“মাগী  মাইনষের কথা শোনাও যা, না শোনাও তা ”- ভাষার লিঙ্গীয় অসমতার একটি পাঠ

Share this:

Abstract in English

Do women have any language? Is the language a woman speaks is her own or imposed upon by the patriarchal society? This article explores the role language plays in demeaning women, how it is used in taking away their human dignity, constructing them as inferior, less than equal beings with little agency, and devoid of the ability to claim their full humanity. Furthermore, the article explores the epistemological crises that plague the study of gender inequality.

___________________________

 

 

১. ভূমিকা

“মাগী  মাইনষের কথা শোনাও যা, না শোনাও তা ”- ব্যক্তিগত পরিসরে মাঠ পর্যায়ে কাজের সূত্রে গ্রামীন নারীর জীবন অভিজ্ঞতায় প্রচলিত এই বাক্যটি আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়, যার ফলে আমি এ প্রবন্ধটি রচনার তাগিদ অনুভব করি। বাংলা ভাষার বহুল আলোচিত একটি মেয়েলী শব্দ হলো ‘মাগী’ যার মৌলিক অর্থ ভাষার রাজনীতির কাছে আজ পরাজিত। শব্দটি এখন গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা কিনা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় অত্যন্ত সুচারু ভাষা ব্যবহারের রাজনীতিরই অংশ। নারী নিজেই তার  নিজেকে এমন ভাষা দিয়ে নির্মাণ করে, যা পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার একান্ত কাম্য। ভাষা চিন্তার সূত্রপাত ঘটায় আর সেই চিন্তার প্রতিফলনও ঘটে ভাষার হাত ধরে। সামষ্টিক-সচেতন/অবচেতন মননের যে কোন চিন্তার গঠনের নিমিত্তে কাজ করে ভাষা, আবার এই চিন্তার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমও ভাষা (Wittgenstein, ১৯৫৩)। ভাষা ভিন্ন যেহেতু চিন্তা চিত্রায়িত করা যায় না, সেহেতু এই ভাষার উৎসমূলে নিহিত বৈষম্যকে অনুধাবন করা না গেলে চর্চাগত পরিসরকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ভাষায় নারী-পুরুষের বৈষম্য কেবল ভাষার সংস্কৃতি চর্চাকেই নির্দেশ করে না বরং সমাজ ব্যবস্থার চর্চিত মতাদর্শিক ও মনঃস্তাত্ত্বিক বৈষম্যমূলক চেতনাকেও টিকিয়ে রাখে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই ভাষা ক্ষমতা চর্চার অন্যতম হাতিয়ার। ভাষা ব্যবহারের অধিকার, ভাষা নির্মাণের অধিকার, ভাষার অর্থবোধকতা তৈরীর অধিকার কেবলই ক্ষমতাশালী শ্রেণির একচ্ছত্র আধিপত্যের অংশ। পক্ষান্তরে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অস্ত্র হিসেবে কাজ করে ‘নীরবতা’ বা ‘সাইলেন্স’, যাকে প্রতিরোধের ভাষা আবার কখনো কখনো প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেও চিহ্নিত করা হয় (Scott, ১৯৮৪)। । এখন প্রশ্ন হলো নারীর ভাষা কী? নারীর আদৌ কোন ভাষা আছে কি? নারী যে ভাষায় কথা বলে সে ভাষা কি তার ভাষা নাকি অন্য কোন ক্ষমতাশালী শ্রেণির শেখানো বুলি? নারীকে নারী হয়ে উঠতে শেখানো হতে শুরু করে নারীর পরিচিতি নির্মাণ, নারীর বাস্তবতা ও নারীর মনন ও চেতনায় অধঃস্তনতার বীজ বপনে ভাষার প্রগাঢ়তা অনুধাবন এই প্রবন্ধের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি ভাষায় নারী- পুরুষ অসমতার অধ্যয়নের জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট উপস্থাপন এই প্রবন্ধের একটি মূল আলোচ্য বিষয়।

সমকালীন চিন্তায় মনে করা হয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এমন কি মননশীলতা অনুধাবনে ভাষা পাঠ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।  ‘লিঙ্গুইস্টিক টার্ন’  বা  ভাষাতাত্ত্বিক বাঁকের জনক Wittgenstein (১৯৫৩) মনে করেন ভাষা ছাড়া কোন চিন্তা সম্ভব নয়, ভাষা ও চিন্তা একে অপরের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। ভিটগেনেস্টাইনের এই চিন্তা পরবর্তীতে উত্তর-কাঠামোবাদ, উত্তর-আধুনিকতা এবং উত্তর-বিশ্লেষণবাদকে  বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। আমাদের সকল সচেতন ও অসচেতন চিন্তার বহিঃপ্রকাশই শুধু ভাষার মধ্য দিয়ে হয় না আমরা চিন্তাও করি ভাষায়। ভাষা সঞ্চিত হয় ঐতিহাসিক সচেতন-অচেতন, অভিজ্ঞতা,মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি,জ্ঞান, ঐতিহ্য ও চিন্তার মধ্য দিয়ে। ফলশ্রুতিতে ভাষা প্রকারান্তরে আমাদের মনন গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করে। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাষা কোন অরাজনৈতিৃক মতাদর্শ হতে উৎসারিত নয়, যার প্রতিফলন বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। আর তাই বাংলা ভাষায় লিঙ্গীয় অসমতার একটি অর্থতাত্ত্বিক ও কাঠামো তাত্ত্বিক পাঠ বিভিন্ন পরিসরে মনোযোগ পাচ্ছে। প্রবন্ধের আকারগত সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষিতে এই প্রবন্ধটিতে মূলত অর্থতাত্ত্বিক পরিসরে ভাষার ঐতিহাসিক এবং ব্যবহারিক লিঙ্গীয় বৈষম্য চর্চার ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করে ভাষা কিভাবে মনস্তাত্ত্বিক পরিসরে দৈনন্দিন চর্চার মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষ অসমতাকে বৈধতা দান করে, ব্যক্তির চিন্তা জগতকে প্রভাবিত করে লিঙ্গীয় অসমতাকে টিকিয়ে রাখে সে সকল বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

 

২. ভাষায় লিঙ্গীয় অসমতা প্রশ্নের বাকবিতণ্ডা

সমসাময়িক নারীবাদী চেতনায় নারীর নিজস্ব কোন ভাষা আছে কিনা তা নিয়ে রয়েছে নানা বাকবিতণ্ডা। কেননা ভাষা মাত্রই পুরুষের ভাষা বা ক্ষমতা প্রকাশের মাধ্যম সেটি নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন। মূলত ভাষা কেবল সংস্কৃতি প্রকাশের মাধ্যম নয়, ভাষা চিন্তা ও সংস্কৃতি নির্মাণের অন্যতম হাতিয়ার। আর তাই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ভাষার ব্যবহার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বৈষম্যমূলক যা প্রায় সকল ভাষার ক্ষেত্রেই লক্ষ্যণীয়। Borker (১৯৮০) এর মতে, লিঙ্গ, মর্যাদা এবং ভাষা চর্চার মধ্যকার সম্পর্ক কেবল প্রাকৃতিকই নয়, সাংস্কৃতিক নির্মাণও বটে। তার মতে, নারীকে পুরুষের বিপরীতে প্রতিস্থাপনের যে প্রতিকী মূল্যবোধ, তা তৈরীই হয় ভাষার মধ্য দিয়ে। নারীকে পুরুষের বিপরীতে বা বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে নারী -পুরুষের যে নির্মিত সম্পর্ক তার প্রথম সোপানই হলো ভাষা। ভাষাগত পার্থক্যই আমাদের মাঝে প্রাথমিক পরিসরে নারী-পুরুষ ভিন্নতাকে তুলে ধরে এবং একই সাথে দুটি ভিন্ন ভিন্ন লিঙ্গের লিঙ্গীয় বৈশিষ্ট্য ও লিঙ্গীয় কার্যবিধি নির্মাণ করে। আবার, এই ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারী পুরুষের ভিন্নতা দেখা যায়। ভাষা ব্যবহারের সাবলীলতাও নারী-পুরুষের লিঙ্গীয় সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। Dale Spender (১৯৮০) বলেন, পুরুষ তার নিজের মতো করে ভাষা, চিন্তা এবং বাস্তবতাকে তৈরী  করেছে। অনেকে আবার স্পেন্ডারের এরূপ বক্তব্যকে অগ্রাহ্য করে বলেন, এ ধরনের চিন্তাতে মনে হতে পারে যে, ভাষার এক ধরনের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রয়েছে কিন্তু এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি দেখা যে, ভাষাকে কীভাবে নারী অবদমনের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং ভাষা কীভাবে ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্য দিয়ে রচিত ও নির্মিত হয়। ভাষাকে আমরা শুধুমাত্র ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার করি না ভাষার মাধ্যমে আমরা আমাদের চিন্তাকে তৈরি করি। ভাষা আমাদের চিন্তা হতে যেভাবে উৎসারিত ঠিক একই ভাবে ব্যক্তির ভাষা তার চিন্তা দ্বারা প্রভাবিতও বটে। তাই ভাষাকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে এর সাথে যুক্ত সামাজিক, রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক নির্মাণকে অনুধাবন করা জরুরী। ভাষার সাথে নারীর যুক্ততার প্রসঙ্গটি এতটাই নিবিড় যে, নারীকে রাজনৈতিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ দ্বারা যুগ যুগ ধরে ‘সাইলেন্স এনটিটি’ বা ‘নীরব সত্ত্বা’  হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণেই সমসাময়িক নারীবাদীগণ নারীর অবদমনের প্রসঙ্গটিকে বাস্তুববাদী হতে প্রতীকিবাদের আলোকে ব্যাখ্যা করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে ভাষা হচ্ছে নারীর প্রতীকি অবদমনের অন্যতম মাধ্যম। ভাষার মধ্য দিয়েই নির্মিত হয় নারী ও পুরুষের পৃথক চিন্তা ও ক্রিয়া। তাই ভাষা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই নারী অবদমনের বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলা সম্ভব।

অন্যদিকে Keenan (১৯৮৯) তার কাজে দেখান, মালাগাছি নারীরা যখন কথা বলে, তখন সেটা খুবই সাদামাটা এবং সরাসরি বক্তব্য হয়ে থাকে অন্যদিকে পুরুষেরা যখন কথা বলে সেটি পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। তিনি তার কাজে দেখান, কীভাবে নারী তার দৈনন্দিন ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে অগুরুত্বপূর্ণ এবং পুরুষের ভূমিকা তার ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে পরিকল্পিত ও রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। আবার অনেকের মতে, নারীর ভাষা না থাকা অর্থাৎ নারীর নীরবতা, নারীকে অধঃস্তন করে তোলে। ভার্জিনিয়া উলফ, ডরথি রিচার্ডসনের মতে, নারীর নিজস্ব কোন ভাষা নেই। তারা নারীর অভিজ্ঞতাকে বর্ণনা করার জন্য তাই, ‘নারীদের নিজস্ব ভাষা’র উপর গুরুত্বারোপ করেন। Ann Livas (১৯৯৫) বলেন, ভাষার ব্যবহার আবশ্যিকভাবেই ব্যক্তির লিঙ্গ দ্বারা নির্ধারিত। তিনি ভাষার ঐতিহাসিক নির্মাণের উপর গুরুত্ব দিয়ে এর পরিবেশন সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি দেখান, উপন্যাস, নাটকে কিভাবে নারী এবং পুরুষের উক্তিকে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিকতা দ্বারা পরিবেশন করা হয়েছে। এরূপ পরিবেশনা কেবল ভাষাগত উপস্থাপন নয় বরং এরূপ ভাষাগত পরিবেশনা ভাষাকে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে লিঙ্গীয় ক্ষমতা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অন্যতম কৌশল। Bauman (১৯৯৭), সতের শতাব্দীর ইংরেজ নারী-পুরুষের লিঙ্গীয় সম্পর্ক বিচারে বলেন, নারী-পুরুষ উভয়ের ভাষা ব্যবহারের স্বাধীনতা থাকা না থাকা নির্ভর করে সমাজ ব্যবস্থার রাজনৈতিক মতাদর্শিক নির্মাণের উপর। যেমন, অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়, নারীর কথা বলার কোন স্বাধীনতা নেই বা সুযোগ নেই বলেই নারী নীরব থাকে এটি যেমন সত্য আবার ভাষা দোত্যনা বিচারে নীরবতাকে ভাষাহীন ভাবাও সমস্যাজনক বলে অনেকে মনে করেন। আবার ভাষাতাত্ত্বিক তথ্য উপাত্ত বিচারে বিভিন্ন সমাজে দেখা যায় পুরুষত্ব বা পৌরুষ মানে হলো ‘ট্যাঙনেস’ বা ‘জিহ্বা সর্বস্ব’ অন্যদিকে নারীত্ব হলো নম্রতা ও ভদ্রতা (Susan Gal, ১৯৮৪)। সহজ করে বলা যায়, পুরুষ বলবে আর নারী চুপ থাকবে। পুরুষের বলার মধ্য দিয়ে তার পৌরষত্ব আর নারীর না বলার মধ্য দিয়ে তার নম্রতা ও কোমলতা তথা নারীত্ব প্রকাশ পায় যা আমাদের সমাজেও লক্ষ্যণীয়। কিন্তু অনেক চিন্তাবিদের মতে নীরবতাকে ক্ষমতাহীনতা বা কেবলই নীরবতার মধ্য দিয়ে অনুধাবন করা সমস্যাজনক। ধর্মীয় আচার, আধুনিক মনঃস্তত্ত্ব, বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থার অনেক সময় ক্ষমতাশালীরা চুপ করে থাকে এবং ক্ষমতাহীনদের দিয়ে বলানো হয়ে থাকে (Foucault, ১৯৭৯)। একইভাবে Stattel (১৯৮৩), তার কাজের বরাতে বলেন, আমেরিকান সমাজের অনেক গৃহস্থালিতে নীরবতা বা ‘সাইলেন্স’-কে  কৌশলগত ক্ষমতা হিসেবে পুরুষেরা ব্যবহার করে। ফলে, নীরবতাকে সবসময় নারীর ভাষা বা কেবল নারীই নীরব থাকে এরূপ ধারণা সমস্যাজনক।

 

৩. লিঙ্গীয় রাজনীতি ও ভাষাগত বৈষম্য অনুধাবন

ভাষাকে বিশ্লেষণ করলে প্রায় সকল ভাষাতেই নারীর জন্য ব্যবহৃত শব্দ সমূহকে প্রকৃতির সাথে যুক্ত করা হয়ে থাকে এবং পুরুষের সাথে সম্পর্কিত শব্দ সমূহ সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করা হয়ে থাকে। ফলে নারীর ভাষাকে প্রাকৃতিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে (Bodine, ১৯৭৩)। Otlo Jefperson (১৯২২) বলেন, নারীর ভাষাকে প্রাকৃতিক হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি রাজনৈতিক যেখানে নারীকে কেবল ভাষা দিয়ে নয় বরং নারীত্বকে বিশুদ্ধ, পবিত্র, অনুভূতিপ্রবণ হিসেবে নির্মাণ করার উদ্দেশ্য নিয়ে ভাষাকে ব্যবহার করা হয়। যার মধ্য দিয়ে নারী কেবল অধঃস্তনই হয়নি, পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিতও হয়।Corsby & Nyquist (১৯৭৭) বলেন, ভাষা ও লিঙ্গের সাথে সম্পর্ক যতটা না বক্তার লিঙ্গীয় পরিচিতি, বয়স বা অবস্থার উপর নির্ভর করে তার চেয়ে বেশি এটি নির্ধারিত থাকে। ফলে ব্যক্তির কোন পছন্দের সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ ভাষা ব্যক্তির অবস্থান সাপেক্ষ কাজ করে না ভাষা পূর্ব হতেই নির্ধারিত থাকে এবং ব্যক্তি সে অনুযায়ী ক্রিয়া করে। Keenan (১৯৮৯) বলেন, মেরিনা সংস্কৃতিতে মাদাগাস্কার সমাজে ভাষার মধ্যেই কতগুলো বৈষম্যমূলক মতাদর্শিক অবস্থান নিহিত থাকে যেখানে প্রথা ভঙ্গকারী বা অশুভতা কেবল নারীবাচক শব্দ দ্বারাই নির্দেশিত হয়। যেমন আমরা লক্ষ্য করতে পারি, আমাদের সমাজে অপয়া, অলুক্ষণে, ডাইনি এ সকল শব্দ মাত্রই নারীবাচক। পাশাপাশি এ শব্দগুলোর কোন পুরুষবাচক শব্দও নেই। ফলে এ জাতীয় শব্দের উৎপত্তির মধ্য দিয়েই লিঙ্গীয় রাজনীতিকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। অন্যদিকে সাধারণ ধারণায় ভাবা হয়ে থাকে বাংলা ভাষা ইংরেজি ও অন্যান্য অপরাপর ভাষা হতে অনেক বেশি লিঙ্গ নিরপেক্ষ ও অবৈষম্যমূলক। কারণ বাংলা ভাষায় নারী বা পুরুষের জন্য পৃথক কোন শব্দ ব্যবহৃত হয় না। যেখানে আমরা দেখতে পাই ইংরেজি ভাষায় পুরুষের জন্য ‘He’ এবং নারীর জন্য ‘She’ লেখা হয়ে থাকে। এবং মজার বিষয় হলো ক্ষমতাধর সকল কিছুকে পুরুষের সাথে তথা পুরুষ বাচক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এমনকি যেগুলোকে আমরা ক্লিব লিঙ্গ বা কোন লিঙ্গ দ্বারা নির্ধারণ করি না, সে শব্দগুলোর প্রায়োগিকতার ক্ষেত্রেও বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন, যদি বলা হয়- ঈশ্বরের কোন বর্ণ নেই তাহলে এর ইংরেজি করা হবে ‘গড হ্যাজ নো কালার’,এখানে যখন পরের বাক্য যদি বলা হয়, তিনি সকলের জন্য সমান তাহলে যদিও ঈশ্বর সকলের জন্য সমান বলা হবে কিন্তু ভাষাগত দিক থেকে তা লক্ষ্য করা যায় না কারণ ‘গড’ এর পরিবর্তে ইংরেজিতে সর্বনাম হিসেবে ব্যবহার করা হবে ‘হি ইজ ইক্যুয়াল টু এভরিওয়ান’। অতএব এখানে ক্ষমতাশালী সৃস্টি কর্তাকে পুরুষবাচক ‘He’ দ্বারা চিহ্নিত করা হল কারণ পুরুষ মাত্রই একক ও অখণ্ড ক্ষমতার আধার, আর এভাবেই সমাজের মনঃস্তত্ত্ব নির্মিত হয়েছে এবং এ চেতনার নিমিত্তে কাজ করে চলছে ইংরেজি ভাষা। এমনকি বিভিন্ন শব্দগত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। ভাষা আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করে এবং ভাষার মধ্য দিয়েই তা চিহ্নিত হতে থাকে। এটিও ইংরেজি ভাষায় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। যেমন একজন নারীর ইংরেজি হলো ‘Woman’ এবং পুরুষের ইংরেজি হলো ‘Man’। মজার বিষয় হলো নারী-পুরুষ বিভাজন না করে যখন আমরা মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাই তখন আমাদের যে শব্দটি ধারণ করতে হবে সেটিও হলো ‘Man’ যেমন যদি বলি মানুষ মরণশীল এর ইংরেজি হবে ‘Man is mortal’ এছাড়া আরো কিছু শব্দ ও প্রবচন আছে যেগুলোতে আমরা লিঙ্গ নিরপেক্ষতা দাবি করছি কিন্তু বাস্তবে তা লিঙ্গীয় ক্ষমতা সম্পর্ককেই ধারণ ও বহণ করে থাকে। যেমন Man kind, Practice makes a man perfect, Gentleman word। আবার একটি দীর্ঘ শতক নারীবাদীরা বিশেষত ভাষাতাত্ত্বিক নারীবাদীদের প্রতিবাদ ও আন্দোলনের সূত্র ধরে অনেক নারীবাচক শব্দকে তুলে দেয়া হয়েছে কিন্তু Martyna (১৯৭৮) বলেন, এ জাতীয় লিঙ্গীয় বৈষম্যমূলক শব্দ তুলে দেয়াতে কোন প্রকার ভাষাগত বৈষম্য দূর হয়নি কারণ শব্দসমূহের উৎপত্তিতেই অধঃস্তনতার বীজ নিহিত। Silveira (১৯৮০) তার কাজে দেখান যে, নারীবাদীদের দাবীর মুখে ইংরেজি ভাষার অনেক ক্ষেত্রে নারীকে এখন পৃথক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করা হয় না। কারণ নারীর জন্য ব্যবহৃত শব্দসমূহ অনেক আগে থেকেই ছিল হীনবাচক। ফলে একটা দীর্ঘ সময় যাবত এ জাতীয় শব্দ থেকে নারীকে দূরে রাখার আন্দোলন করা হয়ে আসছে। যেমন, ইংরেজি ভাষার কোন পুরুষ লেখককে সম্মান পূর্বক বলা হয় ‘Sir’ এবং নারীকে বলা হতো ‘Madam’। ম্যাডাম শব্দটির উৎপত্তি একটি ফরাসি শব্দ ‘Madame’ থেকে। এই শব্দটি দুটি ভাগে বিভক্ত একটি হলো ‘Ma’ এবং ‘Dame’ এর সমন্বয় হলো ‘Madame’ এবং এর অর্থ হলো ‘My Lady’ এখানে ‘Dame’ শব্দটি মূলত ব্যবহৃত হতো সেই নারীকে বোঝাতে যে পতিতাবৃত্তির সাথে যুক্ত এবং এটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হতো আবার ক্ষেত্র বিশেষে কোন নারীর যৌনতাকে যখন কেউ বস্তুগত অর্থে কিনে নিত তখন সেই পুরুষের ‘Madam’ হতো সে নারী। অর্থাৎ ‘Lord’ এর ‘My Lady’ হয়ে উঠার মধ্য দিয়ে নারীর যৌনতাকে নির্দিষ্ট কোন পুরুষ নিয়ন্ত্রিত করত এরই সূত্রে পরবর্তী পরিসরে নারীকে ইংরেজি ভাষায় সম্মান পূর্বক ‘Madam’ হিসেবে সম্বোধন করার চর্চা শুরু হয়। কিন্তু এ শব্দটি আদৌ সম্মানজনক কিনা সেটিই প্রশ্নসাপেক্ষ। উল্লেখ্য, ইংরেজি ‘Sir’ শব্দটি যেখানে সম্মান মর্যাদার ইতিহাস হতে উৎসারিত সেখানে ‘Madam’ শব্দটি নারীর অধঃস্তনতার ইতিহাস হতে গৃহীত। তাই অনেক নারীবাদী চিন্তাবিদগণ এই ‘Madam’ শব্দটি প্রত্যাখ্যান করেন। যার ফলে ইংরেজি ভাষায় এখন অনেক প্রশাসনিক দলিল দস্তাবেজে বা চিঠিতে ‘Madam’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে নারীকে যখন এখন সম্বোধন করা হয় তখন পৃথক কোন শব্দ নয় নারীকেও ‘Sir’ শব্দটিকে ধারণ করতে হয়। যেমন- বাংলা ভাষায় একটি দীর্ঘ সময় নারীকে প্রশাসনিক দলিল দস্তাবেজে জনাবা তথা জনৈক জনাবের জনাবা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা এখন আর লক্ষ্য করা যায় না। এখন যে চর্চাটি আমরা করে থাকি তা হলো বাংলার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ‘জনাব’ সম্বোধনটি গ্রহণ করি যা পুনরায় আমাদের ভাষার লিঙ্গীয় বৈষম্যকেই উপস্থাপন করে বলে আমি মনে করি। এ বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট আকারে আমাদের সামনে উপস্থাপিত হতে পারে যদি আমরা বাংলা ভাষার বিভিন্ন নারীবাচক শব্দগুলোর বিশ্লেষণ তুলে ধরি।

আমাদের সমাজে নারীদেরকে সাধারণত ‘মহিলা’ হিসাবে সম্বোধন করা হয়। এই শব্দটি নিয়ে দুটি পক্ষের মাঝে দ্বন্দ্ব বিরাজ করে। যার এক পক্ষের দাবি শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘মহ্’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ  ‘মহৎ’ বা ‘মহতী’। অপর পক্ষের দাবি আরবি ‘মহল’ শব্দ হতে ‘মহিলা’ শব্দটি উৎসারিত। উভয়ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় যে নারীর লিঙ্গীয় ভুমিকা নির্মাণে সুকৌশল রাজনীতি বিরাজমান। হয় নারীকে ‘মহৎ’, ‘মমতাময়ী’, ‘ত্যাগী’ ডিসকোর্স এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা অথবা এটি নারীকে চার দেয়ালের মহলের মাঝে সীমায়িত করার প্রচেষ্টা। আলোচনার এ পর্যায়ে আমি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে ভাষা ব্যবহারের লিঙ্গীয় অসমতা কিভাবে মনঃস্তাত্ত্বিক পরিসরে অসমতা চর্চাকে উৎসাহিত করে সে বিষয়ে  আলোকপাত করা হবে। বাংলা ভাষার অসমতা পাঠে চৌধুরী (২০০০) ভাষার লিঙ্গীয় অসমতাকে পরিবেশনের সাথে যুক্ত করে ব্যাখা করেন, যা আব্যশিকভাবেই ভাষার লিঙ্গীয় অসমতা অনুধাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস তথাপি এটি মনঃস্তাত্তিক পরিসরে কিভাবে লিঙ্গীয় ভূমিকাকে নির্মাণ করে সে সম্পর্কে কোন দিকনির্দেশনা দেয় না। একইভাবে  ইসলাম ও ফেরদৌস (২০০০) একটি  প্রেক্ষিতগত পরিসরে ভাষা কীভাবে লিঙ্গ ও ক্ষমতার সাথে যুক্ত সম্পর্কে আলোকপাত করেন কিন্তু এর মাধ্যমে ভাষার লিঙ্গীয় অসমতা ও চিন্তা উৎপাদনের রাজনীতি, ভাষাগত হেজেমনিক চর্চা, ব্যবহারিকতা ও লিঙ্গীয় ভূমিকা নির্মাণের রাজনীতির সাথে যুক্ত মনঃস্তাত্ত্বিক নির্মাণ প্রক্রিয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। ফলশ্রুতিতে বিচ্ছন্নভাবে ভিন্ন ভিন্ন পরিসর হতে ভাষায় অসমতার পাঠ আমাদের একটি অসম্পূর্ণ ধারণা দেয় যা কিনা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।

 

৪. ভাষার শব্দগত ব্যাবহার ও নান্দনিকতার রাজনীতি

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ সমূহ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, নারীর জন্য ব্যবহৃত শব্দ সমূহ কখনোই নারীকে ক্ষমতা সম্পর্কের কেন্দ্র উপস্থাপন করে না। যেমন- ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটি। রাষ্ট্রপতি শব্দের অর্থ যিনি রাষ্ট্রের অধিপতি এবং এই শব্দটি সম্পূর্ণ অর্থে একটি পুরুষবাচক শব্দ, যার অর্ন্তনিহিত ব্যাখ্যা হলো রাষ্ট্রের ভূস্বামী, যিনি রাষ্ট্রের সর্বচ্চো ব্যক্তি, রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করার যিনি একক ক্ষমতা ধারণ করেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, রাষ্ট্রকে শাসন করার ক্ষমতা কেবলই একজন পুরুষ রাখে এখানে সেটিরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আর এ কারণেই এ জাতীয় শব্দের কোন স্ত্রীবাচকতার সুযোগ নেই কিন্তু এটিকে একটি নিরপেক্ষ শব্দ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যা কিনা যতটা না ভাষাগত বৈষম্য তার চেয়ে অনেক বেশি লিঙ্গীয় রাজনীতির চর্চার ফসল। রাষ্ট্রপতি শব্দটির পরিবর্তে আমরা চাইলেই রাষ্টপ্রধান শব্দটি ব্যবহার করতে পারি যা নারীকেও তার যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ করে দেবে, নারীকে পুরুষবাচক শব্দ গ্রহণের  আব্যশ্যিকতা থেকে মুক্তি দেবে। একইভাবে লক্ষ্য করা যায় যে, সভাপতি শব্দটির ব্যবহারের সংকট। আবার বাংলা ভাষার সাহিত্য, সঙ্গীত, প্রবাদ প্রবচনের মধ্য দিয়েও প্রতিনিয়ত নির্মিত হয় নারী ও পুরুষের আদর্শগত চরিত্র। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা, অসহায় নারী, লজ্জা নারীর ভূষণ ইত্যাদি।  যেখানে কেন নারীর জন্য লজ্জা ভূষণ তার কোন ব্যাখ্যা নেই কিন্তু যুগ যুগ ধরে নারীকে তা শিখিয়ে আসা হচ্ছে ভাষার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে অন্যদিকে পুরুষের কাহিনি মাত্রই বীরত্বের গাঁথা, আমাদের প্রচলিত বাংলা ভাষায় বীরপুরুষের গল্প গাঁথা যত বেশি শোনা যায় নারীর বীরত্বের ইহিতাস সেখানে নেই বললেই চলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো নারীর বীর গাঁথা কখনো ইতিহাস বা প্রচলিত বাংলা ভাষায় সমাদৃত হয়নি। তাই নারীকে বীর নারী বলা যতটা কঠিন নারীর বীরত্বকে ‘বীরঙ্গনা’  উপাধি দেয়া আমাদের জন্য ততটাই সহজ। কারণ নারীকে তার যৌনতা ও শরীর থেকে পৃথক করার তাগিদ আমরা অনুভব করি না, নারীকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থ্যা বীরত্বের আচলে দেখতে চায় না। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ,বাংলা ভাষায় নারীর বীরত্বকে আড়াল করে এবং পুরুষের বীর গাঁথাকেই আমাদের সামনে নিয়ে আসে আর ভাষা এর অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। অপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাষার নান্দনিকতা ব্যবহারের রাজনীতি। ব্যক্তির নামকরণের ক্ষেত্রে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠে। আমাদের সমাজে আমরা যখন ব্যক্তির নামকরণ করি তখন তা এতটা লিঙ্গ নিরপেক্ষ থাকে না যতটা আমরা মনে করি। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, একটি শিশুর নামকরণের সময় আমাদের সময় চিন্তার মূলে থাকে শিশুটির লিঙ্গ। মূলত তার লিঙ্গীয় পরিচিতি নির্মাণের রাজনীতি শুরু হয় তার নামকরণের মধ্য দিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে যেসকল চিন্তাকে মাথায় রেখে নাম রাখি, মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে তা বৈপরীত্যমূলক। প্রশ্ন হলো এটি কি কেবলই বৈপরীত্যমূলক নাকি একই সাথে রাজনৈতিক? কারণ এই নামকণের মধ্য দিয়ে সমাজ শিশুটির কার্যবিধি, লিঙ্গীয় ভূমিকা, সামাজিক প্রত্যাশাকে নির্ধারণ করে। ফলে মেয়ে বাচ্চার নামকরণের ক্ষেত্রে প্রায়সই যেটি স্থান পায় তা হলো কোমলতা, নির্মলতা, সৌন্দর্য, স্নিগ্ধতা অন্যদিকে পুরুষের নাকরণের মূলে থাকে দম্ভ, সংকল্প, বীরত্ব, এবং সৃষ্টিশলীতা। অনেক ক্ষেত্রে এই সকল নামকরণে নারীর নাম কেবল আকার সর্বস্বে পরিণত হয়। যেমন- পুরুষের নাম যদি নির্মল, নারীর নাম নির্মলা, বিমল-বিমলা, কমল-কমলা, জয়-জয়ীতা ইত্যাদি। এমনকি মাঝে মাঝে আমরা বংশেরও নারী-পুরুষ নির্ধারণ করে বসি। এটি ‘নিচ’ বা ‘অভিজাত’ উভয় বংশের ক্ষেত্রেই লক্ষ্যনীয়। যেমন- সৈয়দ বংশের ছেলে বাচ্চার নামকরণে যদিও সৈয়দ বংশ অবিকল থাকে কিন্তু সৈয়দ বংশের মেয়ে শিশুর নামকরণের ক্ষেত্রে  সেটি সৈয়দা-তে পরিগণিত হয়। অর্থাৎ বংশ অভিজাত ও ক্ষমতাশীল যাই হোক না কেন নারী মাত্র ‘অন্যতা’কে বহন করে এবং ভাষার এই লিঙ্গীয় বৈষম্য চর্চাই পরবর্তীতে সামাজিক বৈষম্যকে জোরদার করে তুলে। তবে এ প্রসঙ্গে উলেখ্য যে, যেহতু বাংলা ভাষা সংস্কৃত দ্বারা প্রভাবিত একটি ভাষা সেহেতু একটি দীর্ঘকালীন সময় লিঙ্গান্তর বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। তবে আশার কথা এই যে, অতি সম্প্রতি বাংলা একাডেমী এ সম্পর্কে সরব হয়ে উঠেছে। এভাবেই ভাষা পুরুষতান্ত্রিকতাকে তথা পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শকে টিকিয়ে রাখে এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আরচণকে বৈধতা দেয় (হোসেন, ২০০৮)।  বাংলা ভাষার এই সকল শব্দগত ব্যবহারের রাজনীতি ও লিঙ্গীয় বৈষম্য আরো প্রকট ভাবে ধরা পড়ে আমাাদের বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত গালিসমূহ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। আলোচনার এই পর্যায়ে আমি বাংলা ভাষায় প্রচলিত কতিপয় গালিসমূহ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ভাষার লিঙ্গীয় রাজনীতি অনুধাবনে সচেষ্ট হব।

 

৫. বাংলা ভাষার গালির ব্যবহার ও লিঙ্গীয় রাজনীতি

বাংলা ভাষার লিঙ্গীয় বৈষম্য অনুধাবনের অপর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য গালিসমূহ। মজার বিষয় হলো আমাদের বেশিরভাগ বাংলা গালিগুলো নারীবাচক তথা নারীকেন্দ্রিক, নারীকে উদ্দেশ্য করেই যেন এ সকল গালিসমূহ নির্মিত। যার মূলে থাকে নারীর শরীর ও যৌনতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায় এই গালিগুলোর উৎস নারীর ক্রিয়া ও কার্যবিধিকে হেয় প্রতিপন্ন করে উপস্থাপন করা এবং নারীকে সমাজের কাছে অসম্মানিত করা। কুলটা, দ্বিচারিণী, ভাতার, খানকী এগুলো বাংলা ভাষার ব্যবহৃত শব্দ সমূহ যা কালক্রমে গালির সাথে যুক্ত হয়ে নতুন মাত্রা লাভ করে। যেমন খানকি শব্দটি উৎপত্তিগত অর্থেই নারীর শরীর বিক্রির সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ যে নারী তার শরীর বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে তাকে ‘খানকি’ বলে সম্বোধন করা হয়। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, গালি কোন শোভনীয় ভাষা নয়। তবে প্রত্যেক ভাষার অন্তর্গত একটি বিশিষ্ট শব্দ ভা-ারকেই গালি বলে। ডঃ সুকুমার সেন গালিকে ‘ইতর শব্দ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার মতে, যে শব্দ বা পদ ভদ্রলোকের কথ্য ভাষার ও লেখ্য ভাষায় প্রয়োগ হয় না এবং যাহার উৎপত্তি কোন ব্যক্তি বিশেষের বা দলবিশেষের হীন ব্যবহার হতে উৎসারিত তা-ই ‘ইতর শব্দ’ বা গালি। গালির ব্যবহার মানুষ সচেতনভাবেই করে থাকে এবং সামাজিক প্রথা বা সমাজ স্বীকৃত আচার-আচরণের প্রতিফলন ঘটে গালির মধ্য দিয়ে। সাধারণত গালি বললে অশ্লীলতার অনুষঙ্গ মনে হতে পারে। কিন্তু এই অশ্লীলতাই ক্ষেত্র বিশেষে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কারণ এটি সমাজের মতাদর্শিক নির্মাণকে পরিরবশন করে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত প্রবাদ প্রবচন, সাহিত্যের নানা অংশে এই গালির ব্যবহার লক্ষণীয় যা কেবল গালি নয়, লিঙ্গীয় রাজনীতি চর্চার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

যেমন- একে বউ নাচলি, তায় খেমটা বাজনি,

একে রাড়ের ভাত, তায় মসুরের ডাল।

খানকি তার মান কি।

চোরের না ছিলানের মা।

পাঁচজনের খায় একলা মাগি।

বাংলার বহুল প্রচলিত এ সকল প্রবাদ নারীকে কেবল অসম্মানিতই করেনি, নারীর ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিদ্যাসাগর ‘প্রভাবতী সম্ভাষণ’ গ্রন্থে লেখন-

‘যেন, তুমি আমার ক্রোড় বসিয়া আহার করিতে করিতে ‘মাগি শোলো’ বলিয়া আমার জানুতে মস্তক বিন্যস্ত করিয়া স্মরণ করিতেছ’-

এর পাদটীকায় বিদ্যাসাগর বলেন-

‘মাগি শুইল। আমি আদর করিয়া, তোমায় মাগি বলিয়া আহ্বান ও সম্ভাষন করিতাম। তদনুসারে তুমি মাগি শব্দে আত্মনির্দেশ করিতে।

 

এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, মাগী শব্দটি বর্তমানে কেবলই গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং নারী নিজেই এইরূপ গালিকে অলংকৃত করতে পিছপা হয় না তা পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে অপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার দৈনন্দিন জীবনাচার বিশ্লেষণে আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই, এই পুরুষ যখন উত্তেজিত হয়ে বা প্রতিবাদ স্বরূপ গালি ব্যবহার করছে তখন  আবশ্যিক ভাবেই সে সকল গালি উক্ত পুরুষের সাথে সম্পর্কিত নারীকে নির্দেশ করে দেয়া হচ্ছে। যেমন আমার গবেষণা কাজের তথ্য উপাত্ত হতে দেখা যায়- এক ছেলে যদি অন্য একটি ছেলেকে নিছক হাসি ঠাট্টা করে গালি দেয় তাহলে সে গালিটি হয়, ‘শালা’ যেটি কিনা একটি ঠাট্টা সম্পর্কীয় জ্ঞাতী পদাবলী, কিন্তু মজার বিষয়টি হলো বুৎপত্তিগত অর্থ বিচারে এটি একজন পুরুষ ব্যবহার করে অন্য পুরুষের বোনের যৌনতা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে। একই ভাবে  যখন কারো সাথে বিবাদ ঘটে বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে গালি দেয়া হয়, তখন সে গালিটি হয় তার মাকে অথবা ব্যক্তির বোনকে খাটো করে সম্বোধনের মাধ্যমে। যেমন, খানকির পোলা, বানচোৎ, মাদারচোৎ ইত্যাদি। অর্থাৎ ক্ষমতা সম্পর্কের বলয়ে নারী এতই নিম্ন অবস্থান ধারণ করে যে পুরুষ যখন যেভাবে ইচ্ছা ভাষার মাধ্যমে তাকে নির্মাণ করার ক্ষমতা রাখে এবং ভাষার এরূপ লিঙ্গীয় বৈষম্য নারী পুরুষের সামাজিক বৈষম্যকে মনঃস্তাত্ত্বিক পরিসরে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন লিঙ্গীয় ভূমিকা নির্ধারণ করে এবং ভাষার মাধ্যমে প্রভাবশালী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বৈষম্যমূলক সামাজিক চর্চার বৈধতা দান করে নারী- পুরুষ অসমতাকে সমাজ ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের আড়ালে আরো প্রগাঢ় করে তোলে।

 

৬. উপসংহার

ভাষাতাত্ত্বিক নারীবাদীগণ ভিন্ন ভিন্ন আলাপচারিতার আলোকে ভাষার লিঙ্গীয় অসমতার সংকট সুনির্দিষ্ট করেন। এঙ্গলো-আমেরিকান নারীবাদীগণ প্রথম ভাষায় লিঙ্গীয় অসমতা প্রশ্নটি উত্থাপন করেন যেখানে নারীর অভিজ্ঞতা বয়ানে এবং নারীর সতন্ত্র সত্তার নির্মাণে পৃথক সতন্ত্র ভাষার উপর গুরত্বারোপ করে নারীর জন্য ভিন্ন ভাষা নির্মণের প্রস্তাব করা হয় (Wolf, ১৯৮৮; Christine, ১৯৮৪; Spnder, ১৯৮৫ প্রমুখ)।  পরবর্তীতে  এরূপ চিন্তা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে, যেখানে বলা হয় নারাবদীরা এখন পর্যন্ত ‘Feminist Criticism’ বলতে কি বোঝায় তারই সঠিক সংজ্ঞায়ন সুনির্দিষ্ট করতে ব্যর্থ সেখানে নারীর জন্য সম্পূর্ণ পৃথক সতন্ত্র ভাষা গঠনের চিন্তা আমাদের শুধু নিরন্তর একটি বির্তকের দিকে নিয়ে যাবে কোনরূপ সমাধান দিতে পারবে না (Kolodny, ১৯৭৫)।  অন্যদিকে ফরাসী নারীবাদী গণ ভাষা কিভাবে সাবজেক্টিভিটি তৈরীর মধ্য দিয়ে অসমতার সৃষ্টি করে সে প্রসঙ্গে আলোকপাত করেন যেখানে Beauvoir (১৯৪৯) ভাষার মধ্য কিভাবে নারীকে পুরুষের ভিন্নতায় কিভাবে ‘অন্য’ হিসেবে নির্মাণ করা হয় এবং তার সুত্র ধরে নারীকে সবসময় পুরুষের বিপড়ীতে প্রতিস্থাপন করা হয় (Cixous,১৯৬৮)। পরবর্তীতে ভাষার মধ্য দিয়ে নারী ও পুরুষের পরস্পর বৈপরীত্যমূলক অবস্থান নির্মাণের রাজনৈতিক  পরিসর নিয়ে Derida (১৯৬৮) ভাষার লিঙ্গীয় অসমতা পাঠের নতুন দ্বার উন্মোচন করেন। ভাষার লিঙ্গীয় বৈষম্য, নারী-পুরুষ বৈষম্যকে শুধু নয় সামাজিক মতাদর্শিক পুরুষতান্ত্রিক চেতনাগত যে নির্মাণ প্রক্রিয়া তার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তাই ভাষাকে বিশেষত লিঙ্গীয় ভাষাগত রাজনীতি অনুধাবনে আমাদের সর্তক থাকতে হবে এবং ক্ষেত্র বিশেষে ভাষাকে ‘ডিকনস্ট্রাকশন’ তথা বিনির্মাণে উদ্যোগী হতে হবে। অন্যথায় বাংলা ভাষার লিঙ্গীয় বৈষম্য কেবল ভাষাগত চর্চাটিই নয় আমাদের ব্যবহারিক জীবন যাপন ও মনঃস্তাত্ত্বিক মতাদর্শকেও প্রভাবিত করবে। একইসাথে ভাষাকে এত সাদামাটা বা সরলভাবে বিচার করা সম্ভব নয়।  নারী-পুরুষের ভাষার ব্যবহার আপেক্ষিক। গৃহস্থালীর ধরণ, ক্ষমতা কাঠামো বিচারে ও ব্যক্তির নিজ নিজ আচার ও মতাদর্শিক নির্মাণের প্রেক্ষাপট বিচারে নারী ও পুরুষের ভাষার ব্যবহার ও চর্চা নির্ভর করে তবে এই চর্চা ও ভাষাগত ব্যবহার আবশ্যিকভাবেই রাজনৈতিক। ভাষাগত গঠন, ব্যাকরণ, শব্দ নির্মাণের প্রতিস্তরেই লিঙ্গীয় রাজনীতি লক্ষ্যণীয়। ফলে এটিকে উৎসমূল হতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ ভাষার চর্চাগত পরিসর ও অর্থগত ব্যবহার সকলের জন্য সমান নয়। তাই ভাষায়  লিঙ্গীয় অসমতা পাঠে ভিন্ন ভিন্ন এই সকল দৃষ্টিভঙ্গির একটি সমন্বিত পাঠ জরুরি বলে আমি মনে করি।

 

 

 

Snigdha Rezwana is an assistant professor at the Department of Anthropology, Jahangirnagar University. Currently, she is working as a teaching assistant at the University of Canterbury, New Zealand. Recently she submitted her PhD at Auckland University of Technology and waiting to be a doctorate. Her PhD is on the Hijra gender and sexuality in Bangladesh.

 

More Posts From this Author:

    None Found

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top