’ব্লাসফেমি’র বোঝাপড়া, ভারতবর্ষের অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক প্রবণতাসমূহ | মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার

0

English Synopsis

This article provides a brief account about “blasphemy” in the Indian sub-continent.  Blasphemy-related cases are increasing in India, Pakistan, and Bangladesh. Although India claims to be largest secular democratic country in the world, in recent decades Hindu nationalism is peaking with active sponsorship of the state and leadership of political parties. Pakistan is an Islamic country that is heavily dominated by military forces. With democracy in a very fragile state in Pakistan, both religious fundamentalists and military forces have become close stakeholders of state power and national politics. Bangladesh was liberated from Pakistan in 1971 with an aspiration of being a secular democratic country, but this goal slipped from its path from 1975 onwards, and several military regimes changed the desired political course of the country. Rising Islamism in Bangladesh and Pakistan and Hindu nationalism in India are nothing but part of the politics of these countries, and all enjoy the benefits of having blasphemy laws in their own countries. In recent decades, most of the blasphemy cases in these countries are basically politically motivated to get closer to state power or to grab the state power. Therefore, it is probably not enough to consider blasphemy as just a problem of religion; rather we need to scrutinize the roles that politics, culture, and the recent technological development play in these rising “blasphemy” incidences.

In any democratic society, the right to blasphemy is nothing but an ordinary human right, often considered as freedom expression. Therefore, the political fight for a democratic and secular society is an integral part of the fight against “blasphemy laws” across the world.

 

প্রচলিত অর্থে ব্লাসফেমী আইন কি? খুব সঠিক ভাবে বলতে হলে বলা উচিত ‘ব্লাসফেমী বিরোধী আইন’। ব্লাসফেমী শব্দের উৎপত্তির কথা আমরা সকলেই জানি, গ্রীক উৎস থেকে এসেছে শব্দটি। গ্রীক উৎস অনুযায়ী দুটি শব্দের সংযোগে গড়ে ওঠে এই শব্দটি, ‘Blaptein’ ক্ষতিকর কিছু করা আর  ‘Pheme’ অর্থাৎ শব্দ বা কথা দিয়ে, শব্দ বা কথা দিয়ে কারো কিছু ক্ষতি করা, বিশেষত প্রচলিত প্রথা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা এবং সেই প্রশ্নের মাধ্যমে বিষয়টিকে ক্ষতির মুখোমুখি করা।  David Nash তার ব্লাসফেমির ইতিহাস বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে ব্লাসফেমি তার আদি উৎস থেকে অনেকবার তার সংজ্ঞা ও ধরন পরিবর্তন করেছে (১) । রাষ্ট্রের বা ক্ষমতা যখন ধর্মের উপড়ে ভিত্তি করে রচিত হয় তখন রাষ্ট্রের সমালোচনাকেও ব্লাসফেমী হিসাবে বিবেচনা করা হয়, অর্থাৎ কখনো কখনো রাষ্ট্রদ্রোহিতাও ব্লাসফেমী হতে পারে।  Devid Nash’ও শুরু করেছেন শব্দটির গ্রীক উৎস থেকে।  গ্রীক উৎস মতে এর আরেকটা অর্থ হচ্ছে ‘শয়তানের বাণী’ বা সোজা কথায় শয়তানের প্ররোচনায় ঈশ্বরের বিরুদ্ধে করা কোন অপরাধ। ইহুদী-খ্রিস্টিয় ইতিহাস বলে যা কিছু ঈশ্বর ও তার বাণী বিষয়ে কোনও ধরনের সমালোচনা, ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে তাই’ই ব্লাসফেমাস বা ব্লাসফেমি সংক্রান্ত অপরাধ। মূলত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সংরক্ষণের হাতিয়ার হিসাবেই ইতিহাসে এই ধারনাকে বড় করে তোলা হয়েছে যে, ঈশ্বর, ধর্ম ও ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়গুলো এতোটাই পবিত্র যে এসব পরম পবিত্র বিষয়গুলোকে সাধারনের সমালোচনার বাইরে রাখতে হবে। খ্রিস্টীয় সমাজগুলোর ইতিহাসের একটা বড়ো অংশ জুড়ে ব্যাখ্যা করেছে যে সমাজের সুস্থ কাঠামো বা Healthy Fabric বজায় রাখার জন্যেই ঈশ্বর – ধর্ম ও পবিত্র বিষয়গুলোকে সমালোচনার বাইরে রাখতে হবে। ধর্ম, ধর্মীয় বিধান আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সাধারণের সমালোচনার বাইরে রাখা নিশ্চিত করার জন্যে যে সকল আইন দেশে দেশে বহাল ছিল ও এখনও আছে সেসকল আইনই এক কথায় ‘ব্লাসফেমী বিরোধী আইন’ যদিও বিভিন্ন দেশে এই আইনের ব্যাখ্যা ও এই আইনের অধীনে শাস্তির ধরনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তফাত। এই সকল পবিত্রতম  ইহুদী-খ্রিস্টীয় ও মুসলিম ঐতিহাসিক ঐতিহ্য অনুযায়ী ব্লাসফেমি বা ঈশ্বর অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। ইহুদী-খ্রিস্টীয় সমাজগুলোতে এর ঐতিহাসিক পরিবর্তন হলেও ইসলামী বা মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে এখনও এটা ভয়ংকর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

পৃথিবীর একটা বড়ো অংশে ব্লাসফেমি বিরোধী আইনে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে, তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে এখন ব্লাসফেমী অপরাধের জন্যে শাস্তি বা হত্যা এক বিরল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।  ইউরোপে বা বলা যেতে পারে পশ্চিমা খ্রিস্টীয় বিশ্বে ব্লাসফেমি আইনে সর্বশেষ প্রাণ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৬৯৭ সালে স্কটিশ নাগরিক থোমাস এইকিংহেড।প্রায় তিনশো পঁচিশ বছর আগে থোমাস এইকিনহেড কে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো, খ্রিস্টীয় ঈশ্বরের অস্তিত্ব কে অস্বীকার করার অপরাধে এবং ক্যাথলিক চার্চ এর শক্তি বা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার অপরাধে। যদিও ইউরোপে ব্লাসফেমীর কারণে হত্যার বা ফাঁসিতে ঝোলানোর ইতিহাস তিন শতকের পুরনো ঘটনা কিন্তু ইউরোপের দেশে দেশে ব্লাসফেমী আইন গুলো বাতিলের আন্দোলন খুব সাম্প্রতিক, কেননা এখনও বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশে বহাল তবিয়তে নানান রূপে রয়েছে ব্লাসফেমী আইন।

পৃথিবীর দেশে দেশে ব্লাসফেমী বিরোধী আইন ছিল, বহু দেশে এখনও রয়েছে। খ্রিস্টীয় ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত দেশগুলোতে ঐতিহাসিক ভাবে ব্লাসফেমী বিরোধী আইনগুলো ছিল কেবল খ্রিষ্টান ধর্মের জন্যে প্রযোজ্য, যেমন মাত্র কয়েক দশক আগেও বাতিল হয়ে যাবার পূর্ব পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ব্লাসফেমী আইন ছিল কেবলমাত্র খ্রিস্ট ধর্মের অবমাননার সাথেই সম্পর্কিত।যদিও অস্ট্রেলিয়াতে কেবল কুইন্সল্যান্ড প্রদেশেই এখনও ব্লাসফেমী আইন রয়ে গিয়েছে কিন্তু সেটা সত্যিকার অর্থেই ঘুমন্ত। ব্লাসফেমী আইন বাতিলের আগে  অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল কোর্ট এর সংজ্ঞা অনুযায়ী ব্লাসফেমী অপরাধ ছিল ‘খ্রিস্টিয়ানিটি ও তার বিশ্বাসের প্রতি অবমাননাকর কোন বক্তব্য লিখিত আকারে প্রকাশ করা’ এবং যদি এই লেখা ‘সুস্থ ভিন্নমতের সীমা অতিক্রম’ করে তাহলেই কেবল ব্লাসফেমী অপরাধ বলে গণ্য হবে। অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল কোর্ট এর মতে কেউ যদি ‘সম্মানজনকভাবে  ঈশ্বর কে অস্বীকার করে বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব কে অমান্য করে’ তাহলে সেটা ব্লাসফেমী অপরাধ হবেনা।  আবার কাতারসহ ইসলামী দেশগুলোর বেশীরভাগের বেলাতেই ব্লাসফেমী বিরোধী আইনগুলো শুধু ইসলাম ধর্মের অবমাননার সাথেই সংশ্লিস্ট। নানান ধরনের আইনের বেশে হলেও প্রায় প্রতিটি প্রধান ধর্ম কেন্দ্রিক  ব্লাসফেমী বিরোধী আইন এখনও বহাল রয়েছে নানান দেশে। ইসলামী বা মুসলিম অধ্যুষিত প্রায় সবকটি দেশেই রয়েছে এই আইনগুলো, যার মধ্যে পাকিস্তানের মতো কোন কোন দেশে এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। শ্রীলংকা ও মিয়ানমারে রয়েছে  আইন যা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের বর্ম হিসাবে কাজ করে ঠিক তেমনি আবার ইহুদী জাতিগত দেশ বলে দাবী করা ইসরায়েলের রয়েছে ধর্ম অবমাননা বিরোধী আইন। আবার অন্যদিকে একেবারেই সেকুলার রাষ্ট্র বলে দাবীদার ক্যানাডা, জার্মানি কিংবা ডেনমার্কে এখনও বহাল রয়েছে নানান রূপের ব্লাসফেমী বিরোধী আইন (২)।

ব্লাসফেমী আইনের স্বপক্ষে নানা দেশের আইন প্রণেতারা নানান যুক্তি প্রদান করেছেন। অনেক উদারনৈতিক ও গণতান্ত্রিক দেশেও ব্লাসফেমী বিরোধী আইনের উপস্থিতিকে রাজনৈতিক নেতারা ‘প্রয়োজনীয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। আবার পশ্চিমের দেশগুলোর রাজনীতিবিদদের অনেকেই বলেছেন এই আইন থাকা ও না থাকার মাঝে কোন তফাত নেই কেননা এখন মানুষের নাগরিক দায়িত্ববোধ এতোটাই সুসংহত যে, এই আইন থাকলেও তা আসলে বছরের পর বছর ঘুমিয়েই থাকবে। বাস্তবতাও তাই, বহু পশ্চিমা দেশে এই আইনগুলোকে বলা হচ্ছে ঘুমন্ত আইন কেননা বহু বহু বছর এই আইনগুলো দণ্ডবিধিতে থাকলেও এসবের কোন ব্যবহার নেই, কেননা কেউ এই আইনগুলো ব্যবহার করে গত প্রায় এক শতকে কখনওই মামলা করেনি এই দেশগুলোতে । যে প্রধান যুক্তিগুলো দেখানো হয় ব্লাসফেমী বিরোধী আইনগুলোর স্বপক্ষে তার মধ্যে রয়েছে –

ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা করা – পৃথিবীর প্রায় সকল প্রধান ধর্ম তার অনুসারীদের মাঝে অন্তত দুটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত করে তা হচ্ছে ঈশ্বর এবং তার প্রেরিত গ্রন্থ তথা ধর্মীয় বিধি বিধান সমূহ হচ্ছে ‘পবিত্রতম’, সকল ধরনের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে এবং সাধারণের কাজ শুধু সেসবের অনুসরণ করা এবং প্রশংসা করা। আব্রাহামিক ধর্মগুলোর ক্ষেত্রে আনুগত্য শুধু ঈশ্বর বা তাঁর প্রেরিত ধর্মগ্রন্থ বিষয়ক নয়, বরং তাঁর প্রেরিত ‘নবী’ বা ধর্ম প্রচারকেরাও ‘পবিত্রতম’, ‘পরম শুদ্ধ’। তাই ঈশ্বর, ধর্মগ্রন্থ, ধর্মীয় বিধানের পাশাপাশি নবী রাসুল, ধর্মীয় নেতা, ধর্মীয় সাধুদের প্রসঙ্গেও কোন সমালোচনা, প্রশ্নবোধক বা অবমাননাকর যেকোনো বক্তব্য ব্লাসফেমী অপরাধ হিসাবে গণ্য হয়। ভারতের মতো উদারনৈতিক সেকুলার দেশেও হিন্দু ধর্মের ও ভারতীয় পুরানের নানান চরিত্রগুলোকেও মনে করা হয় ‘পবিত্রতম’ এবং সমালোনার ঊর্ধ্বে। আইন প্রণেতারা বিভিন্ন দেশে ব্যাখ্যা করেছেন ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ, ধর্মীয় বিধান, ধর্মীয় সন্তু সাধক এদের সমালোচনা করার অর্থ হচ্ছে সমাজের ‘শান্তি বিনষ্ট’ হওয়া, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ধর্মীয় বিধানের প্রতিপালন – পৃথিবীতে এখনও বহু দেশ নিজেদেরকে ‘ধর্ম ভিত্তিক’ রাষ্ট্র হিসাবে দাবী করে থাকে। বিশেষত ইসলামী ও মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে, রাষ্ট্রের আইনের ভিত্তিও হচ্ছে ধর্ম।যেখানে শরিয়া আইন রয়েছে সেখানে সকল আইনের উৎস সরাসরি কুরআন ও হাদিস সমূহ আর যেসকল দেশে সরাসরি শরিয়া আইন নেই সেখানেও নানান ভাবেই রাষ্ট্রীয় আইনকে ধর্মীয় বিধানের অধীন হতে হয়, সেই কারণেই ধর্মীয় বিধান কে রক্ষা করা রাষ্ট্রীয় আইনের একটা দায়িত্ব হয়ে থাকে। পাকিস্তানের মত দেশে ব্লাসফেমী আইন থাকবে কিনা সেই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে, এমন কি সাম্প্রতিক নির্বাচনেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে তিনি পাকিস্তানের আইনের ব্লাসফেমী আইনকে আরও জোরদার করবেন।

সামাজিক স্থিতিশীলতা – প্রাচীন গ্রীক যুগ থেকেই ধর্মীয় অনুভূতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতা কে মানুষের জন্যে একধরনের সামাজিক মূল্যবোধের অংশ হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে, তাই ধার্মিক জনগণের কথিত ‘অনুভূতি’ কে সংরক্ষণ করার মাঝে অনেক রাষ্ট্রই সামাজিক স্থিতিশীলতা দেখতে চায়, ফলে সমাজের একটি অংশের অনুভূতির সংরক্ষণের জন্যে আরেকটি অংশের অধিকার হরণ করে হলেও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা হয় নানান রকমের ব্লাসফেমী আইনের মাধ্যমে। এমন কি আধুনিক ও সেকুলার রাষ্ট্র জার্মানিতেও আমরা দেখি ব্লাসফেমী আইনের ব্যাখ্যায় আমরা দেখি ‘ধর্ম বা অন্যের যেকোনো মতাদর্শকে অবমাননা করার জন্যে যদি জনসাধারণের শান্তি বিনষ্ট হয়’ কিংবা যেকারো দ্বারা যদি ‘চার্চ বা অন্য যেকোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় সংগঠনের অবমাননা ঘটে’ তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে (৩)।

‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ করাকে প্রতিরোধ করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী ব্লাসফেমী আইনের মূল ভিত্তি। কিন্তু সারা পৃথিবীতেই এই ধারনাটিকেই প্রশ্ন করা হয়েছে এবং  ধারনার মাঝে বোঝাপড়ার অনিশ্চয়তার বিষয়টিকে প্রশ্ন করেছে উদারনৈতিক, গণতান্ত্রিক ও মানবতাবাদী চেতনার মানুষেরা। তাঁরা প্রশ্ন করেছেন ‘ধর্ম’, ‘অনুভূতি’ এবং ‘আঘাত’ এই তিনটি ধারনাকেই। মধ্যযুগের ইউরোপীয় ধর্মতাত্ত্বিক টমাস একুইনা ব্লাসফেমী অপরাধকে ব্যাখ্যা করেছেন মানুষ খুন করার অপরাধের সাথে তুলনা করে।তিনি দুইটি মানদণ্ড ব্যবহার করেছেন, প্রথমত ‘পাপ’ বা ‘পাপবোধ’ এর দিক থেকে এবং দ্বিতীয়ত ‘ক্ষতি’ বা ‘Harm’ এর মানদণ্ডে।  একুইনা বলছেন –

‘আমরা যদি ব্লাসফেমী কে খুন করার মত পাপের সাথে তুলনা করি, কৃতকর্ম হিসাবে ‘পাপ’ এর বিচারে বলা চলে এটা পরিষ্কার যে ব্লাসফেমী যা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সরাসরি করা একটি পাপ এবং এটা খুন করার চাইতেও কঠিন পাপ যা হয়তো করা হয়ে থাকে কোন একজন প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। কিন্তু অন্যদিকে যদি আমরা এই দুইটি বিষয়কে তুলনা করি কারো বিরুদ্ধে ‘ক্ষতি সাধন’ এর নিরিখে, তাহলে বলতে হবে যে খুন করা বেশী ভয়ংকর পাপ, কেননা যাকে খুন করা হয় সেটা তাঁর জন্যে ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হয় কিন্তু  ব্লাসফেমী ঈশ্বরের জন্যে কোন ক্ষতির কারণ হয়না’  (Thomas Aquina: Summa Theologica)

সুতরাং থোমাস একুইনার এই ছোট্ট ব্যাখ্যায় যে দ্বিধার প্রশ্নটি রয়েছে বা যে দ্বৈত বিবেচনার প্রশ্নটি রয়েছে সেটাই আধুনিক সমাজের জন্যে প্রধান মোকাবিলার প্রশ্ন। ঈশ্বরের সমালোচনা কি আসলেই ঈশ্বর কে আঘাত করে? ঈশ্বরের ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়? কিন্তু ঈশ্বরের সমালোচনা করার অপরাধে যে মানুষটিকে খুন করা হয় কিংবা একেবারেই ভিন্ন কোন কারণে যখন কোন প্রতিবেশীকে খুন করা হয় সেটা সেই প্রতিবেশীর জন্যে বা তাঁর সাথে সম্পর্কিত মানুষদের জন্যে একটা পার্থিব ‘ক্ষতি’। পার্থিব ক্ষতির মানদণ্ড ধরা হলে, ‘অনুভূতিতে আঘাত’ এর ব্যাখ্যায় তাই রয়েছে এক বিরাট অনিশ্চয়তা বা Uncertainty।

ঈশ্বর, আল্লাহ, গড এর ধারনাটি দারুণ ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ যেকোনো যৌক্তিক মানুষের কাছেই। বিশেষত উদারনৈতিক, সেকুলার ও গণতান্ত্রিক চেতনার সমাজগুলোতে ঈশ্বর ধারনাটি নানান প্রশ্নের চড়াই উতরাই এর মাঝেই বিদ্যমান। ধরা যাক, গড বা আল্লাহর মতো একেশ্বরবাদি ধারনাটি ইহুদী, খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মকে অর্থাৎ ইব্রাহিমি ধর্মগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে কিন্তু তা কখনওই হিন্দু ধর্মকে একই কাতারে নিয়ে আসতে পারেনা কেননা হিন্দুধর্মের ঈশ্বর ধারনা ইব্রাহিমি ধর্মগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিন্দু ধর্ম সকল অর্থেই বহু ঈশ্বরের ধারনায় বিশ্বাসী, এমনকি অনেকেই মত প্রকাশ করে থাকেন যে হিন্দু ধর্মের মাঝে নিরীশ্বরবাদীতার জন্যেও স্থান রয়েছে। হিন্দু ধর্মের এই বহু ঈশ্বরের ধারনাটি ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসের পটভূমিতে এক ধরনের ‘ব্লাসফেমী’।ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানি ৬৩০ সালে মুহাম্মদ যখন মক্কা বিজয় করে নেন তখন মুহাম্মদ কাবা ঘরে রক্ষিত তাঁরই পূর্বপুরুষদের ধর্ম বিশ্বাসের প্রতীক, ঈশ্বরের অবয়ব হিসাবে রক্ষিত তিনশো ষাটটি মূর্তিকে ভেঙ্গে ফেলেন এবং কাবা ঘরকে ‘পরিষ্কার’ করেন, যা সেই সময়ের মক্কার পূর্ব পুরুষদের ধর্মের মানুষের দৃষ্টিতে নিশ্চিত ভাবেই ঈশ্বর অবমাননারই নামান্তর ছিল। কিন্তু ততদিনে মুহাম্মদের নেতৃত্বে নব্য ইসলামী সমাজ এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে যা এই ‘ব্লাসফেমী’র পেছনের শক্তি হিসাবে কাজ করেছে, কিন্তু উদীয়মান ধর্ম ইসলামের দৃষ্টিতে এই ঘটনাটি আদৌ কোন ব্লাসফেমী বা ধর্ম অবমাননার ঘটনা নয়, বরং এটা ছিল ইসলামের দৃষ্টিতে পরম পুণ্যের কাজ, ধর্মীয় দায়িত্ব। আবার খোদ ভারতবর্ষে হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের মাঝেই বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ঈশ্বরের অনুগামী হবার প্রথাকে অনুশীলন করা হয়ে থাকে, যা ঈশ্বরের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে, এক অঞ্চলের সবচাইতে পূজিত ঈশ্বর অন্য অঞ্চলে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে হাজির থাকেন না, এমন বহু নজির হিন্দু ধর্মের অনুশীলনের মাঝে রয়েছে। সুতরাং ঈশ্বর, আল্লাহ, ভগবান কোন সুনির্দিষ্ট স্থির ধারনা নয়, এদের গুরুত্ব ও পবিত্রতার ধারনাটি তাই ভীষণ ভাবেই অনিশ্চয়তার অধীন যা ঈশ্বরের ‘অবমাননা’র ধারনাটিকেও প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয়।

ধর্ম ও ধার্মিক কে? ধর্ম বা বিশ্বাসের গোড়া বা উৎস কি বা কোথায়?  ঈশ্বর বিশ্বাস করা কি ধর্ম? যদি ঈশ্বর বিশ্বাস ধর্মের একটি প্রধান শর্ত হয়ে থাকে তাহলে বৌদ্ধ ধর্মকে কি বলা হবে যাদের প্রকৃত অর্থে কোন ঈশ্বর নেই? কিংবা চীনের একটা বিরাট অংশের জনগণের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে কি বলা যাবে যারা সুনির্দিষ্ট কোন ঈশ্বরের অনুগামী না হয়েও এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধ্যাত্মিক জীবনাচরণ অনুসরণ করে থাকেন? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনে আজো মানবতাবাদ একটি ধর্ম হিসাবে স্বীকৃত, মানবতাবাদকে ধর্ম বলা হচ্ছে এই যুক্তিতে যে যদি বিভিন্ন সামাজিক রাষ্ট্রীয় দলিল দস্তাবেজের প্রয়োজনে নিজের ধর্ম পরিচয়ের প্রশ্নে কোন একক ব্যক্তি যদি কোন ধর্মের অধীনেই নিজেকে পরিচিত করতে না চান তাহলে তিনি নিজেকে মানবতাবাদী হিসাবে পরিচিত করতে পারেন, অথচ কে’না জানেন বিশ্বের মানবতাবাদীদের একটা বড় অংশই সেকুলার আদর্শের অনুসারী এবং অবিশ্বাসী। অর্থাৎ এখানে ধর্ম কেবলই একটা পরিচিতি বা আইডেন্টিটি, কোন অপার্থিব বিশ্বাসের বিষয় নয়, ঠিক যেমনটা ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে যে কেউ নিজেকে নিধার্মিক বা নিরীশ্বরবাদী বা মানবতাবাদী হিসাবে পরিচয় দান করতে পারেন।  ইসলামী বিশ্বের কতিপয় দেশ ব্যতীত সমগ্র পৃথিবীতেই  মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। ইসলামী দেশগুলোতে অন্যান্য ধর্মের উপরে নানান বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও কাগজে কলমে এই দেশগুলোতেও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নাগরিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ছাড়াও সমগ্র গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় ধর্ম পালন করার অধিকারের মতই ধর্ম পালন ‘না করাটাও’ নাগরিকের মৌলিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এবং অপরাপর গণতান্ত্রিক বিশ্বে ধর্ম পালন করা কিংবা পালন না করা উভয়ই ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। সেই অর্থে ধর্ম পালন না করা বা ঈশ্বরে অবিশ্বাস করাও নাগরিকের মৌলিক অধিকার যা পৃথিবীর কোন কোন প্রান্তে এখনও ব্লাসফেমী বলে গণ্য।’ধর্ম পালনের স্বাধীনতা’ বা ‘Religious freedom’ এর বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে তাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এই ধরনের স্ববিরোধী অবস্থান রয়েছে।

ঈশ্বর ও ধর্ম প্রশ্নের এই স্ববিরোধীতা ও অনিশ্চয়তার পরে তৃতীয় প্রসঙ্গটি হচ্ছে ‘অবমাননা’।ধর্মের অবমাননা আসলে কি? ধর্ম প্রসঙ্গে কোন সমালোচনা, মন্তব্য, লেখা কখন ‘অবমাননা’ হিসাবে হাজির হয়? পশ্চিমা সেকুলার দেশগুলোতে বলা হচ্ছে ধর্মকে সমালোচনার ‘Decent limit’ বা ‘ভদ্রস্থ সীমা’র কথা। কিন্তু  ধর্ম অবমাননার এই সীমাটি কে নির্ধারণ করবে? কতটুকুকে বলা যাবে ‘Decent limit’? ইউরোপীয় দেশগুলো এমন কি গণতান্ত্রিক ভারতে এই সীমা নির্ধারণের জন্যে ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘Intent’ এর উপরে  জোর দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যেকোনো ব্লাসফেমীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে লিখিত বা মৌখিক যে বক্তব্যটিকে, আচরণগত প্রকাশকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে তাঁর ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘intent’ সত্যিকার অর্থে কি ছিল তা হবে প্রধান বিবেচনা। কিন্তু ইসলামী বিশ্বে বা মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে এই ‘উদ্দেশ্য’ নিয়ে কোন বালাই নেই, বরং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মোল্লাতন্ত্র কিভাবে অভিযোগটিকে ব্যাখ্যা করে সেটাই প্রধান হয়ে ওঠে।

যেমন, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা শহরের মেয়রকে ২০১৭ সালে দেশটির আদালত ব্লাসফেমীর অপরাধে তিন বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। দেশটির পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে তিনিই ছিলেন একমাত্র খ্রিষ্টান বা অমুসলিম মেয়র, কোন একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে ভদ্রলোক কুরআনকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করেছিলেন যে মুসলিমদের পক্ষে একজন অমুসলিম নেতা নির্বাচন করাটা অন্যায় কিছু নয়। জাকার্তার মেয়রের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তাকে ব্যাখ্যা করা এবং তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে একজন খ্রিষ্টান হওয়া সত্ত্বেও তিনি একটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার রাজনৈতিক নেতা হিসাবে অবদান রাখতে পারেন এবং এ বিষয়ে ইসলামে ধর্মীয় কোন বাধা নেই। যেকোনো শান্তিপ্রিয় সুস্থ চিন্তার মানুষের কাছে তাঁর এই প্রয়াস সাধুবাদ পাবার যোগ্য বলেই বিবেচিত হবে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের কোন কোন অংশের কাছে তাঁর এই প্রচেষ্টাকে ইসলামের অবমাননা হিসাবে মনে হয়েছিলো কেননা মেয়রের  এই উদ্ধৃতিটি ভুল ছিল, কেননা কুরআন এমনটা ব্যাখ্য করেনা যে মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক নেতা একজন অমুসলিম হতে পারেন।  তাই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয় ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের একটি দল এবং প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়ার পরেও ইন্দোনেশিয়ার আদালত মনে করেছে এটা তাঁর প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যে যথেষ্ট নয়, সুতরাং তাঁকে তিন বছরের শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে   (৪)। অর্থাৎ কেউ যদি কুরআনের ‘ভুল’ উদ্ধৃতি ব্যবহার করে সেটাও ইসলামী বোঝাপড়ায় ব্লাসফেমী, এমন কি তাঁর উদ্দেশ্য যদি খুবই সৎ, মহান কিংবা আপাত দৃষ্টিতে কোন ক্ষতিকর কিছু নাও হয়ে থাকে।

কিংবা পাকিস্তানের নির্বাচনী হলফনামার শপথ অংশটুকু থেকে ভুল ক্রমে ‘মুহাম্মদ শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী’ এই প্রসঙ্গটি বাদ পড়ে যাওয়ায় সারা দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। সরকার ও সংসদের পক্ষ থেকে সাথে সাথেই জানানো হয় যে বিষয়টি কেবলই ‘করণিক ভুল’ বা ‘Clerical mistake’ এটা উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয় এবং বিনা প্রশ্নে সেটা সংশোধন করে সঠিক বাক্যগুলো আবার জুড়ে দেয়া হয়। এমন কি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও তা সারা দেশ জুড়ে ব্লাসফেমীর অভিযোগকে তরল করতে পারেনি। দেশটির মোল্লাতন্ত্র মামলা ঠুকে দেয় এবং এর পেছনের কারণ হিসাবে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে দায়ী করে, কেননা ঘটনাক্রমে সেই সময় (বর্তমানে সাবেক) পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী ছিলেন জাহিদ হামিদ যিনি একজন আহমদিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলিম ছিলেন। এক সপ্তাহের মধ্যে এই প্রতিবাদ সারা পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে, অখ্যাত ও সুপরিচিত একাধিক সুন্নি ইসলামী দল সারাদেশে যে প্রতিবাদ আয়োজন করে তার ফলে একজন নিরাপত্তাকর্মীসহ পাঁচজন সাধারণ মানুষ নিহত হয়। সুন্নি ইসলামী সংগঠনগুলো তাদের আন্দোলন কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নেয় যখন পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী জাহিদ হামিদ বিনা শর্তে পদত্যাগ করেন এবং যখন সরকার নিশ্চয়তা দেয় যে তাঁরা এর যথাযথ বিচার করবেন।

এইতো মাত্র চার বছর আগে মিশরের কবি ফাতিমা নাউত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঈদ -উল-আযহা উৎসবে মুসলমান সম্প্রদায়ের পশুর গণ-কোরবানির সমালোচনা করে নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন আর তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি এখন তিন বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন, কেননা কোরবানির পশু হত্যার বিষয়ে তাঁর এই ব্যক্তিগত মতামত মিশরের ইসলামী অরথডক্সির কাছে ব্লাসফেমী বলে বিবেচিত হয়েছে।

এমন কি ২০১৫ সালে আফগানিস্তানের কাবুলে একজন নারীকে জনগণ প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে মেরে ফেলে কারণ সেই নারীটি একজন ধর্মীয় নেতার সাথে উচ্চস্বরে তর্ক করেছিলেন যা ইসলামী বিবেচনায় ‘ব্লাসফেমি’ বলে গণ্য হয়েছে।

পাকিস্তানের গত বিশ বছরের ব্লাসফেমী জনিত মামলা গুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আইনত অমুসলিম ঘোষিত হওয়া আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা যদি নিজেদেরকে মুসলিম হিসাবে পরিচয় দিয়ে থাকেন সেটা চরম ব্লাসফেমী হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে। আহমদিয়া সম্প্রদায় যেহেতু পাকিস্তানে আইনগত ভাবে অমুসলিম ঘোষিত হয়েছে, তাই মসজিদকে কোনও আহমদিয়া অনুসারী মানুষ তাদের প্রার্থনার স্থান হিসাবে পরিচয় দিলে সেটাওপাকিস্তানের আইনে ব্লাসফেমী হিসাবে গণ্য হতে পারে।

অর্থাৎ এই কথিত ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ বা ‘ধর্মের অবমাননা’ এই ধারনার কোন শুরু বা শেষের বিন্দু নেই, শুধুমাত্র ঈশ্বর বা ধর্মের সমালোচনাই নয় যেকোনো কিছুই এই ধারনার মধ্যে পড়ে যেতে পারে, তা সে একজন কবির কোরবানি বিষয়ে ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ কিংবা কুরআন থেকে উদ্ধৃত করতে গিয়ে ভুল করে ফেলা, ইসলামী আলেম এর সাথে নারী হয়ে বিতর্ক করা, আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কেউ একজন মসজিদ কে তাদের প্রার্থনার স্থান হিসাবে উল্লেখ করা কিংবা  একেবারেই প্রান্তিক অপরাধ হিসাবে আল্লাহ ও মুহাম্মদের সমালোচনায় অগ্রহণযোগ্য ভাষা ব্যবহার করা এই সমস্ত কিছুই হতে পারে ব্লাসফেমী। কোনও সন্দেহ নেই যে এই ধারনাগুলোর মাঝে এই অনিশ্চয়তা (Uncertainty) আর  অনির্দিষ্টতা (Non-specificity) বা বস্তুনিষ্ঠতার অভাব (Lack of objectivity) হচ্ছে পৃথিবী জুড়ে ব্লাসফেমী আইনের ভিত্তি এবং সেকারণেই মানবতাবাদীদের একটা বড়ো অংশ এই ধরনের বিবেচনার ন্যায্যতা বা fairness নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সারা দুনিয়াব্যাপী।

উপরের এই অংশটুকুর ব্যাখ্যা আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে কেনো সারা বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষেরা লড়াই করছেন দেশে দেশে ব্লাসফেমী আইন বাতিল করার জন্যে। এই বিশেষ আইন বাতিল করবার এই আন্তর্জাতিক আন্দোলনের কারণগুলো কি? কেনো সত্যিই মানবতাবাদী মানুষেরা এবং বিভিন্ন মানবতাবাদী সংগঠনগুলো দাবী করছে ব্লাসফেমী আইন গুলো বাতিল হোক? আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী ও মানবাধিকার কর্মীদের একটা বড়ো অংশই দেশে দেশে এই সকল আইনগুলোর বিলোপের জন্যে আন্দোলন করছেন (৫)। প্রধানত পাঁচটি কারণে সারা দুনিয়ার মানবতাবাদীরা ব্লাসফেমী আইনের বিরোধিতা করে থাকেন।

অন্যায্যতা –  ব্লাসফেমী বিরোধী আইন সকল যুক্তিতেই একটি অন্যায্য আইন। এর নৈতিক ভিত্তি গুলো অন্যায্য এবং দুর্বল। প্রথমত – ঈশ্বরের সমালোচনায় ঈশ্বর আঘাতপ্রাপ্ত হন না, কিন্তু তার সমালোচনার জবাবে ব্লাসফেমী আইনের শাস্তি মানুষকে আঘাত করে, ব্যক্তিগত, শারীরিক, ও সম্পদগত ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে। বাংলাদেশে নাসিরনগরে সুন্নি মুসলমানেরা যখন মিথ্যা সংবাদের ভিত্তিতে আল্লাহ ও রাসুলের অবমাননার জন্যে একটা গোটা হিন্দু পাড়া আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় তখন পৃথিবীর নানান প্রান্তে মুসলমানদের আল্লাহ এমন কি হিন্দুদের ভগবান উভয়েই বহাল তবিয়তে বিরাজ করেন। কিন্তু পার্থিব জীবনে একটা গোটা গ্রামের কয়েকশো হিন্দু পরিবার ঘর ছাড়া উদ্বাস্তু জীবনের শিকার হন। এটা অন্যায্য। দ্বিতীয়ত – যেকোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মের মহিমা কীর্তন করাটা যদি কারো নাগরিক অধিকার হয় তাহলে ধর্মের সমালোচনা করাটাও একই রকমের নাগরিক অধিকার হবার দাবী রাখে, সেটাই ন্যায্য বা সমানাধিকার। পৃথিবীর যেকোনো মতাদর্শ যদি সমালোচনার অধীন হয়ে থাকে তাহলে ধর্মও সমালোচনার অধীন এবং সমাজের ধারাবাহিক কল্যাণমুখী বিকাশের স্বার্থেই সকল চিন্তা, মতাদর্শ, সংগঠন, ব্যক্তি ও ব্যক্তির তৎপরতা সমালোচনার অধীন। অন্য সকল কিছুকে সমালোচনার জন্যে উন্মুক্ত রেখে কেবল ধর্ম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মগুরুদেরকে আলাদা সুরক্ষা দেয়াটা সমাজের ন্যায্যতার ধারনার পরিপন্থী।

ধোয়াশে (Vague) ও আত্মবাদীতা (Subjective)  –         এই আইনগুলোর ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে একটা বিরাট সমস্যা দিক হচ্ছে এসমস্ত আইনগুলোর নৈতিক ভিত্তি ও এখতিয়ার প্রায়শই ধোয়াশে ধারনার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ‘সমালোচনার সুস্থ সীমা’ কিংবা ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ সমালোচনা এই ধরনের ধারনাকে খুব সুনির্দিষ্ট ভাবে ব্যাখ্যা করার কোন উপায় নেই কেননা এই সকল ধারনা দেশ – কাল – পাত্র ভেদে ভিন্ন হতে বাধ্য। এই ধরনের ধোয়াশে ও আত্মবাদী ধারনার উপর ভিত্তি করে যে কোনও বিবেচনাবোধই অনেক ক্ষেত্রেই ভুল হতে বাধ্য যা নাগরিকের জীবন সংহারের কারণ ঘটায় প্রায়শই যা নিশ্চিত ভাবেই অগ্রহণযোগ্য।

মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী  – ব্লাসফেমি সংক্রান্ত আইনগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে থাকে, মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে থাকে। শুধুমাত্র ব্লাসফেমী আইনের উপস্থিতির কারণে পৃথিবীতে বহু সৃজনশীল মতামত চিরতরে হারিয়ে যায় বা বহু বহু বছর পরে প্রকাশিত হয়। ইরানের মূলধারার রাজনীতিবিদ ও ইসলামী স্কলার আলী দোস্তির কথা ধরা যেতে পারে, আলী দোস্তি তার বই ‘তেইশ বছরের নবী জীবন’ লিখেছিলেন ষাট এর দশকে, তিনি তার বন্ধু  F. R. C. Bagley কে বইটির পাণ্ডুলিপি দেন ১৯৭৫ সালে এবং অনুরোধ করেন বইটির অনুবাদ তার মৃত্যুর পরে প্রকাশ করতে, কেননা ইরানের একজন অত্যন্ত গণ্যমান্য ইসলামী স্কলার হওয়া সত্ত্বেও তিনি জানতেন তার এই বইটির কারণে তার প্রাণদণ্ড নিশ্চিত, যদিও বইটি সকল অর্থেই একটি সিরিয়াস বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা তুলে এনেছিলো ইসলাম ও তার নবীর জীবন নিয়ে, শুধুমাত্র ইরানের ব্লাসফেমী আইনের ভয়ে আলী দোস্তি ইরান থেকে মূল পারসিয়ান ভাষায় বইটি প্রকাশ করতে সাহস করেননি এবং তার জীবদ্দশায় এই বইটি প্রকাশিত হয়নি। কেবলমাত্র তার মৃত্যুর পরে ফ্রান্স থেকে এর অনুবাদ প্রকাশিত হয় এবং তাও প্রায় দশ বছর পরে। কিংবা আধুনিক ও সেকুলার রাষ্ট্র দাবী করা ভারতে আমেরিকান ইন্দোলজিস্ট ওয়েন্ডি ডনিগারের গবেষণা পুস্তক ‘The Hindus: An Alternative History’ কে যখন হিন্দুত্ববাদীরা নিষিদ্ধ করার দাবী জানান তখন বিষয়টি আদালতে ফয়সালা হবার আগেই ওয়েন্ডি ডোনিগারের প্রকাশক পেঙ্গুইন বাজার থেকে তুলে নেবার সিদ্ধান্ত নেন। মামলায় হেরে যাবার ভয়ে বা সমূহ বাণিজ্য হারানোর ভয়ে বা স্থানীয় জনগণের রোষের মুখে পরার ভয়ে পেঙ্গুইনের মত একটি আন্তর্জাতিক প্রকাশকও সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন শুধুমাত্র সম্ভাব্য ব্লাসফেমী আইনে অভিযুক্ত হওয়ার আশংকায়।  সারা পৃথিবী জুড়েই এই রকমের বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে ব্লাসফেমী আইনগুলো বহু  সৃজনশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে যা সকল অর্থেই অগ্রহণযোগ্য ও অন্যায্য।

ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সহিংসতার সমর্থন দেয়া  – সারা পৃথিবীতেই বিশেষত উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে ব্লাসফেমী আইন খুব সক্রিয় ভাবেই ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মীয় সহিংসতাকে সমর্থন দিয়ে থাকে। ভারতীয় যুক্তিবাদী সংস্থার সাবেক সভাপতি, সানাল এডামারুকু (Sanal Edamaruku) ২০১২ সালে যখন মুম্বাইয়ের একটি চার্চ কর্তৃক ঈশ্বরের ‘অলৈকিকতা’ বলে দাবী করার কিছু ঘটনাকে মিথ্যা প্রমাণ করার দাবী করেন তখন মুম্বাইয়ের ক্যাথলিক চার্চ তার বিরুদ্ধে ব্লাসফেমী আইনে মামলা করেন ফলে তিনি দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ব্লাসফেমী আইনের উপস্থিতির কারণেই বাংলাদেশে ইসলামী মোল্লাতন্ত্র তসলিমা নাসরিনের মাথার দাম ঘোষণা করে তাঁকে দেশ ছাড়া করতে বাধ্য করেন কিংবা হেফাজতে ইসলামীর আমীর যখন বলেন ‘নাস্তিকদের কতল করা ওয়াজিব হয়ে গেছে’, তখন শুধু সুন্নি ইসলামের সহিংস চেতনাই  নয়, রাষ্ট্রের ব্লাসফেমী আইনও তার এই দাবীকে শক্তি যোগায়।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপড়ে নিপীড়ন – প্রায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই সকল আইন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের নিপীড়নকে বৈধতা দেয়, ভয়ংকর রকমের গনরোষ ও গনআতংককে ছড়িয়ে দেয় । সমগ্র ভারতবর্ষে, অর্থাৎ ভারতে হিন্দু ধর্মগুরু, পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে সুন্নি-দেওবন্দী মোল্লাতন্ত্র এরা সকলেই সারা বছর ধরে ধর্মীয় গোঁড়া আদর্শবাদ প্রচার করে থাকেন, ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি তীব্র ঘৃণা ছড়িয়ে থাকেন কেবলমাত্র রাষ্ট্রের ব্লাসফেমী আইনের সুরক্ষা নিয়েই। কেননা এরা জানেন সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে ব্লাসফেমী আইন প্রয়োগ করা হয়না। পাকিস্তানে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপরে বা বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে গত পঞ্চাশ বছরের অব্যাহত নিপীড়ন শুধুমাত্র বিশ্বাসের উপরে ভর করে হয়ে থাকেনা, রাষ্ট্র সেখানে পরোক্ষ ভাবে হলেও একটি কারক হিসাবে উপস্থিত থাকে তার নানান ধরনের আইন নিয়ে, ব্লাসফেমী আইন তাদের অন্যতম।

এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারতবর্ষের অর্থাৎ আজকের ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ব্লাসফেমি আইনের প্রেক্ষিতের পর্যালোচনা করা এবং বিশেষত উপরে উল্লেখিত মানবাধিকার কর্মীদের যুক্তি বা বিবেচনার শেষ পর্যবেক্ষণটি ভারতবর্ষের এই দেশগুলোতে কিভাবে বিদ্যমান সেই দিকটি তুলে ধরা হবে।

ভারতবর্ষের ’ব্লাসফেমি’র আলোচনা ঠিক কোথা থেকে শুরু করা যেতে পারে? ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এই তিনটি দেশের মাঝে এতো বিপুল রাজনৈতিক বৈচিত্র্যময়তা যা যেকোনো বিষয়ে এই তিনটি দেশের আলোচনার মাঝে প্রতিফলিত হতে বাধ্য। ভারত একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে দাবী করে থাকে নিজেদেরকে। পাকিস্তান একটি ইসলামিক রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে দাবী করলেও এটা সত্যি গত চল্লিশ বছর ধরে অব্যাহত ইসলামীকরনের কারণে ক্রমশই একটি ইসলামী মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।কিন্তু ব্লাসফেমী আইনের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে এই তিনটি দেশেরই উত্তরাধিকার একই। ভারতে দীর্ঘ নয়শো বছরের মুসলিম শাসন চললেও এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে সেই অর্থে কোন সুনির্দিষ্ট ব্লাসফেমী আইনের অস্তিত্ব ছিলোনা যদিও ইসলামী আইনের অনুশাসনে ব্লাসফেমী সবসময়ই ভয়ংকর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য ছিল। ভারত প্রথম বারের মত ব্লাসফেমী আইনের সাথে পরিচিত হয় ব্রিটিশ উপনিবেশের শাসকদের হাত ধরে। ভারতীয় দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর একটা পুরো অধ্যায় রয়েছে ধর্মের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতার বিচারের জন্যে, বিশেষত পনেরো তম অধ্যায়ের ২৯৫ থেকে ২৯৮ পর্যন্ত ধারাগুলো এই ধরনের অপরাধের বেলায় ব্যবহার হোতো। ভারতীয় দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর অনুচ্ছেদ ১৫ এর ধারা ২৯৫ ঠিক এভাবে লেখা এই অংশটুকুই ব্যবহার করা হোতো ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগের বিচারের জন্যে (৬)।

Whoever destroys, damages or defiles any place of worship, or any object held sacred by any class of persons with the intention of thereby insulting the religion of any class of persons or with the knowledge that any class of persons is likely to consider such destruction, damage or defilement as an insult to their religion, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to two years, or with fine, or with both.

কিন্তু এই ধারাগুলোর কোনটাই খুব স্পষ্ট ভাবে ব্লাসফেমী বলে বিবেচিত হবার মত ছিলোনা, এবং ২৯৫ এইধারাটিও বরং ধর্মের অবমাননার চাইতেও ‘ঘৃণাবাদ’ বা ‘Hate speech’ কে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য প্রণীত হয়েছিলো, যদি ধর্মীয় ঘৃণার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান, ভবন, প্রার্থনালয় ধ্বংস করা হয় তার বিচারের উদ্দেশই প্রণীতহয়েছিলো। পরবর্তীতে  ভারতীয় দণ্ডবিধিতে এই ২৯৫ (এ) ধারাটি যুক্ত করা হয় ১৯২৭ সালে, এর তিন বছর আগে অর্থাৎ ১৯২৪ সালে যখন মহাশয় রাজপাল নামের একজন লেখক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন ‘রঙ্গিলারসুল’ নামে যা মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে অসন্তোষ তৈরি করে কিন্তু এই অপরাধের বিচার করার মত কোন আইনভারতীয় দণ্ডবিধিতে ছিলোনা তখন। যথাযথ আইনের অভাবের কারণে মহাশয় রাজপাল এই মামলা থেকেঅব্যাহতি লাভ করেন এবং আদালত এই মর্মে মতামত ব্যক্ত করেন যে এই ধরনের অভিযোগ এর বিচারের জন্যেযথাযথ আইন প্রণয়ন দরকার। উপনিবেশিক প্রশাসকেরা যখন এই আইনটি তৈরি করে সেই সময়ের সংসদেআলোচনার জন্যে উত্থাপন করেন, প্রায় সকল আলোচক এই আইনটির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন এবংতৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ একটি আগ্রহ-উদ্দীপক মন্তব্য করেন, তিনি উল্লেখ করেন যেএই আইনটি দরকারি তবে এর সাথে এটা খেয়াল রাখা জরুরী যে যারা ধর্মের যৌক্তিক সমালোচনা করতে চান বাকরেন তাদের সেই অধিকারটিও যেন সুরক্ষিত থাকে (৭)। এই পুস্তিকাটি সেই সময়ের মুসলিম সমাজের মাঝে তীব্রঅসন্তোষের জন্ম দেয়, যদিও এই পুস্তিকাটিও লেখা হয়েছিলো মুসলমানদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত  আরওএকাধিক বইয়ের জবাব হিসাবে যে সকল প্রকাশনার ফলে হিন্দু ধর্মের প্রতি বিদ্রূপাত্মক বলে হিন্দু সম্প্রদায়েরমাঝে সৃষ্ট উত্তেজনার কারণে। কিন্তু অবধারিত পরিণতি হিসাবে এই পাল্টাপাল্টি লেখালেখির কারণে ব্রিটিশউপনিবেশিক সরকার ভারতীয় দণ্ডবিধিতে আরও সুনির্দিষ্ট ও কঠোর এই ধারার সংযুক্তির ভিত্তি খুঁজে পায় ।যদিও ১৯২৭ সালে কোন যথাযথ আইনের অভাবের কারণে ‘রঙ্গিলা রসুল’ পুস্তিকার লেখক মহাশয় রাজপালঅভিযোগ থেকে অব্যাহতি লাভ করেন কিন্তু ১৯২৯ সালে তাঁকে প্রাণ দিতে হয় মুসলিম আক্রমণকারীদের হাতে।আরও বহু আইনের মতই ব্রিটিশ উপনিবেশের পতনের পরেও, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভকরার পরেও এই আইনটি একই ভাবে এই তিনটি দেশেরই ব্লাসফেমী আইন হিসাবে রয়ে গেছে।

ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হয়ে জওহরলাল নেহরু’র নেতৃত্বে যে ভারত প্রতিষ্ঠিত হয় সেই ভারতেররাজনৈতিক মর্ম-শাঁস বা Political Essence হিসাবে গৃহীত হয়েছিলো সমাজতান্ত্রিক ধরনের অর্থনীতি ওউদারনীতিবাদী গণতন্ত্র, সেকুলার তথা ভারতীয় ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতা যা সকল ধর্মের সহাবস্থান ও চর্চারঅধিকার নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি নাগরিকের সকল ধরনের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ফলে, স্বাধীনতার পরপরই নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতার সাথে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫ (এ) ধারাটির বিরোধপ্রকাশ্য হয়ে পড়ে এবং তা ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের একটি প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে শুরু থেকেই।সুশীল নাগরিক, আইন গবেষক ও মানবতাবাদীদের কাছে একটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে যে ভারত রাষ্ট্রেরসেকুলার ও উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক চরিত্রের সাথে কি ব্লাসফেমী আইন স্ববিরোধী কিনা? আইন বিশেষজ্ঞরামতামত দিয়েছেন ভারতের দণ্ডবিধির ২৯৫ (এ) অংশটি নিরীশ্বরবাদী ও অজ্ঞেয়বাদী মানুষদের সংবিধানপ্রতিশ্রুত নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী (৮)

যদিও ভারতের কেন্দ্রীয় দণ্ডবিধির অধীনে ২৯৫ (এ) ধারাটিতে বেশ কিছু কৌশলী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছেযেখানে বিচারকের নিজস্ব বিবেচনাবোধের ব্যবহারের উপরে নির্ভর করবে। এই আইনটির বর্ণনায়  অন্তত দুটিশর্ত বা ধারনার অর্থ খুবই অস্বচ্ছ ও অনির্দিষ্ট এবং দারুণ ভাবে ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার উপরে নির্ভর করবে।যেমন – ‘Deliberate’ ও  ‘Malicious intention’ এই দুটি শব্দের বোঝাপড়ার উপরেই নির্ভর করবে এইধরনের অভিযোগের বিচার পদ্ধতি ও রায় কি হবে (৯)।

“Whoever, with deliberate and malicious intention of outraging the religious feelings of any class of citizens of India, by words, either spoken or written, or by signs or by visible representations or otherwise insults or attempts to insult the religion or the religious beliefs of that class, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to three years, or with fine, or with both”.

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে দণ্ডবিধির ২৯৫ (এ) ধারাটির পরিবর্তন লক্ষ্যকরা যাচ্ছে এবং এই পরিবর্তনগুলো বেশীরভাগই আরও কঠিন ব্লাসফেমী আইনের প্রবর্তনের লক্ষণ নিয়ে হাজিরহচ্ছে। ভারতের কোনও কোনও রাজ্য তাদের নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কেন্দ্রীয় দণ্ডবিধিকে আরও সংশোধনকরে নতুন নতুন বিধি যুক্ত করেছে, কখনো কখনো এই সকল নতুন সংযুক্তি কেন্দ্রীয় আইনকে আরও সম্প্রসারিতরূপে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে। যেমন সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে কেন্দ্রীয় দণ্ডবিধির২৯৫(এ) সংশোধন করে আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে, এই সংশোধিত রাজ্য আইনে আরও সুনির্দিষ্ট ভাবে বলেদেয়া হয়েছে কোন কোন ধর্ম সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবে। পাঞ্জাব রাজ্যসভার এই সংশোধনের ফলে এই আইনটিরব্যাখ্যা যা সংযুক্ত হয়েছে তা হচ্ছে –

“whoever causes injury, damage or scarilege to Sri Gurugranth Sahib, Srimad Bhagwad Gita, Holy Quran and Holy Bible with the intention to hurt the religious feelings of the people, shall be punished with imprisonment for life.”

পরবর্তীকালে আরেকটি সংশোধনী অবশ্য শাস্তির মেয়াদ সর্বোচ্চ দশ বছর করা হয়, এই সংশোধনীতে স্পষ্টবোঝা যাচ্ছে চারটি ধর্ম গ্রন্থকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কেননা পাঞ্জাবের স্থানীয় রাজনীতিতে এই চার ধর্মীয়সম্প্রদায় হচ্ছে প্রধান ক্ষমতার উৎস। প্রধান ধর্মগুলোকে সুরক্ষা দেয়ার মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতিবিদেরা একধরনের কথিত ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’ দেখানোর ভান করলেও এটা প্রকৃত অর্থে সেকুলার রাষ্ট্রের আদর্শের পুরোপুরিবিপরীত অবস্থান। আরও উল্লেখ্য যে এই আইনের ফলে, পাঞ্জাবের দলিত সম্প্রদায় যারা মোট অধিবাসীর প্রায়৩২% এবং অন্য দুটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ নিরীশ্বরবাদী ও অজ্ঞেয়বাদী মানুষের নাগরিকঅধিকারকে খর্ব করা হয়েছে এবং এই সকল সংখ্যালঘু মানুষদের সামাজিক জীবনকে বিপদসংকুল করে তোলাহয়েছে (১০)।

ভারতের বিচার ব্যবস্থা পাকিস্তান বা বাংলাদেশের চাইতে অনেক বেশী স্বাধীন ও সুসংহত। যদিও সাম্প্রতিকসময়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ধারা ও সরকার বিচার বিভাগের উপরে নানান ভাবে হস্তক্ষেপ করারনজির দেখিয়েছে, তার পরেও ভারতের বিচার ব্যবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে অনেক বেশী স্বাধীন।বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কারণেই এখানে ব্লাসফেমী আইনের চূড়ান্ত প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগেরনিয়ন্ত্রণটি বেশ সুস্পষ্ট কিন্তু মোটের উপরে নাগরিকের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এর রাজনৈতিক প্রভাবভয়ংকর।  ধরুন খুব সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় ক্রিকেট তারকা মহেন্দ্র সিং ধোনীর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননারএকটি মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন ভারতেরই বেশ কয়েকজন হিন্দু ধর্মপ্রেমিক নাগরিক। ভারতের ক্রিকেট নায়কমহেন্দ্র সিং ধোনীর সাথে ভগবান বিষ্ণুর তুলনামূলক একটি ছবি দিয়ে একটি পত্রিকার প্রচ্ছদ করার ঘটনা থেকেবিষয়টির সূত্রপাত। কর্ণাটক ও অন্ধ্র প্রদেশসহ তিনটি রাজ্য থেকে ক্রিকেটার ধোনীর বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়এবং এর মধ্যে একটি আদালত মহেন্দ্র সিং ধনীর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করেন।ব্যাপারটি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ভারতের মহামান্য আদালত বিষয়টিকে ভগবান বিষ্ণুর অবমাননা হিসাবেবিবেচনা করেন নি, এমন কি এই প্রচ্ছদের মধ্যে দিয়ে কোন রকমের ধর্ম অবমাননা হয়েছে বলে মনে করেননি, এবং সবচাইতে প্রধান বিষয় হিসাবে আদালত যা উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছে এই পুরো বিষয়টির সাথে কোন ‘মন্দউদ্দেশ্য’ বা ‘Evil intention”’ যুক্ত ছিলোনা। ফলে আদালত এই মামলাটিকে খারিজ করে দেন এবং এইবিষয়টিকে ‘ব্লাসফেমী’ বা ‘ধর্ম অবমাননা’ হিসাবে গ্রহণ করেননি। পুরো ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ যারা পড়েদেখবেন এবং নিজেদের কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ করবেন, তাঁরা সকলেই একমত হবেন যে বিষয়টির সাথে ধর্ম অবমাননার কোন যোগসূত্রই ছিলোনা, পুরো বিষয়টিই ছিল কেবল ক্রিকেট ভক্ত ভারতীয়দের ভালোবাসার প্রকাশ এবং এই প্রকাশের অধিকার আছে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের। কিন্তু মহেন্দ্র সিং ধোনীর মত সৌভাগ্যবান ছিলেন না ভারতের দারুণ খ্যাতিমান শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন।যদিও ভারতের সরবোচ্চ আদালত মহেন্দ্র সিং ধোনীর মতো মকবুল ফিদা হুসেনকেও রক্ষা করেছিলেন, কিন্তু হুসেনের অভিজ্ঞতাটি ছিল একেবারেই অন্য রকমের।  ধোনী ও হুসেন এর ঘটনা দুটি বিবেচনা করলে বোঝা যাবে ব্লাসফেমী আইন সংখ্যালঘু মানুষের জন্যে কি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, এমনকি সেটা যদি ভারতের মত সেকুলার ও গণতান্ত্রিক দেশেও হয়, এমন কি সেটা যদি ভারতের মত স্বাধীন বিচার বিভাগের অধীনেও হয়। মকবুল ফিদা হুসেন চল্লিশের দশক থেকে ভারতের বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্র ভিত্তিক ছবি আঁকেন। এই রকমের একটি ছবি তিনি এঁকেছিলেন ষাটের দশকে যেখানে একজন নগ্ন নারী ভারতের মানচিত্রের সাথে সংলগ্ন হয়ে আছেন। তিনি একজন সাধারণ চিত্র সংগ্রাহকের কাছে এই ছবিটি বিক্রি করেছিলেন। নব্বুইয়ের দশকে কোনো একটি দাতব্য অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগে সেই চিত্রকর্মটিকে নিলামে ওঠানো হয়, কেননা ততদিনে মকবুল ফিদা হুসেন ভারতের একজন শ্রেষ্ঠ চিত্রকর হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছেন। সেজন্যেই হুসেনের এই ছবিটির নাম সেই অজ্ঞাতনামা সংগ্রাহক দেন ‘মাদার ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারত মাতা’ এবং সেই ছবিটিকে নিলামে তোলা হয় অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য মহান হলেও ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ছবিটির উদ্দেশ্যের চাইতেও বড় হয়ে দেখা দেয় একজন নগ্ন নারী ভারতের পতাকা ও মানচিত্রের সংলগ্ন হয়ে আছে, যাকে দেখতে অনেকটাই হিন্দু দেবী দুর্গার মতন দেখতে মনে হয় এবং এই ছবিটি ভারতের একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য এম এফ হুসেনের আঁকা। আর যায় কোথায়, সারা ভারত ফুঁসে ওঠে হুসেনের বিরুদ্ধে। সারা ভারতের বিভিন্ন আদালতে অজস্র মামলা করা হয় তাঁর বিরুদ্ধে, সলিল ত্রিপাঠীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৬ সালে হুসেইনের বিরুদ্ধে মোট প্রায় বারোশো মামলা ঝুলছিল ভারতের বিভিন্ন আদালতে (১১)।  হুসেনের বাড়িঘর ভেঙ্গে চুরমার করা হয়, তার শিল্পকর্ম  ধ্বংস করা হয় এমন কি ভারতের বাইরে তার শিল্প কর্মের প্রদর্শনীর উপরেও চড়াও হয় ভারতের হিন্দুত্ববাদিরা (১২)। প্রাণ রক্ষার জন্যে ২০০৭ সালে অশীতিপর বৃদ্ধ হুসেন ভারত  থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ভারতের আদালত হুসেনের ছবিটিতে ‘অশ্লীল’ কিছু খুঁজে পাননি, এমন কি চিত্রকর্মটিতে কোনো জাতীয় প্রতীকের প্রতি অবমাননাকর কিছু পাননি। আদালত উল্লেখ করেন যে কোনো ব্যক্তি বিশেষের মনে যদি এই ছবিটি আঘাত দিয়ে থাকে সেটাই এই ছবিটিকে অশ্লীল উপকরণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেনা। আদালত চিত্রকর্মটিকে একটি শিল্পকর্ম হিসাবে উল্লেখ করেন এবং এটা শিল্পীর স্বাধীনতার অংশ হিসাবেই রায় দেন (১৩)। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট রায়ে  নির্দোষ প্রমাণিত হবার পরেও হত্যার হুমকি থাকার কারণে তিনি আর কখনোই ভারতে ফিরতে পারেন নি। কাতার, আরব আমিরাত, ইংল্যান্ড সহ বেশ কয়েকটি দেশে পলাতক জীবন যাপন করে তিনি পলাতক অবস্থাতেই মৃত্যু বরন করেন (১৪)।

ব্লাসফেমী আইন কিভাবে জনগণের জন্যে নিপীড়নমূলক হতে পারে তাঁর বহু প্রমাণ রয়েছে ভারতে, তবে এই দুটি বহুল আলোচিত মামলার উদাহরণ থেকে বিষয়টি বোঝা যেতে পারে। ব্লাসফেমী আইনের উপস্থিতি এই ধরনের নিপীড়নমূলক ঘটনাকে উস্কে দেয় দেশে দেশে। আর যদি আক্রমণের লক্ষ্য কেউ হয়ে থাকেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের, তাহলে তাঁর উপড়ে নিপীড়নের মাত্রা হয় বহুগুন বেশী, প্রখ্যাত চিত্রকর মকবুল ফিদা হুসেনের ঘটনাটি সারা পৃথিবীতেই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে আছে। প্রথমত ভারতের ব্লাসফেমী আইন উগ্রপন্থী হিন্দুত্ববাদীদেরকে এই সুযোগটি করে দিয়েছে দেশের দুই ক্ষেত্রের দুজন দায়িত্ববান সুখ্যাত মানুষের ব্যক্তি জীবনকে ধ্বংস করে দেবার এবং এদের মাঝে একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হবার কারণে তাঁর উপরে নিপীড়নের ভয়াবহতা ছিল সত্যিই ভয়ংকর। কেবলমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ হবার কারণেই ভারতে হুসেনকে যে পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে একই রকমের বহু পরিণতি ঘটেছে পাকিস্তানের খ্রিষ্টান ও আহমদীয়া সম্প্রদায়ের বেলাতে, বাংলাদেশে হিন্দু বা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের উপরে।

আজ থেকে প্রায় এগারো বছর আগে, ২০০৯ সালের জুন মাসে, লাহোরের কাছাকাছি কোনো একটা গ্রামের মহিলারা মাঠে কাজ করছিলেন এবং এক পর্যায়ে তাদের মাঝে তর্কাতর্কি ও বিবাদের সূত্রপাত ঘটে। ঘটনাটি খুব সামান্যই ছিল, পুরো দলের মাঝে একমাত্র আসিয়া বিবি ছিলেন ধর্মীয় পরিচয়ে খ্রিস্টান বাকিরা সবাই মুসলমান এবং সেই দলের সাথে থাকা পানি পান করার গ্লাসটি তিনি ব্যবহার করে ফেলেছিলেন, ব্যস, দলের অন্য মুসলিম মহিলারা সেই গ্লাসে পানি খেতে অস্বীকৃতি জানান কেননা পাকিস্তানে মুসলমানদের কোনো কোনো অংশের কাছে একজন খ্রিষ্টান ‘অপবিত্র’, ‘অচ্ছুত’ মানুষ, এমন কি তাঁরা সকলেই অর্থনৈতিক দিক থেকে চরম দরিদ্র ও নিঃস্ব হলেও, অর্থাৎ এখানে শ্রেণী মৈত্রীর চাইতেও অনেক বড় হয়ে ওঠে ধর্মীয় ঘৃণা ও বিরোধ। মহিলাদের মাঝের এই বিবাদটি শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং বিচিত্র কারণবশত খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারী আসিয়া বিবি’র বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ দেয়া হয়, ইসলাম ধর্মের অবমাননার অভিযোগে নিম্ন আদালতে তিনি অপরাধী সাব্যস্ত হন এবং পাকিস্তানের ধর্ম অবমাননার ধারা ২৯৫-সি অনুযায়ী নিম্ন আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে (১৫)। আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি উচ্চ আদালতে আসিয়া বিবি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন এবং তিনি একটি নিরাপদ দেশে আশ্রয় লাভ করেছেন,  কিন্তু আসিয়া বিবির এই ঘটনার সাথে সংশ্লিস্ট হয়ে দুটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।  পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসির আসিয়া বিবির এই ঘটনাটিতে সহমর্মিতা জানিয়েছিলেন এবং তিনি ব্লাসফেমী আইনের এই ধারাটির সমালোচনা করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন এই আইনটির সংশোধন দরকার।ব্লাসফেমী বিষয়ে  পাকিস্তানের রাজনৈতিক-সামাজিক সংস্কৃতি এতোটাই ভয়ংকর যে সালমান তাসিরের মতো একজন ক্ষমতাবান ও মূলধারার শীর্ষ রাজনীতিবিদকেও প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে তাঁরই দেহরক্ষী মমতাজ কাদির। পরবর্তীকালে আদালতের রায়ে মমতাজ কাদিরকে খুনের দায়ে ফাঁসিতে প্রাণ হারাতে হয়। অথচ আসিয়া বিবিকে পাকিস্তানের শীর্ষ আদালত বেকসুর খালাস দেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটিকে ‘উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ হিসাবে রায় দেন। ব্লাসফেমী আইনের কি ভয়ংকর অপব্যবহার আর ব্যক্তির জন্যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা আসিয়া বিবি, সালমান তাসির ও মমতাজ কাদির এর পরিণতি থেকে আমরা বুঝতে পারি।

কিংবা ২০১৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী (বর্তমানে সাবেক) নওয়াজ শরীফ যখন যখন ঘোষণা করেন যে ইন্টারনেটে ‘ব্লাসফেমী’ ধরনের লেখালেখির বিরুদ্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সরকার কঠোর ভূমিকা পালন করবে, ঠিক তার দুই সপ্তাহের মাথায় খুন হন পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মাশাল খান (১৬)। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে মাশাল খান’কে আক্রমণ করেন তারই সহপাঠীরা, তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখির অভিযোগ আনা হয়। তাকে পেটানো হয় লাঠি দিয়ে, চেয়ার দিয়ে,ফুলদানি আর ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়া হয় এবং সবশেষে খুব কাছ থেকে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। এই কথিত ধর্ম অবমাননার ‘শাস্তি’ দেবার জন্যে যে ‘ধর্মপ্রাণ’ মুসলমানেরা তাদেরই একজন সহপাঠীকে খুন করলো এমন প্রায় ৬৭ জনকে পুলিশ পরে গ্রেফতার করে এবং এদের মাঝে এক জনের মৃত্যুদণ্ড, পাঁচ জনকে যাবতজীবন কারাদণ্ড ও অন্যান্যদের এক বছর থেকে চার বছরের জেল দেয়া হয়। ব্লাসফেমী অভিযোগে ‘অভিযুক্ত’ কারো জানাজা পড়ার জন্যেও কোনো লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি, মাশাল খানের জানাজার ইমামতি করতে হয়েছিলো তার বাবাকে, প্রতিবেশীরা সেই জানাজায় আসেননি।  পরবর্তীকালে পুলিশের তদন্তে মাশাল খানের লেখালেখি থেকে কোনো ধরনের ধর্ম অবমাননার বিষয় খুঁজে পায়নি পুলিশ (১৭)। এটাই হচ্ছে সমাজে ব্লাসফেমী আইনের উপস্থিতি আর তার সাথে যখন যুক্ত হয় ধর্মান্ধ রাজনীতি তার ফলাফল।

হ্যাঁ, পাকিস্তানের অবস্থা এতোটাই ভয়ঙ্কর যে, সংখ্যালঘু ও ভিন্ন ধর্মের মানুষেরা জানেননা যে কে কোথায়, কখন ধর্ম অবমাননা বা ইসলাম ও তার নবীর অবমাননার জন্যে অভিযুক্ত হবেন।  সারা পৃথিবীতেই পাকিস্তানের ব্লাসফেমী আইন খুব আতংকজনক হিসাবে করে উল্লেখ করা হয়। ব্লাসফেমী নিয়ে বিদ্যায়তনিক গবেষণায় পাকিস্তান একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে, বিশেষত সাম্প্রতিক সময়ে ব্লাসফেমীর নামে খ্রিস্টান ও আহমদীয়া সম্প্রদায়ের উপরে অব্যাহত নিপীড়নের কারণে।

ভারত যেমন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলো তার শুরুর দিকে, পাকিস্তানের শুরুটা হয়েছে উল্টো পথে, প্রথম থেকেই পাকিস্তান একটি সেকুলার রাষ্ট্রের বদলে একটি ইসলামী রাষ্ট্র হতে চেয়েছে, এর প্রতিষ্ঠাতা রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই সেকুলার মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তারা পাকিস্তান কে গড়ে তুলতে চেয়েছেন একটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে।পরবর্তীতে পাকিস্তান একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবার পথ থেকেও বিচ্যুত হয়ে পড়ে এবং দেশটির ইতিহাসের একটা বিরাট সময় ধরে এখানে শাসন করেছেন সামরিক শাসকেরা। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটিতে প্রায় চার দশক ধরে চলেছে প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন এবং যে সময়কালে বেসামরিক সরকার গঠিত ছয়েছে সেই সকল সরকারেরও প্রধান নিয়ন্ত্রণ ছিল সামরিক বাহিনীর হাতেই।সমাজের, রাজনীতির, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইসলামীকরণ ছিল প্রতিটি সামরিক সরকারের নিজেদেরকে জায়েজ করে তোলার প্রধান হাতিয়ার। এই ইতিহাসের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন পাকিস্তানের সামরিক রাষ্ট্রপ্রধান প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক। জিয়াউল হকের সামরিক শাসনের ১৯৭৭ – ৮৮ এই সময় কালের মধ্যে পাকিস্তানে কঠোর শরিয়া আইন চালু হয়, গঠিত হয় শরিয়া আদালত। এই সকল ইসলামীকরণের ফলে নানান ধরনের অন্যায় বিধিনিষেধের শিকার হন পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যেমন; হিন্দু, খ্রিষ্টান, আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা, বিধিনিষেধের ফলে নারীদের জীবনযাপনও হয়ে পড়ে সংকুচিত। এই সময় কালেই জেনারেল জিয়াউল হক উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভারতীয় দণ্ডবিধির ব্লাসফেমী আইনটিকে আরও অনেক বেশী কঠোর করে তোলেন, পাকিস্তানে এই ধারাটির সাথে আরও পাঁচটি অতিরিক্ত ধারা সংযুক্ত করেন যা সুনির্দিষ্ট ভাবে ইসলাম ধর্মকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে, বিশেষত আহমদিয়া সম্প্রদায়কে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার জন্যে। এই নতুন পাঁচটি ধারার মাঝে ২৯৫-বি সুস্পষ্ট ভাবে কুরআন শরীফের অবমাননার বিরুদ্ধে, ২৯৫-সি ইসলামের নবী মুহাম্মদের অবমাননার বিরুদ্ধে এবং ২৯৮ এ, বি এবং সি  সংযুক্ত করা হয় সুনির্দিষ্ট ভাবে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের বিরুদ্ধে। আধুনিক সময়ের কোনও একটি রাষ্ট্র তাঁর নিজেরই জনগণের বিরুদ্ধে এইভাবে কোনো আইন প্রণীত করতে পারে পাকিস্তান সম্ভবত তার বিরল একটি উদাহরণ।

জেনারেল জিয়াউল হক নিহত হন ১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে কিন্তু পাকিস্তানের ইসলামীকরণ থেমে থাকেনি তাঁর মৃত্যুতে। ১৯৯০ সালে পাকিস্তানের শরিয়া আদালতে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয় এই মর্মে যে নবী মুহাম্মদের অবমাননার জন্যে যে আইনি ধারাটি অর্থাৎ ২৯৫ – সি, সেখানে শাস্তির মেয়াদকে যথেষ্ট কঠিন করা হয়নি এই অভিযোগে, দেশটির ইসলামী মোল্লাতন্ত্র দাবী করে ২৯৫-সি এ ধারাটির সংশোধন করতে হবে এবং নবী মুহাম্মদের অবমাননার শাস্তি হিসাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নয় বরং মৃত্যুদণ্ডই ‘একমাত্র’ শাস্তির বিধান হিসাবে সংযুক্ত করতে হবে। এই সংশোধনীটি পরে আইন হিসাবে যুক্ত হয় ফলে পাকিস্তানেই পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন ও ভয়ংকর ব্লাসফেমী আইনের প্রবর্তন হয়। ইসলামের নবীর সমালোচনার জন্যে মৃত্যুদণ্ড এবং ‘কেবলমাত্র’ মৃত্যুদণ্ডকেই শাস্তি হিসাবে বহাল করা হয়। পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যেখানে একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে টার্গেট করে ব্লাসফেমী আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, আহমদিয়া সম্প্রদায় যদি নিজেদেরকে মুহাম্মদের অনুসারী বলেন কিংবা আল্লাহর কাছে প্রার্থনার কথা বলেন সেটা ব্লাসফেমী বলে গণ্য হবে পাকিস্তানের আইনে।

প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে ১৯৮৬ সালে পাকিস্তানের সংসদে ব্লাসফেমী আইনের ২৯৫-সি ধারাটির সংশোধন নিয়ে বিতর্ক হয়। এই সংসদীয় বিতর্কে সেই সময়কার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মীর নাওয়াজ খান মারোয়াত পাকিস্তানের সুন্নি উলেমাদের পরামর্শ মতে পাকিস্তানের ব্লাসফেমী আইনকে আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেন, পাকিস্তানের বিদ্যমান ব্লাসফেমী আইনকে সংশোধন করে ইসলাম ও এর নবী মুহাম্মদের যেকোনো ধরনের ‘অবমাননা’র শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড এবং কেবল মৃত্যুদণ্ড রাখার প্রস্তাবনা নিয়ে আসা হয় যা ১৯৯১ সাল থেকে কার্যকর হয় । পাকিস্তানী দণ্ডবিধি (PPC 295-C) সংশোধনের প্রাক্বালে জনাব মারোয়াত খান  উল্লেখ করেন –

“আমার মনে হয় এই সংশোধনীর মধ্যে দিয়ে এই আইনটি এতোটাই কঠিন হবে যে ভবিষ্যতে আর কেউই কখনোই আমাদের মহান নবীজী কে কোনো রকমের অবমাননা করার সাহস দেখাবে না”  (১৮)

কিন্তু আজকে দাঁড়িয়ে এটা প্রায় নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে মীর নাওয়াজ খান মারোয়াত এর সেই ভবিষ্যতবাণী ও প্রত্যাশা সম্পূর্ণ ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কেননা ইতিহাস আমাদেরকে বলছে ১৯২৭ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে ব্লাসফেমী অপরাধের সংখ্যা ছিল মাত্র দশটি আর ১৯৮৫ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই তিরিশ বছরে পাকিস্তানের আদালতে ব্লাসফেমীর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে প্রায় চার হাজার, জ্বী সংখ্যাটি হচ্ছে পাকিস্তানের প্রথম আটান্ন বছরে দশটি মামলা আর পরের তিরিশ বছরে চার হাজার মামলা (১৯)। আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই সকল মামলার প্রায় আশি শতাংশই উচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে গেছে কেবল ‘ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ মামলা হিসাবে।  এই সংখ্যাগুলো সুস্পষ্ট ভাবে বলছে ব্লাসফেমী আইন কখনোই ধর্মকে সুরক্ষা দিতে পারেনা বরং এই আইন কেবল জনজীবনে বিভাজন তৈরি করতে পারে, সংখ্যালঘু মানুষদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে এবং যেকোনো বিবেচনায় এই আইন মানুষের গণতান্ত্রিক নাগরিক অধিকারকেই হরণ করে। আর সবচাইতে অনৈতিক ও ভয়ংকর হচ্ছে এর অযথাযথ ব্যবহার,শত্রুতামূলক ও বিদ্বেষপ্রবণ ব্যবহার।

এর পরেও পাকিস্তানের শরিয়া আইন আরও ভয়ংকর আইনের সুপারিশ করেছে। পাকিস্তানের শরিয়া আদালতের মতে ব্লাসফেমীর সংজ্ঞা নিম্নরূপ –

“লিখিত বা বক্তৃতায় নবীকে গালি দেওয়া বা অপমান করা; তাকে বা তার পরিবার সম্পর্কে অবজ্ঞাপূর্ণ বা অবজ্ঞার সাথে কথা বলা; অবমাননাকরভাবে নবীর মর্যাদা ও সম্মানকে আক্রমণ করা; যখন তাঁর নাম উল্লেখ করা হয় তখন তাকে অসন্তুষ্ট হওয়া বা কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করা; তাঁর প্রতি, তাঁর পরিবার, তাঁর সঙ্গীদের এবং মুসলমানদের প্রতি শত্রুতা বা ঘৃণা প্রদর্শন; তাকে বা তাঁর পরিবার সম্পর্কে খারাপ মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়া সহ নবীজী ও তাঁর পরিবারকে অভিযুক্ত করা বা নিন্দা করা; নবীকে অপমান করা; কোনওভাবে নবীর এখতিয়ার, ক্ষমতা বা রায়কে অস্বীকার করা; সুন্নাতকে প্রত্যাখ্যান করা; আল্লাহ ও তাঁর নবীর অধিকারের প্রতি অসম্মান, অবজ্ঞা বা প্রত্যাখ্যান বা আল্লাহ ও তাঁর নবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখানো”

অর্থাৎ ইসলামের নবী মুহাম্মদকে নিয়ে যেকোনো ধরনের আলোচনাই পাকিস্তানে ব্লাসফেমী হিসাবে গণ্য হতে পারে কেননা ইসলামের অনুসারী নন এমন মানুষের পক্ষে উপরের এই সুপারিশে উল্লেখ করা অনেক শব্দ বা তার বাস্তবতা বোঝাটা সহজ নয়। এমন কি খোদ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যেও এই শব্দগুলোর অর্থ অনেক সময়ই বোঝা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এজন্যেই পাকিস্তানের ব্লাসফেমীর ইতিহাসে দেখা গেছে সংখ্যাগত দিক থেকে বহু মুসলিম নাগরিকের বিরুদ্ধেও ব্লাসফেমীর অভিযোগ আনা হয়েছে। এমন কি ধর্মীয় বিষয় নিয়ে Interpretation বা অনুধাবনের তফাতের কারণেও একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমী বা ধর্ম অবমাননার মামলা ঠুকে দিচ্ছেন। ব্লাসফেমী আইনের উপস্থিতি এবং এর সাথে উগ্রপন্থী ইসলামী রাজনীতি পাকিস্তানের নাগরিকদেরকে নানান সময়ে ভয়ংকর গন-সহিংসতা বা ‘Mob violence’ এর মতো ঘটনায় উদ্বুদ্ধ করেছে যার পরিণতি হয়েছে করুন। এই গন-সহিংসতার স্বীকার হয়ে কখনো প্রাণ দিয়েছেন মাশাল খানের মত তরুণ মেধাবী ছাত্র কিংবা কখনোবা রাতের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে তিনশো খ্রিস্টান পরিবারের বসবাস স্থান।

 

ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানের গর্ভ থেকে জন্ম নেয় বাংলাদেশ, ১৯৭১ সালে।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি সেকুলার সমাজ গড়ে তোলা যেখানে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই স্বাধীন বাংলাদেশ তার পাকিস্তানী উত্তরাধিকারকে ত্যাগ করেই একটি সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে উঠে দাঁড়াতে চেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে সরে আসতে শুরু করে। সেকুলার রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে এসে আবারো ইসলামী ভাবধারায় ফিরে যাওয়ার শুরুটা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই। পরবর্তীকালে সামরিক সরকারগুলো একের পর এক রাষ্ট্রীয় মূলনীতি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেকুলার বাংলাদেশকে একটি ইসলামী ভাবাদর্শের রাষ্ট্রে পরিণত করে। বাংলাদেশের এই অব্যাহত ইসলামী করনের প্রাথমিক কাজটি সাধিত হয় সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের হাত দিয়ে (২০)। বাংলাদেশের দুজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দিন এবং অধ্যাপক দিল রওশন আরা জিন্নাত নাজনিন তাদের একটি গবেষণা প্রবন্ধে মন্তব্য করেছেন যে –

“যেখানে স্বাধীন রাজনৈতিক সক্রিয়তা বিদ্যমান থাকে সেখান ইসলামিক আদর্শ রাজনীতি থেকে আলাদা অবস্থান করে, কিন্তু যেখানে সেই সম্ভাবনাটি খুব সীমিত এবং যেখানে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ অবিকশিত  এবং যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণের অধীনে কাজ করে সেখানেই রাজনীতির সাথে ধর্মের মিশ্রণ ঘটে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে এই ধর্মের জিকির শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধের সমর্থক ও প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদের দ্বারাই উচ্চারিত হয়না, সংরক্ষণবাদী ডানপন্থীদের দ্বারাও ব্যবহৃত হয়। ধর্মের এই শ্লোগানগুলো যেমন সমাজের বঞ্চিত মানুষের মাঝে একটি নোতুন সমাজের স্বপ্ন দেখানোরকাজে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে তেমনি আবার অভিজাত শ্রেনীর হাতেও এসব শ্লোগান শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দেয় Status Quo বা স্থিতাবস্থা কে বজায় রাখার জন্যে” (২১)।

ড এমাজউদ্দিন বলছেন, যেখানে স্বাধীন রাজনৈতিক সক্রিয়তা থাকে সেখানে ইসলামিক আদর্শ রাজনীতি থেকে আলাদা অবস্থান করে, এই বক্তব্যটিকে যদি আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করি, অন্তত গত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে, তাহলে সেই ইতিহাসটা কেমন?  বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধর্ম, বিশেষত সংখ্যাগুরুর ধর্ম হিসাবে ইসলাম মেহনতি মানুষের সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে উঠতে পারেনি, বরং ইসলাম ধর্ম হয়ে উঠেছে সামরিক – বেসামরিক অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের ও ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার। তাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সেকুলার আদর্শ থেকে সরে আসার যে যাত্রা শুরু হয়েছিলো তা শুরু থেকেই হোঁচট খেয়েছে ধর্ম আর রাজনীতির মিশ্রণে। যার শুরুটা হয় শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে আর তাকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে পরবর্তীকালের সামরিক – বেসামরিক অভিজাত রাজনৈতিক শক্তিগুলো।  অনেকটাই পাকিস্তানের কায়দায় দেশকে ইসলাম ও সামরিকতন্ত্রের মিশ্রণে একটি অদ্ভুত রাষ্ট্রে পরিণত করার কাজে ভূমিকা রাখে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। রাষ্ট্রের চরিত্র থেকে সকল ধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যকে বিদায় দেয়া হয় একের পর এক এবং নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তিকে সংহত করার জন্যে ধর্মকে রাজনীতির সাথে যুক্ত করা হয় এই সময় থেকেই। এই ধারা অব্যাহত থাকে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সামরিক- বেসামরিক আমলা ও ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক দল বিএনপি এমন কি সেকুলার রাজনীতির দাবীদার আওয়ামীলীগের রাজনীতির মধ্যে দিয়ে।যদি বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতির সাথে ধর্ম তথা ইসলামকে যুক্ত করার কাজটি শুরু করেছিলেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কিন্তু এখন পর্যন্ত ইতিহাস আমাদের জানায় যে কথিত ধর্ম অবমাননা বা ‘ব্লাসফেমী’ অপরাধের নামে নাগরিকদের উপরে নিপীড়নের সবচাইতে বেশী ঘটনা ঘটেছে সেকুলার দাবীদার শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগের আমলেই। এটা একটা সাম্প্রতিক গবেষণা আগ্রহের বিষয় যে শুধুমাত্র ধর্মভিত্তিক দলগুলো বা ডানপন্থী, সংরক্ষণবাদী দলগুলোই যে বাংলাদেশে ইসলামীকরনের পদক্ষেপ নিয়েছে তাদের রাজনীতিতে তা নয়, বরং সেকুলার দাবীদার আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটা বড়ো অংশের ইসলামীকরন বাস্তবায়িত হয়েছে (২২)।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে ঘোষিত ভাবে যে ব্লাসফেমী বিরোধী আইনটি রয়েছে তা আক্ষরিক অর্থেই ১৮৬০ সালের ব্রিটিশ আইনের সমার্থক যা পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে সম্প্রসারিত আইন হিসাবে ভারতে বহাল আছে (২৯৫ এ)। সেই অর্থে বাংলাদেশের ব্লাসফেমী আইনটি ভারতের মতই এবং তুলনামূলক ভাবে পাকিস্তানের চাইতে কম কঠোর। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই আইনের সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু ধারা যা কার্যত ব্লাসফেমী বিরোধী আইনেরই সমগোত্রীয়।বাংলাদেশের শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে সরকার, তা ক্রমশই ফ্যাসিবাদী চরিত্র লাভ করেছে সাম্প্রতিক দশকে এবং কঠিন নিয়ন্ত্রনবাদী সরকার হিসাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার সাম্প্রতিক সময়ে প্রবর্তন করেছে ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ যে আইনটি সকল অর্থেই একটি ব্লাসফেমী আইন, কেননা এখানে সকল অর্থেই নাগরিকের অধিকার হরণ করা হয়েছে এবং এর একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে ধর্মকে সুরক্ষা দেয়া। ইতিমধ্যেই এই আইনের ভয়ংকর সব প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে (২৩)।

সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম ব্লাসফেমী’র অভিযোগের শিকার হয়েছিলেন কবি দাউদ হায়দার। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭৩ সালে শুধুমাত্র কবিতা লেখার কারণে তাঁকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হয়। যদিওইসলামের ইতিহাসে, খোদ ইসলামের নবী মুহাম্মদের সময় থেকেই কবিদের প্রতি এক ধরনের সম্মিলিত বিদ্বেষ জারি থাকার ইতিহাস আমরা জানি, খোদ মুহাম্মদ কবিদের প্রতি খুব প্রীত ছিলেন না, তার নির্দেশে কবিকে হত্যার ঘটনার কথাও আমরা জানি। ইসলামের ইতিহাসে বিশেষত পারস্য ও এর আশেপাশের অঞ্চলের ইতিহাসে বেশ কয়েকজন ধ্রুপদী কবি সারা পৃথিবীতে অমর হয়ে থাকলেও ইসলামের ইতিহাসে, মূল ধারার সুন্নি মুসলমানদের চর্চায় কবিদের স্থান নিয়ে রয়েছে অজস্র বিতর্ক । তাই স্বাধীনতার পরপরই সেকুলার বাংলাদেশে কবিতা লেখার অপরাধে কাউকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হবে এটা হয়তো দারুণ বিস্ময়ের কোনো বিষয় নয়। ইসলামী মৌলবাদীদের দাবীর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার সেই সময়ে কবি দাউদ হায়দার কে বাধ্য করেন দেশ ত্যাগ করতে এবং সেই থেকে আজো এই কবি নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন।

কথিত ‘ব্লাসফেমী’ অপরাধে বাংলাদেশ থেকে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছে। তবে এই নির্মমতার সবচাইতে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সম্ভবত বাংলাদেশে নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিন। তসলিমা নাসরিন কবি, ঔপন্যাসিক এবং তিনি বাংলাদেশের নারীবাদী ধারার অগ্রগণ্য লেখক। নারীবাদী ইস্যু নিয়ে প্রকাশ্যভাবে লেখালেখির জন্যে খুব দ্রুতই চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় বড় হয়ে ওঠা ইসলামী মোল্লাতন্ত্রের। তসলিমা নাসরিনের লেখালেখি সরাসরি ইসলাম ধর্ম ও এর উপড়ে গড়ে ওঠা মোল্লাতন্ত্রকে আঘাত করে, কেননা নারীর মুক্তির প্রশ্নে ইসলামের মত একটি পিতৃতান্ত্রিক ধর্মকে আঘাত করার কোনও বিকল্প নেই, তাই তসলিমা নাসরিনের লেখায় অবধারিত ভাবেই উঠে আসতো ধর্মের সমালোচনা। ফলে বাংলাদেশের দেওবন্দী ঘরানার মোল্লাতন্ত্র তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে, তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়, বাংলাদেশের মোল্লাতন্ত্র তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি অভিযোগ ব্যবহার করে গন-উন্মাদনা তৈরি করার জন্যে, তারা প্রচার করে যে তসলিমা নাসরিন দাবী করেছেন ‘কুরআন কে সংশোধন করতে হবে’ এই মিথ্যা দাবিটি তাঁর নামে প্রচার করে সারা দেশব্যাপী একটি গণ-উন্মাদনা তৈরি করতে সফল হয় বাংলাদেশের দেওবন্দী ঘরানার মোল্লাতন্ত্র (২৪)। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালের আগস্ট মাসে তাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় (২৫)। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশের আইন, রাষ্ট্র ও মোল্লাতন্ত্র একযোগে কাজ করেছে তসলিমা নাসরিনের নাগরিক অধিকার হরণ করার জন্যে, এবং তাঁকে ‘ব্লাসফেমি’র অভিযোগে দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্যে। যদি বাংলাদেশের ব্লাসফেমী আইন পাকিস্তানের মত নয়, কিন্তু বাংলাদেশের পেনাল কোড এর ২৯৫ এ ধারাটি (যা হুবুহু ব্রিটিশ আমলের ধারাটি, যা ভারতেও একই ভাবে সংরক্ষিত) এখনও বিদ্যমান যা একটি ব্লাসফেমী বিরোধী আইন। মোল্লাতন্ত্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে সেই উপনিবেশিক ব্লাসফেমী আইনের ধারাটি অর্থাৎ ২৯৫ এ ধারায় মামলা করে, যা তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করে (২৬)। ব্লাসফেমী আইন কতটা নাগরিক অধিকার হরণকারী হতে পারে তার একটা করুণ উদাহরণ হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র তসলিমা নাসরিনের সাথে যা করেছে সেই সকল আচরণগুলো। একজন নাগরিকের সকল মৌলিক অধিকার হরণ করার ঘটনা ঘটেছে তসলিমা নাসরিনের সাথে। বাংলাদেশ সরকার তাঁর বই নিষিদ্ধ করেছে, শুরুতে তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করেছিলো একটা সময়ের জন্যে, পরবর্তীকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ তাঁর পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে, তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়নি আজ পর্যন্ত, এমন কি পিতা এবং পরিবারের অনেক ঘনিষ্ঠ মানুষের মৃত্যুর কারণেও মেলেনি দেশে ফেরার অনুমতি। ব্লাসফেমী আইন কিভাবে রাষ্ট্রকে তার নাগরিকের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, কিভাবে রাষ্ট্রের উদ্যোগে নাগরিককে দেশ ছাড়া করা হয়, তসলিমা নাসরিনের বেলায় আমরা তা দেখেছি (২৭)।

তসলিমা নাসরিনকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছিলো খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ইসলামী জাতীয়তাবাদী সরকার। সকলেরই  ধারনা ছিল সেকুলার দাবীদার বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সরকার গঠন হলে সম্ভবত তসলিমা নাসরিন দেশে ফেরার অধিকার ফিরে পাবেন। লেখক তসলিমা নাসরিনের নিজেরও প্রত্যাশা ছিল তেমনটিই। কিন্তু বাস্তবত সেকুলার দাবী করা আওয়ামীলীগের সরকার আরও বেশী করে ইসলামী মৌলবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণ করে তসলিমা নাসরিনের সকল নাগরিক অধিকার হরণ করে (২৮)।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র শুধুমাত্র তসলিমা নাসরিনের নাগরিক অধিকার হরণ করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং পাঠকের পক্ষে তসলিমা নাসরিনের বই পড়ার যে অধিকার সেটাকেও হরণ করেছে চরম জবরদস্তি মূলক ভাবে। বাংলাদেশে তসলিমা নাসরিনের সকল বই কার্যত নিষিদ্ধ। এমন কি ২০১২ সালে, জানুয়ারি মাসের চার তারিখে বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে তসলিমা নাসরিনের লেখা লজ্জা উপন্যাসটির একটি কপি পাওয়ার অপরাধে সেই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মোঃ ইউনুস আলীকে গ্রেফতার করে সরাসরি কারাগারে পাঠিয়ে দেয় এবং ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারিক মোঃ আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করে (২৯)।

নব্বুই এর গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের নাগরিকদের মনে একটা আশাবাদের সঞ্চার হয়েছিলো যে দেশ সম্ভবত এখন উদার গণতান্ত্রিক ধারায় বিকশিত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তা হয়নি। এর পরে পালা করে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উভয় সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে এবং দেশকে ক্রমাগত আরও বেশী করে ইসলামী মৌলবাদের কাছে সমর্পিত করেছেন। বিশেষত সেকুলার দাবী করা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে দেশ ধর্মীয় মৌলবাদের সাথে চরম আপোষের কারণে লেখক, প্রকাশক, মুক্ত চিন্তক, ধর্ম সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণকারী নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী মানুষদের জীবনে নেমে আসে চরম ঝুঁকি ও সংকট।  যার ফলাফল হিসাবে আমরা দেখেছি বাংলাদেশে ধারাবাহিক ভাবে নাস্তিক, অবিশ্বাসী, মুক্তচিন্তক লেখক, ব্লগার, প্রকাশকদের উপরে নেমে এসেছে ইসলামী মৌলবাদী ও রাষ্ট্রের নানান ধরনের নিপীড়নমূলক আচরণ। রাষ্ট্র আর হেফাজতে ইসলামী নামের দেওবন্দী ইসলামী ঘরানার জোটের যৌথ প্রচেষ্টায় গ্রেফতার করা হয় একের পর এক ব্লগার কে, ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে গ্রেফতার করা হয় মশিউর রহমান, রাসেল পারভেজ এবং সুব্রত শুভ কে, তাদের অপরাধ ‘ব্লগে লেখালেখি’ করা, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয় – প্রকৃতিবাদে বিশ্বাসী এই ব্লগাররা ইন্টারনেটে বিভিন্ন ব্লগে তাঁদের লেখালেখির মাধ্যমে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মের প্রবর্তকদের বিতর্কিতভাবে উপস্থাপন করে ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করে আসছিলেন’ (৩০)  গ্রেফতার করা হয় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে এবং তাঁর বিরুদ্ধে ‘ব্লগে আপত্তিকর লেখালেখির অভিযোগ’ করা হয় এবং এই ‘অপরাধে’ আদালত তাঁকে তিন দিনের রিম্যান্ড নেয়ার আবেদন মঞ্জুর করে (৩১)। এই ব্লগারদের গ্রেফতারের বিষয়টি ছিল হেফাজতেইসলামিকে সন্তুষ্ট করার জন্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের এক ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা, যার বলি হতে হয়েছিলো এই ব্লগারগণ সহ আরও অনেক ব্লগার, লেখক কে।

ইসলামী মৌলবাদীদের হাতে একের পর এক খুন হয়েছেন বাংলাদেশের ব্লগারগণ। যার শুরু হয়েছিলো ব্লগার রাজীব হায়দার কে দিয়ে। তারপরে একে একে খুন হন ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, অভিজিৎ রায়, নিলয় নীল, নাজিমুদ্দিন সামাদ। এই সকল ব্লগারদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ছিল এরা ধর্মকে বিশেষত ইসলাম ধর্মকে ‘অবমাননা’ করে লেখালেখি করেন। যদিও এদের লেখালেখির মাঝে ছিল বিস্তর তফাত। এদের মাঝে অভিজিৎ রায় নানান বিষয়ে বৈচিত্র্যময় লেখালেখি করেছেন যেখানে বিজ্ঞান, সাহিত্য, বিবর্তনবাদ, রাজনীতি, ধর্ম সহ নানান বিষয় থাকতো, অভিজিৎ রায় বাংলাদেশের মুক্তচিন্তার নবপ্রজন্মের সবচাইতে উজ্জ্বল লেখক ও একটিভিস্ট ছিলেন। নিশ্চিত ভাবেই তিনি ধর্মের সমালোচনা করে লিখেছেন, সেটা তাঁর মৌলিক অধিকার এবং পৃথিবীর যেকোনো সভ্য সমাজে অভিজিতের লেখা উচ্চ প্রশংসিত হবার মতই লেখা ছিল।অনন্ত বিজয় দাশের  মূল আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান, বিবর্তনবাদ এবং ধর্ম। তিনি সকল ধর্ম নিয়ে লিখেছেন, হিন্দু ধর্ম নিয়ে কঠোর সমালোচনামূলক লেখা রয়েছে ঠিক যেমন রয়েছে ইসলাম নিয়ে। নিলয় নীল, ওয়াশিকুর বাবু, নাজিমুদ্দিন সামাদ এদের সকলকেই খুন করা হয়েছে ধর্মের সমালোচনা করে লেখার জন্যে, কিন্তু যে কোনও গণতান্ত্রিক সমাজে ধর্ম নিয়ে লেখা যেকোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এই ধারাবাহিক খুনগুলোর একটিরও কোনো বিচারিক সমাধান করতে পারেনি, বরং এই সকল খুনের সন্দেহভাজন আসামীদের অনেককেই রাষ্ট্র বিচার বহির্ভূত ভাবে হত্যা করেছে।

লেখক ব্লগারদের খুনের পরে ইসলামী মোল্লাতন্ত্র ও রাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট হয়ে দাড়ায় প্রকাশক ও প্রকাশনা সংস্থাগুলো।এই ধারায় ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে জাগৃতি প্রকাশনীয় ফয়সাল আরেফিন দীপন ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলের উপরে মৌলবাদীদের হামলার ঘটনা ঘটে, দীপন নিহত হন এবং মারাত্মক আহত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন টুটুল (৩২)। দীপন এবং টুটুল দুজনেই মুক্তচিন্তার প্রকাশনার জন্যে খ্যাত হয়েছিলেন বাংলাদেশে। ২০১৬ সালে বইমেলা চলাকালীন সময়ে ‘বদ্বীপ প্রকাশনী’ নামের একটি প্রকাশনা সংস্থার স্টল বন্ধ করে দেয়া হয় এবং এর স্বত্বাধিকারীদের একজনকে গ্রেফতার করা হয়। এই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত একটি বই নিষিদ্ধ করা হয় এবং আরও পাঁচটি বই বাজেয়াপ্ত করা হয় পরবর্তী তদন্তের জন্যে (৩৩)। ‘ইসলাম বিতর্ক’ নামের এই বইটির জন্যে রাষ্ট্র স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই ব্যবস্থা নেয় যা নিশ্চিত ভাবেই মত প্রকাশের মৌলিক স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং মৌলিক নাগরিক অধিকার হরণ করার উদাহরণ।

লেখক ও ব্লগারদের প্রতিটি খুন ও তাদের উপরে হামলার পরে রাষ্ট্রীয় সংস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা, রাজনীতিবিদ, সরকারের মন্ত্রীরা নানান ভাবে এই ধরনের আক্রমণের জন্যে এই লেখকদের মত প্রকাশকেই দায়ী করেছেন। এমন কি খোদ প্রধানমন্ত্রী বার বার জাতীয় গণমাধ্যমে হুমকি দিয়েছেন যে ধর্ম ‘অবমাননা’ করলে সরকার কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করবে, তাদের উপর বিচ্ছিন্ন আক্রমণের দায় সরকার নিবে না (৩৪)। সরকারের মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরে সারাদেশ ব্যাপী প্রচারণা চালিয়েছেন যে ধর্ম অবমাননা বা নবী মুহাম্মদের অবমাননার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে যা কার্যত ইসলামী মৌলবাদীদের হাতে ব্লাসফেমী আইন আরও কঠোর করে তোলার স্বপক্ষে যুক্তি তুলে দেয় (৩৫)।রাষ্ট্র, সরকার, এর প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের এই ধরনের মন্তব্য, সমর্থনের উপরে ভর করেই আমরা দেখেছি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের উপরে প্রায়শই ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগ এনে সমগ্র সম্প্রদায়ের উপরে চড়াও হয়েছে উগ্র ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠী। আমরা এর প্রমাণ দেখেছি রামু, নাসিরনগর বা রংপুরের গঙ্গাছড়ার  মত নির্মম ঘটনার মধ্যে দিয়ে যার কোনো রকমের সুবিচার হয়নি আজ পর্যন্ত (৩৬)।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আওয়ামীলীগ ধর্মীয় মৌলবাদের কাছে এতোটাই সমর্পিত হয়ে উঠেছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে তারা খুব সামান্য ঘরোয়া আলোচনার কারণে তাদেরই একজন সিনিয়র নেতা, মুক্তিযোদ্ধা ও পাঁচবারের সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করে এবং জেলখানায় পুরে দেয়। লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয় কেননা লতিফ সিদ্দিকী বলেছিলেন হজ্জ হচ্ছে টাকার অপচয়।  নিউ ইয়র্কের একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে লতিফ সিদ্দিকী যা বলেছিলেন তা একজন নাগরিকের খুব সাধারণ মত প্রকাশের অধিকারের মধ্যেই পড়ে, কিন্তু রাষ্ট্র ও ইসলামী মৌলবাদ তাঁর বিরুদ্ধে ব্লাসফেমীর অভিযোগ আনে এবং এর ফলে তাঁকে সকল দিক থেকে চরম নিপীড়নের শিকার হতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট বাইশটি মামলা দায়ের করা হয়।

স্বাধীনতার পর থেকে সামরিক শাসকদের আমলেও যত সংখ্যক ‘ব্লাসফেমী’র অভিযোগ আমরা দেখেছি তাঁর চাইতে বহু বহু গুন বেশী ‘ব্লাসফেমী’র অভিযোগ আমরা দেখেছি সাম্প্রতিক সময়ের সেকুলার দাবী করা আওয়ামীলীগের সরকারের সময়গুলোতে। এই সকল ব্লাসফেমীর অভিযোগ যে কেবল ইসলামী মৌলবাদীদের কাছ থেকেই এসেছে তা নয়, বরং এই সকল অভিযোগের প্রবল সমর্থক হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে সেকুলার দাবীদার আওয়ামীলীগ, এবং গণতান্ত্রিক বলে দাবীদার বাংলাদেশ রাষ্ট্র। স্কুল পড়ুয়া কিশোর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক, প্রকাশক, মরমী বাউল শিল্পী এমন কি নিজ দলের প্রবীণ সংসদ সদস্য কাউকেই রেহাই দেয়া হয়নি সাম্প্রতিক সময়ে। শুধুমাত্র ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করবার জন্যে ও সস্তা জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখার জন্যে বাংলাদেশের দুটি প্রধান দলই ভূলুণ্ঠিত করেছে নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকারকে। শুধু মুক্তচিন্তা ঠ্যাকানোর জন্যে  মুক্তচিন্তকদেরও খুন করা হয়েছে একের পর এক। ধর্ম সম্পর্কে সকল ধরনের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে।

 ৭

কেনো দেশে দেশে ঘটছে এই সকল ‘ব্লাসফেমীর’ ঘটনা? ধর্ম কি সমাজের উপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে? কেনো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মানুষ এভাবে ধর্ম সম্পর্কে সমালোচনা মুখর হয়ে উঠলো আর তার বিপরীতে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় গোষ্ঠী এই রকমের উন্মাদ হয়ে উঠলো? উপরের একটি অংশে পাকিস্তানের পরিসংখ্যান সহ উল্লেখ করা হয়েছে যে উপনিবেশিক শাসনামল থেকে ভারতবর্ষে ব্লাসফেমী আইনের উপস্থিতি থাকলেও ব্লাসফেমী আইনের প্রয়োগ ব্যাপক হারে বেড়েছে প্রতিটি স্বাধীন দেশে অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে। উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হবার পরে যে দেশগুলো নিজেদেরকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার পথে এগিয়ে গেলো সেই রাষ্ট্র বা সমাজগুলো কেনো ধর্ম নিয়ে তাদের বোঝাপড়ার জায়গাটিকে মোকাবিলা করতে পারলোনা?  এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু সাম্প্রতিক গবেষণায় কয়েকটি প্রধান বিষয় উঠে এসেছে যা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশের জন্যেই প্রাসঙ্গিক।

প্রথমত ভারতীয় উপমহাদেশে টেকনোলজি বা প্রযুক্তি একটি বড়ো অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে মানুষের স্বাধীন মতামত ও চিন্তার প্রকাশের ক্ষেত্রে। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রায় সকল প্রযুক্তির স্থানান্তর ঘটছে মুহূর্তের মধ্যে। ফেইসবুক, টুইটার কিংবা ইন্সটাগ্রাম এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক – নাগরিক ব্লগসাইট গুলো অপার সম্ভাবনার দরোজা খুলে দিয়েছে মানুষের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে। যে মতামতগুলো মাত্র দুই দশক আগেও ছিল কেবল ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে চায়ের আড্ডায় তর্ক বিতর্কের প্রসঙ্গ, এই নতুন অন্তরজাল প্রযুক্তি তাদেরকে সরাসরি নিয়ে এলো জনসাধারণের প্রাত্যহিক পাঠের নাগালে। সামাজিক মিডিয়ার সাথে যখন যুক্ত হয় বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক মিডিয়া তখন বিষয়টি আরেকটি ভিন্ন মাত্রা নিয়ে হাজির হয় কেননা বেসরকারি খাতের সংবাদ মাধ্যমগুলো মূলত ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হিসাবেই কাজ করে থাকে, ফলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এই সংবাদমাধ্যম গুলোর কাছে ততক্ষণই গ্রহণযোগ্য যতক্ষণ তা তাদের রাজনৈতিক স্পন্সর এর স্বার্থের সাথে সাঙ্ঘরষিক হয়ে ওঠেনা। সরকারী বা বেসরকারি খাতের সংবাদ মাধ্যম বা কথিত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলো অন্তর্জালের লেখক, ব্লগারদের এই মতামতগুলোকে মুহূর্তে ছড়িয়ে দেয় আরও বড়ো পরিসরে এবং প্রায়শই তার সাথে যুক্ত হয়ে যায় সেই বিশেষ সংবাদ মাধ্যমের নিজস্ব রাজনীতি, প্রায়শই তা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলতে আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। ফলে যেকোনো মানুষের সাধারণ মতামত হয়ে উঠতে পারে ‘ব্লাসফেমী’ অপরাধ । তাই আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি, বিশেষত অন্তরজালভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সরকারী ও বেসরকারি খাতের গণমাধ্যম এবং এর সাথে যুক্ত থাকা রাজনীতি, এই ত্রয়ী প্রথম স্তরের অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে সাম্প্রতিক সময়ের ভারতবর্ষের গন-উন্মাদনার পেছনে। আর ব্লাসফেমী বিরোধী আইন গুলো সরকার ও রাষ্ট্রগুলোকে সুযোগ করে দিয়েছে এই মাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে জনগণের কথা বলার অধিকারকে আরও বেশী নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসতে। এমন কি দেশে দেশে ব্লাসফেমী আইনের নতুন সংস্করণ চালু করা হয়েছে এই সকল নতুন টেকনোলজিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ধর্ম কে সাধারণ সমালোচনার হাত থেকে সুরক্ষা দেবার জন্যে।

তবে সবচাইতে শক্তিশালী অনুঘটক হিসাবে এই তিন দেশেই যা কাজ করেছে তার আর কিছুই নয়, রাজনীতি। ভারতে উদীয়মান হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি আর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ইসলামী রাজনীতির উত্থান। তবে এই তিনটি দেশেই এই রাজনীতির রয়েছে চরিত্রগত ও মাত্রাগত তফাত, কখনও কখনও তা জটিলতার মাত্রাতেও ভিন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউনিভারসিটি কলেজ অফ লন্ডন থেকে প্রকাশিত এবং তিনজন গবেষক Paul Rollier, Kathinka Frøystad and Arild Engelsen Ruud এর সম্পাদনায় একটি বিষদ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ব্লাসফেমী ও এ সংক্রান্ত গন-উন্মাদনা নিয়ে (৩৭)। এই গবেষণা পুস্তকটিতে বেশ কয়েকজন গবেষক দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। এই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে ভারতবর্ষের সাম্প্রতিক ব্লাসফেমী বিরোধী আন্দোলনকে ‘সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক মঞ্চায়ন’ বা political orchestration হিসাবে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এই বইটিতে উপস্থাপিত ‘কেইস স্টাডি’তে আওয়ামীলীগের মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনাটিকে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে একথা তো সুবিদিত, বিশেষত শহুরে নাগরিকেরা জানেন লতিফ সিদ্দিকী একজন দুর্নীতিগ্রস্থ রাজনীতিবিদ, তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নানান ধরনের দুর্নীতি করার। শুধু তাইই নয়, লতিফ সিদ্দিকী প্রকৃত অর্থে আমাদের দূর্নীতিগ্রস্থ রাজনীতির একজন প্রতিনিধি মাত্র। উপরোক্ত গবেষণা গ্রন্থটিতে মাঠ পর্যায়ের সাক্ষাতকারের উপরে ভিত্তি করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সারা দেশজুড়ে যে গণবিক্ষোভ ও গণ-উন্মাদনা তার পেছনে যতটা না সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি আহত হওয়ার বিষয় জড়িত ছিল তার চাইতেও অনেক বেশী ছিল আওয়ামীলীগের বিরোধী দলগুলোর সরকার বিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা। লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে এই গণবিক্ষোভের অংশ হিসাবে জামাতে ইসলামী নেতৃত্ব দিলেও সেখানে অন্যান্য ইসলামী দলগুলোও অংশ নেয়, এমন কি এই আন্দোলনে অংশ নেয় আওয়ামীলীগেরই স্থানীয় ও জাতীয় ভাবে লতিফ সিদ্দিকীর প্রতিপক্ষ গ্রুপটি। সেই অর্থে এটা ছিল রাজনৈতিক ভাবে সাজানো একটি বিক্ষোভ যা কখনোই বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো গণবিক্ষোভ নয়। সেকুলার দাবীদার দল হয়েও সরকারে থাকা আওয়ামীলীগ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক আন্দোলন কে ঠ্যাকানোর জন্যে তার দলেরই সবচাইতে বর্ষীয়ান একজন রাজনৈতিক নেতাকে ত্যাগ করতে দ্বিধা করেনি। এই ইস্যুতে আওয়ামীলীগ যেমন একদিকে জামাতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে ধ্বংস করে দিতে পেরেছে তেমনি সঙ্গী হিসাবে কাছে রাখতে পেরেছে আরেক বড়ও ইসলামী দল হেফাজতে ইসলামীকে, যারা লতিফ সিদ্দিকীর মাথার দাম ঘোষণা করেছিলো পঞ্চাশ লক্ষ টাকা (৩৮)। আওয়ামীলীগ সরকারের সময়কালীন মেয়াদে ধর্মীয় সংগঠনগুলো, বিশেষত হেফাজত এ ইসলামীর নেতৃত্বে থাকা দলগুলোকে আওয়ামীলীগ খুব সফল ভাবে ব্যবহার করেছে তার রাজনৈতিক ফায়দা লাভের জন্যে যার বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই হেফাজত কে দিয়ে ধর্ম অ ধর্মীয় চেতনার স্বপক্ষে নানান রকমের মাঠের আন্দোলনকে চাঙ্গা রেখেছে বিভিন্ন সময়ের গণতান্ত্রিক অধিকার সমূহ কে ভিন্ন খাটে প্রবাহিত করার জন্যে।

ভারতে শিয়া মুসলিম সম্প্রদায় থেকে আসা শিল্পী হুসেইনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণ-উন্মাদনাটির পুরোটাই ছিল সেই সময়ের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির স্বার্থে গড়ে ওঠা ‘রাজনৈতিক ভাবে মঞ্চায়িত’ এক ধরনের গণ-উন্মাদনা। চল্লিশের দশক থেকেই ভারতীয় প্রগতিশীল শিল্পীদের সঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন হুসেইন, যোগ দিয়েছিলেন বোম্বে ভিত্তিক প্রগতিশীল শিল্পীদের দলে।আর এটা সকলেরই জানা যে হুসেইন হিন্দু পুরানের বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে ছবি আঁকেন সেই ষাট ও সত্তুরের দশক থেকেই। ছবি আকার জন্যে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা গুলোর প্রায় সবকটিই পেয়েছেন; ১৯৬৬ সালে পদ্মশ্রী, ১৯৭৩ সালে পদ্মভূষণ, ১৯৯১ সালে পদ্মবিভূষণ। ভারতের সরবোচ্চ বেসামরিক পদক ‘ভারত রত্ন’ তাঁকে দেয়া হয়নি কেননা ততদিনে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা তার বিরুদ্ধে সারা ভারতে গণ-উন্মাদনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলো। যে ছবিগুলো নিয়ে তাঁকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় তার সকল ছবিই কয়েক দশক পূর্বে আঁকা এবং ষাট ও সত্তুরের দশকে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি তখনও কোনো শক্তি হিসাবে দেখা দেয়নি। ভারত তখনও কংগ্রেস ও অন্যান্য বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মাঝে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগি করছে। হুসেইনের এই ছবিগুলো নিয়ে অভিযোগ উঠতে শুরু করে নব্বুইয়ের দশকের গোড়াতে যখন ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ফিদা হুসেইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী এই গন-উন্মাদনার ঘটনায় গ্রেফতার প্রায় সকলেই শিবসেনা ও বজরং দলের সদস্য ছিল। ভারতের আদালত স্বাধীন ভূমিকা পালন করলেও ভারত রাষ্ট্র মাথা নত করেছিলো উঠতি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কাছে। হুসেইনের বিরুদ্ধে এই গন-উন্মাদনা তীব্র হয়ে ওঠে অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্ব ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি’র প্রথম পর্যায়ের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে। বিজেপির জন্যে হুসেইন ছিলেন স্বচ্ছন্দ টার্গেট কেননা প্রথমত তিনি একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং দ্বিতীয়ত তার বিরুদ্ধে এই গণ-উন্মাদনার পুরো রাজনৈতিক ফায়দাটি গেছে হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর ঘরে, বিশেষত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠান থাকা বিজেপির ঘরে। যার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতি আমরা এখন দেখছি সারা ভারত জুড়েই হিন্দুত্ববাদের গনজোয়ার। এখন সেকুলার ভারতের খোদ সংসদেই ব্লাসফেমী আইনকে আরও কঠোর করার দাবী তোলা হচ্ছে।  দুর্গা – মহিষাসুর বিতর্ককে কেন্দ্র করে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদে আলোচিত হয়েছে কিভাবে ভারতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিন্দু ধর্মকে আহত করছে। দিল্লির নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিষাসুর পূজাকে কেন্দ্র করে ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে দেয়া হয় ‘গরুর মাংস’ খাওয়ার ও বিতরণের অভিযোগ, কেননা দুর্গা-মহিষাসুর পূজা বিতর্কের বিদ্যায়তনিক চরিত্র নিয়ে বিতর্কের  চাইতেও অনেক বেশী সহজ পথ  ‘গরুর মাংস’ দিয়ে সারা ভারতে গণ-উন্মাদনা তৈরি করা। বিজেপির মন্ত্রী অভিনেত্রী স্মৃতি ইরানীর সংসদে দেয়া ‘দুর্গা’ অবমাননা বিষয়ক বক্তৃতার পরে ভারতের বিজেপি শাসিত সরকার ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে মামলা দায়ের করে জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্রদের বিরুদ্ধে যা ব্লাসফেমীর নামে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের আরেকটি সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হতে পারে।

পাকিস্তানের সমীকরণটি আরও জটিল, এখানে প্রযুক্তি, মিডিয়া ও জাতীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি ও বিশ্বাস যেখানে শক্তিশালী প্রভাবক হিসাবে কাজ করে থাকে ইসলামেরই বিভিন্ন সম্প্রদায়গত বিভাজন এবং এই বিভাজন থেকে জন্ম নেয়া বিভিন্ন দল – উপদলগুলো। সেখানে হিন্দু বা খ্রিষ্টান সম্প্রদায় যেমন সংখ্যালঘু, একই ভাবে সংখ্যালঘু হচ্ছেন আহমদীয়া, শিয়া বা ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা।তাই সেখানে শুধু অমুসলিম সংখ্যালঘু মানুষেরাই নন, ইসলামের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ‘ব্লাসফেমী’ আইনের শিকার।  পাকিস্তানে নতুন নতুন ভাবে গড়ে ওঠা ইসলামিক দলগুলোর জন্যে রাতারাতি সারা দেশব্যাপী খ্যাতি অর্জনের একটি সহজ পন্থা হচ্ছে কোনো একটি ঘটনাকে কুরআন, রাসুল বা ইসলামের অবমাননা হিসাবে চিহ্নিত করে সেটার  ভিত্তিতে গণ-উন্মাদনা তৈরির প্রচেষ্টা। এর সাথে যুক্ত হয় প্রযুক্তি, সামাজিক মিডিয়া এবং অপরাপর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, খুব সহজেই কোনও একটি নতুন ইসলামিক দলকে সারা দেশব্যাপী ইসলামের রক্ষক হিসাবে পরিচিতি এনে দেয়। খ্রিষ্টান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আসিয়া বিবি’র বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগ করে জাতীয় পরিচিতি পেয়ে যায় সদ্য গজিয়ে ওঠা ইসলামী দল ‘তেহরিক – ই – লাব্বাইক পাকিস্তান পার্টি’। পাকিস্তানের ব্লাসফেমী ভিত্তিক গণ-উন্মাদনার ঘটনাগুলোর সাথে তাই যতটা রয়েছে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি আহত হবার প্রশ্ন তার চাইতেও অনেক বেশী প্রাসঙ্গিক হচ্ছে এই সকল গজিয়ে ওঠা ইসলামী দলগুলোর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভের প্রশ্নটি। অঞ্চল ভিত্তিক এই ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু একটা ছোট এলাকায় নিজেদের প্রভাবকে ঘনীভূত করে রাখে তাই সেই বিশেষ অঞ্চলের স্বাধীন আইনি প্রতিষ্ঠান যেমন নিম্ন আদালতও যথাযথ ভাবে কাজ করতে পারেনা এই সকল ইসলামী দলগুলোর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের বিরুদ্ধে গিয়ে। পাকিস্তানে ‘ব্লাসফেমী’ অপরাধ নিয়ে বিভিন্ন ইসলামী দল উপদলগুলোর যে তৎপরতা তার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নিয়ে গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন Paul Rollier যার শিরোনাম হচ্ছে ‘We’re all blasphemers’: The life of religious offence in Pakistan। এথনোগ্রাফিক পদ্ধতিতে করা এই গবেষণার জন্যে গবেষক পাকিস্তানের লাহোরের শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষদের আবাসিক এলাকায় থেকেছেন এবং বোঝার চেষ্টা করেছেন পাকিস্তানের এই ব্লাসফেমী বিরোধী চেতনাকে। তার গবেষণাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণকে তিনি উপস্থাপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন চার ধরনের প্রধান কারক পাকিস্তানের ব্লাসফেমী বিরোধী তৎপরতার সাথে সংশ্লিস্ট।

১। ব্লাসফেমীর অভিযোগকারী

২। ব্লাসফেমীর জন্যে অভিযুক্ত

৩। রাষ্ট্রীয় আইনি সংস্থাগুলো

৪। রাষ্ট্রের অন্যান্য ‘স্বাধীন’ সংস্থা সমূহ

 

পল রলিয়ের এর গবেষণায় উঠে এসেছে ব্লাসফেমী বিরোধী এই সকল ঘটনার অভিযোগকারী সবসময়ই সংখ্যা গরিষ্ঠ ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা, বিশেষত সুন্নি ইসলাম ও সুন্নি রাজনৈতিক দলগুলো আর শতকরা ৮৫% ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি হচ্ছেন হয় সংখ্যা লঘু অমুসলিম কিংবা অ-সুন্নি মুসলিম অর্থাৎ ইসলামের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনুসারী। সুন্নি মতাবলম্বী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মাঝে প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা রয়েছে কে কার আগে কোনো একটি বিষয়ের বিরুদ্ধে ‘ব্লাসফেমী’ আইনে মামলা করবে কিংবা গন-উন্মাদনা সংগঠিত করতে পারে। এই ধরনের ঘটনায় যেহেতু খুব সহজেই জাতীয় পরিচিতি পাওয়া যায় তাই সুন্নি সংগঠনগুলোর মাঝে এই ধরনের ঘটনা সুযোগ করে দেয় নিজেদেরকে ইসলামের ‘রক্ষক’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার। আর এ ক্ষেত্রে এই সকল সুন্নি সংগঠনগুলো প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে কুরআন ও নবী মুহাম্মদের সন্মান। ‘ব্লাসফেমী’ নিয়ে পাকিস্তানের এই ইসলামী রাজনীতির সবচাইতে বিপদজনক দিক হচ্ছে যে কেউ যে কারো বিরুদ্ধে যেকোনো সময় মামলা দায়ের করতে পারে। আরেকটি বিপদের দিক হচ্ছে কুরআন ও রাসুলের ‘সম্মান’ বলতে আসলে কি বোঝানো হয়ে থাকে তার কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা সীমা নেই এবং পাকিস্তানের জনগণের দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষদের একটা বড় অংশই ধর্মপরায়ণ এবং সাংস্কৃতিকভাবে নবী মুহাম্মদকে সবচাইতে পবিত্র সত্ত্বা বলে মনে করে থাকে। যেহেতু ‘সম্মান’ এর কোনও সংজ্ঞা নেই তাই কুরআন ও নবীর সন্মান বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের ইসলামী রাজনীতির ভিক্টিম হয়েছে বহু মানুষ যার নাম দেয়া হয়েছে ‘ব্লাসফেমী’।

পাকিস্তানের ফেডারেল বিচার ব্যবস্থা অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে হাই কোর্ট ও নিম্ন আদালতের সাথে ফেডারেল শরিয়া আদালতের মতামতের পার্থক্য প্রায়শই উত্তেজনার সৃষ্টি করে যার ফলে বহু আইন পরিবর্তনের নজির আমরা দেখেছি।সম্ভবত পাকিস্তানের বর্তমানে পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে ইসলামের নবী মুহাম্মদের সমালোচনার কারণে যার প্রধান প্রস্তাবকারী ছিল পাকিস্তানের শরিয়া আদালত যার উপরে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি রাজনৈতিক মহলের প্রভাব সুস্পষ্ট। পাকিস্তানের অপরাপর স্বাধীন সংস্থাগুলোও দারুণ ভাবে এই ধর্মীয় রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত যা বেশীরভাগ সময়ই ন্যায্যতার বিপরীতে সংখ্যা গরিষ্ঠ ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থ সংরক্ষণ করে থাকে। নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানও ব্লাসফেমী ইস্যুতে উগ্র রাজনীতির বিরুদ্ধে নীরব ভূমিকা পালন করে থাকে। পাকিস্তানের সাম্প্রতিকতম নির্বাচনে বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান ইমরান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিলো প্রকাশ্যে ব্লাসফেমী বিরোধী আইনের স্বপক্ষে প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনী সুবিধা আদায়ের এবং নির্বাচন কমিশন ছিল যথারীতি নীরব (৩৯)।

আধুনিক যুগে ব্লাসফেমি নিয়ে গন-উন্মাদনা ও দেশে দেশে ‘ব্লাসফেমী বিরোধী আইন’ কে শুধুমাত্র  ধর্মের চত্বরের বিষয় হিসাবে বুঝতে চাওয়াটা এক ধরনার সীমিত বা খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি। বরং সারা দুনিয়াতেই ‘ব্লাসফেমি’ বা ধর্মীয় অনুভূতিতে ‘আঘাত’ করার বিষয়টি এখন ধর্মের চাইতেও অনেক বেশী রাজনীতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর দেড়শ কোটি মুসলমানের খুব কম সংখ্যক পাঠকই সালমান রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস পড়েছেন, কিন্তু ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী যখন রুশদীর মাথার দাম ঘোষণা করে বসলেন তখন তা হয়ে গেলো বিশ্ব রাজনীতির অংশ। রুশদীর এই ঘোষণা তখন কেবল ইরানের বিষয় হয়ে থাকলো না, বরং তা আরব লীগ, ওআইসি এবং অনায়ন্য মুসলিম দেশগুলোর জোটের রাজনীতিতে পরিণত হলো। দেশে ইসলামী দল – উপদল গুলো মাংসপেশীর শক্তি দেখাতে তৎপর হয়ে উঠলো।  তসলিমা নাসরিন স্বয়ং ব্যাখ্যা করেছেন যে তিনি কুরআন সংশোধনের কথা বলেন নি কখনও, যে গ্রন্থটির কোনো উপযোগিতা নেই তার কাছে, সেই গ্রন্থ সংশোধনের কথা বলার কোনও কারণ নেই। কিন্তু তবুও বাংলাদেশের ইসলামী মৌলবাদী দলগুলো তসলিমার বিরুদ্ধে ধর্মীয় গন-উন্মাদনা তৈরির ক্ষেত্রে এই মিথ্যাটিকেই ব্যবহার করেছে, তসলিমার ঘটনার মধ্য দিয়ে ইসলামী দলগুলো সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলোকে জানান দিয়েছিলো তাদের শক্তির কথা।ফলে ইসলামী দলগুলোর এই শক্তির মহড়ার কারণেই বাংলাদেশের দুটি প্রধান সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারার দল বিএনপি এবং আওয়ামীলীগ উভয়েই ক্রমশই ইসলামী রাজনীতির সাথে আপোষ করতে শুরু করে এবং এক সময় এরা কে বেশী ইসলামী দলগুলোকে সঙ্গী হিসাবে পেতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে।   একই ঘটনা ঘটেছে মকবুল ফিদা হুসেইনের বেলায় কিংবা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিরুদ্ধে গরুর মাংস খাওয়া ও বিতরণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বামপন্থী ছাত্রদের বিরুদ্ধে মামলা ও সরকারী নিপীড়নের ঘটনার ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ, বাংলাদেশের মূলধারার সবকটি মধ্য ও ডানপন্থী দল যেমন ইসলামী দলগুলোর কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের জন্যে ব্লাসফেমী আইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, একই ঘটনা আরও তীব্রভাবে ঘটেছে পাকিস্তানে ও সাম্প্রতিক সময়ের হিন্দুত্ববাদে জাগরিতভারতে।

আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে ধর্ম আলাদা ভাবে বিশেষ সুরক্ষা লাভের সকল যৌক্তিক ভিত্তি হারিয়েছে। তাই শিল্প, সাহিত্য, সমাজ, প্রথা, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতির মতো ধর্মও সকল ধরনের যৌক্তিক সমালোচনার অধীন। ধর্মের সমালোচনা করা, ধর্মের বিভিন্ন আচার ও প্রথার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা যেকোনো গণতান্ত্রিক মানুষের মৌলিক অধিকার। আর সেকারণেই প্রতিটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মানুষের তাই ‘ব্লাসফেমী বিরোধী’ আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার, কিন্তু এই আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটাই একমাত্র কিংবা প্রধান কাজ নয়, এর সাথে বিরোধিতা করতে হবে সেই রাজনীতির যা এখনও পৃথিবীর দেশে দেশে ‘ব্লাসফেমী বিরোধী’ আইনের পক্ষে দাঁড়ায়, ‘ব্লাসফেমী বিরোধী আইন’ এর ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করে।

 

তথ্যসূত্র ও দায় স্বীকার                              

  1. David Nash, 2007, Blasphemy in the Christian World: A History, Oxford University Press
  2. Freedom House, 2010, Policing Belief: The impact of Blasphemy law on Human Rights
  3. https://end-blasphemy-laws.org/countries/europe/germany/ এখানে বিস্তারিত দেখা যেতে পারে।
  4. বিস্তারিত দেখা যেতে পারে এখান থেকে https://foreignpolicy.com/2017/05/25/the-islamic-world-has-a-blasphemy-problem/
  5. আন্তর্জাতিক মানবতাবাদীদের এই সংক্রান্ত আন্দোলনের বিস্তারিত জানার জন্যে এখানে দেখা যেতে পারে https://end-blasphemy-laws.org/
  6. https://devgan.in/ipc/chapter_15.php#s295
  7. Asad Ahmed, ২০১৮, A brief history of the anti-blasphemy laws, Herald, https://herald.dawn.com/news/1154036
  8. Bhaskar, Anurag and Shubham Kumar (2018): “Constitutional Rights of Atheists and Non-believers,”Economic and Politial Weekly, Vol. 53, No. 38, pp 16-20
  9. https://devgan.in/ipc/section/295A/
  10. Surbhi Karwa, Shubham Kumar, 2019, A Blasphemy Law is Antithetical to India’s Secular Ethos, Economic and Political weekly, Vol. 54, Issue No. 37, 14 Sep, 2019, ISSN (Online) – 2349-8846 ভারতের রাজ্য পাঞ্জাবে কেন্দ্রীয়দণ্ডবিধি সংশোধন করে স্থানীয় ব্লাসফেমী আইন তৈরি বিস্তারিত তথ্য জানতে ভারতের আইন গবেষক সুরভি কারওয়া ওশুভম কুমার এই লেখাটি  এখানে দেখা যেতে পারে https://www.epw.in/engage/article/blasphemy-law-antithetical-indias-secular-ethos
  11. Salil Tripathi, ‘The right to be offended’, International Herald Tribune, May 29, 2006
  12. Edward Anderson (2015) ‘Neo-Hindutva’: the Asia House M. F. Husain campaign and the mainstreaming of Hindu nationalist rhetoric in Britain, Contemporary South Asia, 23:1, 45-66, DOI: 1080/09584935.2014.1001721
  13. হুসেনের মামলার রায় সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে একটি বিবরণ পাওয়া যেতে পারে এখানেhttps://globalfreedomofexpression.columbia.edu/cases/maqbool-fida-husain-v-raj-kumar-pandey/
  14. Beena Sarwar, 2009, The MF Husain controversy: Identity, intent and the rise of militant fascism Nukta Art, Volume 4, Issue 2,
  15. Ismail Royar, 2018, Pakistan’s blasphemy law and Non-Muslims, Lamp post education initiative
  16. মাশাল খানের খুন হওয়ার উপড়ে একটি প্রতিবেদন পড়ুন – https://www.bbc.com/news/world-asia-39593302
  17. মাশাল খানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের ভাষ্য পড়তে পারেন এখানে https://khybernews.tv/ig-says-no-evidence-against-mashal-his-friends/
  18. Asad Ahmed, ২০১৮, A brief history of the anti-blasphemy laws, Herald, https://herald.dawn.com/news/1154036
  19. https://nation.com.pk/14-Oct-2016/10-things-you-need-to-know-about-pakistan-s-blasphemy-law
  20. Ahamed, E. (1983). Current Trends of Islam in Bangladesh. Economic and Political Weekly, 18(25), 1114-1119. Retrieved April 5, 2020, from jstor.org/stable/4372230
  21. Ahamed, Emajuddin, and D.R.J.A. Nazneen. 1990, Islam in Bangladesh: Revivalism or Power Politics? Asian Survey 30(8):795–
  22. Lorch, J. (2019). Islamization by Secular Ruling Parties: The Case of Bangladesh. Politics and Religion, 12(2), 257-282. doi:10.1017/S1755048318000573
  23. ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এর সরকারী কপি পাওয়া যাবে এখানে – https://www.cirt.gov.bd/wp-content/uploads/2018/12/Digital-Security-Act-2018-English-version.pdf
  24. দেওবন্দী মোল্লাতন্ত্রের এই গন-উন্মাদনা সম্পর্কে লেখক তসলিমা নাসরিনের নিজের জবানীতে ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এখানে https://www.meforum.org/73/taslima-nasrin-they-wanted-to-kill-me
  25. তসলিমা নাসরিনের দেশত্যাগের পঁচিশ বছর পূর্ণ হলো ২০১৯ সালে। এই প্রতিবেদনে সেই বিষয়ে খানিকটা তথ্য পাওয়া যাবে।https://theprint.in/opinion/25-yrs-ago-today-i-lost-my-home-bangladesh-language-is-my-only-country-now-taslima-nasreen/273997/
  26. Ansari, I. (2008). Free Speech-Hate Speech: The Taslima Nasreen Case. Economic and Political Weekly, 43(8), 15-19. Retrieved April 7, 2020, from jstor.org/stable/40277172
  27. Ali Riaz, ২০০৮, Constructing Outraged Communities and State Responses: The Taslima Nasreen Saga in 1994 and 2007 », South Asia Multidisciplinary Academic Journal [Online], 2 | 2008, Online since 31 December 2008, connection on 19 April 2019. URL : http://journals.openedition.org/samaj/1262 ; DOI : 10.4000/samaj.1262
  28. https://www.deshrupantor.com/literature/2019/07/18/155879
  29. তসলিমা নাসরিনের লেখা বই রাখার অপরাধে নাগরিকের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক ঘটনাটি এখানে পড়ে নেয়া যেতে পারে https://www.bbc.com/bengali/news/2012/01/120104_sabookarrest
  30. তিন ব্লগারের উপড়ে রাষ্ট্রের নিপীড়ন মূলক আচরণের সংবাদ দেখা যাতে পারে এখানে – http://archive.prothom-alo.com/detail/news/341637
  31. ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের গ্রেফতারের সংবাদ দেখা যেতে পারে এখানে https://www.banglanews24.com/national/news/bd/186590.details
  32. প্রকাশক হত্যার খবর পাওয়া যাবে এখানে https://www.bbc.com/bengali/news/2015/11/151101_writers_panic
  33. বদ্বীপ প্রকাশনী বন্ধ করে দেবার সংবাদ এখানে দেখা যেতে পারে https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/770713
  34. ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা পাওয়া যাবে এখানে
  35. জাতীয় সংসদের সদস্যের প্রকাশ্য বিবৃতি https://banshkhalijanapadh24.blogspot.com/2019/10/blog-post_53.html
  36. রামু, নাসিরনগর ও গঙ্গাছড়ার ঘটনা নিয়ে ছোট প্রতিবেদন – https://www.bbc.com/bengali/news-46126648
  37. Rollier, P., Frøystad, K., and Ruud. A.E. (eds,). 2019. Outrage: The Rise of Religious Offence in Contemporary South Asia. London: UCL Press. DOI: https://doi. org/10.14324/111.9781787355279
  38. Dhaka Tribune. 2014. ‘Report: Hefazat sets Tk5 lakh bounty on Latif Siddique’s head.’ 3 November. https://www.dhakatribune.com/uncategorized/2014/11/03/report-hefazat-sets-tk5-lakh-bounty-on-latif-siddiques-head. Accessed 26 June 2019.
  39. নির্বাচনে ব্লাসফেমী আইন নিয়ে ইমরান খানের রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের উপড়ে প্রতিবেদন টি এখানে পড়া যেতে পারে https://www.theguardian.com/world/2018/jul/09/imran-kahn-accused-over-defence-of-pakistan-blasphemy-laws

 

অতিরিক্ত তথ্য সূত্র

  1. দুর্গা পুজো, পূরন্দর ভাট, ২০১৬, https://pnachforon.blogspot.com/2016/02/blog-post_25.html

 

Muhammad Golam Sarowar is an interested reader of different socio-political writings about South Asia. His main interest is in understanding the interplay between politics and religion. A physician by training, he is currently working as a R&D scientist in the pharmaceutical industry in Europe. He translated three books of Noam Chomsky and is a regular contributor in Bengali blogsphere.

 

 

Share.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate »