবীর তিন চতুর্থাংশ মানুষ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। এর ফলাফলে পৃথিবীতে যে মাৎস্যন্যায় পর্ব শুরু হলো তাই নিয়ে দ্বিতীয় পর্বটি লিখছি।


        
            

   

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!