মানস চৌধুরী সম্পাদিত সুলতানা ইউসুফালীর “আমার শরীর, আমার ব্যাপার”

0

বাংলা সম্পাদকের টীকা: ২০০০ সালে সুলতানা ইউসুফালীর এই রচনাটিকে আমাদের নারীবাদী সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। বইটির সম্পাদক দুজনেরই শিক্ষক রেহনুমা আহমেদ নারীবাদী চোখের স্থানিকতা, বৈশ্বিকতা আর নানাবিধ মাত্রা বিষয়ে সজাগ থাকতে আমাদের শিখিয়েছিলেন। সায়দিয়া গুলরুখের সাথে যুগ্ম-সম্পাদিত ‘কর্তার সংসার’ বইটি যেরকম আলাপ আলোচনায় থাকা দাবি করে তা না-থাকার কারণ এই বিশ বছরে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা করিনি। সেটা আজকের প্রসঙ্গও নয়। বরং বলতে চাইছিলাম, বিকাশমান নারীবাদী আলাপ-আলোচনার মধ্যে ২০০০ সালে রচনাটিকে বিবেচনা করা সহজ কাজ ছিল না। বইটি প্রকাশেরও ঢের আগেই আমরা এটিকে বিবেচনা করে ফেলেছিলাম, সুলতানার রচনাটি প্রকাশ পাবার পরপরই। বাস্তবে এই এত বছর বাদেও ওর অবস্থানটাতে সংমিশ্রণ ঘটানো কিছুমাত্র সহজ হয়নি। ওঁর পোশাক বিষয়ক ঘোষণাকে আমরা কীভাবে দেখি তার প্রশ্ন নয় এটা; বরং বৃহত্তর ‘মিত্র’রা কীভাবে দেখেন তার প্রশ্ন। এই যে কুড়ি-বাইশ বছরেও প্রসঙ্গটা একইরকম উৎকণ্ঠার রয়ে গেছে সেটা নিয়ে বোঝাপড়া করা অত্যন্ত জরুরি। আর এই সময়ের পরিক্রমাটি যে চলতি প্রগতির ধারণা দিয়ে বিচার্য নয় সেটাও জোর দিয়ে আমার পক্ষে বলবার আছে।

‘সেক্যুলার’ আমাদের চারপাশের মানুষজনের স্পষ্ট কতকগুলো আদর্শমান বা স্ট্যান্ডার্ড আছে। সেটা চিন্তাচেতনায় যেমন আছে, জীবনযাপনের প্রতীক-স্মারকের বেলাতেও আছে। চিন্তাচেতনার কথা বললাম বটে; কিন্তু আমি বহুকাল এটা নিয়ে গাঢ়ভাবে ভেবে আসছি যে চিন্তাচেতনার চর্চা আর ঘোষণার মধ্যকার সম্পর্ক বোঝা অতটা সহজ নয়। আপাতত ঘোষণার কথাই বলছি। সেজন্যই জীবনযাপনের প্রতীক-স্মারক আরও অর্থ বহন করে। বাণীর ঘোষণা আর পোশাক বা বাসার ড্রইংরুমের লক্ষণা এগুলো পরিশেষে সবই প্রদর্শন – মেনিফেস্টেশন বা এক্সিবিশন। সেসব মানদণ্ডের আশপাশে কাটা পড়ে গেলে সেগুলো সাব্যস্ত হয় ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ হিসাবে বা অন্তত প্রতিপক্ষীয় হিসাবে। এই তীক্ষ্ণ বৈপরীত্বের বোধ দিয়ে চারপাশে তাকানো বিপজ্জনক।

যদি আপনার জন্য পোশাক লক্ষণা বা চিহ্ণ হয়ে থাকে, তাহলে পোশাকধারীর জন্যও তা হবার কথা। হতেই হবে। আপনারও তাঁকে চিহ্ন বহন করতে দিতে বাধ না সাধতে পারতে হবে। চিহ্ন বা প্রতীক নিছক ‘প্রগতি’র সরল বোঝাবুঝি দিয়ে সারলে চলবে না; প্রগতিবিষয়ক ইউরোকেন্দ্রিকতাকে আপাতত তর্কের বাইরে রেখেও যদি বলি। কখনো তা (প্রতীক) ঘোষণাপত্র, কখনো তা আর্তনাদ, কখনো তা আত্মের প্রদর্শনপত্র, কখনো তা ইতিহাসের স্মৃতি-লক্ষণা – আপনাকে কিছু স্মরণ করিয়ে দিতে চায় সেসব।

১৬ বছরের সুলতানাও তাই করেছিলেন। তিনি যখন এই রচনা লেখেন তার কিছুকাল আগে ফ্রান্সে বৈষম্যমূলকভাবে মুসলিমদের পোশাক নিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল ‘লিবেরেল’ ফ্রান্স। সুলতানা যে দেশে বসবাস করছিলেন, কানাডা, সেখানকার মন্ট্রিলেও সেরকম ঘটনা ঘটেছিল। পাশ্চাত্যে প্রবাসী এশীয়-আফ্রিকীয় মুসলিম একজন কিশোরী হিসাবে তাঁর স্থানিকতাকে বুঝতে পারা জরুরি। প্রতীকের অর্থ তখন রাজনৈতিক হয়ে উঠবে। এই কথা আমি কোনো ‘সাফাই’ হিসেবে বলছি না; কারণ আমার নিজের কোনো পোশাক দেখতেই কিছুমাত্র চেতনা বিঘ্নিত হয় না। যাঁদের হয় তাঁদের ভাবনাপদ্ধতিতে বিনীত সুপারিশ হিসাবে বলছি।

এদফা সুলতানাকে খুঁজলাম, সাইবার জগতের প্রাযুক্তিক সুবিধা নিয়ে। তাঁকে পাওয়া গেল না। তিনি নিশ্চয়ই পেশাজীবী কেউ, নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সংগঠকের কাজ করছেন, সেই সংগঠন আমার আগ্রহের হোক বা না হোক। কিন্তু বুঝতে পারলাম যে কিশোরী সুলতানা যে রচনাটি লিখেছিলেন তার আছর অনেক কিছুর উপর পড়েছিল। স্বীয় পোশাক নিয়ে শরম পাবার জন্য চতুষ্পার্শ্ব যে সুপারিশ করে চলেছিল সেটাকে তিনি ‘নিজ পরিচয়’-এর স্মারক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। সত্তা বা পরিচয়ের রাজনীতির বিশ্বব্যাপী ঘোরালো-প্যাঁচালো মানচিত্রে এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেই তাৎপর্যটা প্রত্যেকে এযাবৎ বুদ্ধিগ্রাহ্য রাজনৈতিক মেরুকরণ দিয়ে যে হৃদয়ঙ্গম করবেন তা নাও হতে পারে।

মানস চৌধুরী,শিক্ষক নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এবং বিশ্লেষক, গল্পকার, সম্পাদক।

 

আমার শরীর, আমার ব্যাপার | সুলতানা ইউসুফালী

অনুবাদ: সৈয়দা ফারহানা ও সালমা পারভীন

 

একজন ‘বিদ্রোহী’ সম্পর্কে সাধারণত যা ভাবা হয়, আমি হয়তো তার মধ্যে পড়ি না। আমার গায়ে কোনও দৃশ্যমান উল্কি কাটা নেই বা একখানা ছেঁদাও নেই – নাকে বা কানে। নেই আমার একখানা চামড়ার জ্যাকেট। আসলে অধিকাংশ লোকজন যখন আমার দিকে তাকায়, তাদের মাথায় প্রথমেই যা খেলে যায় তা হলো আমি একজন ‘নির্যাতিতা নারী’। অতি সাহসীরা বুকের পাটা সহ আমার পোশাক-আশাক নিয়ে প্রশ্ন করে। সাধারণত তাদের প্রশ্ন হয়, ‘তোমার বাবা-মা কি তোমাকে এসব পরায়’? কিংবা ‘আচ্ছা, সত্যি কি তোমার কাছে এটা অন্যায় মনে হয় না’?

কিছুদিন আগে, আমার মতো পোশাক পরার জন্য মনট্রিলের একদল মেয়েকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। অবাক হয়ে যাই ভেবে যে, এক টুকরা কাপড় এমন বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে! ভয়খানা এমন যেন আমি পোশাকের নিচে একখানা উজি (এক ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র) লুকিয়ে রেখেছি। ওসব মুসলমান মৌলবাদীদের সম্পর্কে কিছুই বলা যায় না!

অবশ্যই, প্রসঙ্গটা এক টুকরা কাপড়ের চেয়ে বাড়তি কিছুর এখানে। আমি একজন মুসলমান নারী যে, পৃথিবীর অন্য লক্ষ মুসলমান নারীর মতো, ‘হিজাব’ করতে পছন্দ করি। এটা করার নানান পদ্ধতি আছে। মোদ্দা কথা, আমরা যা করি তা হলো হাত ও মুখ ছাড়া গোটা শরীর ঢেকে রাখি।

চলতি ছায়াছবি দেখার অভ্যাস যদি তোমার থাকে, তাহলে হয়ত তুমি হারেমের নারী বা নর্তকীর কথা ভাববে, যাদের আটকে রাখা হয়েছে শুধুমাত্র পুরুষ মনিবের মনোরঞ্জনের জন্য। সত্যিকার ইসলামী বিশ্বাসে এর চেয়ে অসত্য আর কিছু নেই। আর ‘হিজাবের’ ধারণাও, লোকজন যা ভাবে তার বিপরীতে, মূলত নারীর ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

যখনই আমি নিজেকে ঢেকে ফেলি, তখন অন্যের পক্ষে চেহারা দেখে আমাকে বিচার করার পথ সত্যিকার অর্থে অসম্ভব হয়ে পড়ে। আকর্ষণী ক্ষমতা বা তার কমতি দিয়ে আমার মান বিচার করা সম্ভব হয় না। আজকের সমাজের জীবনযাত্রার প্রেক্ষিতে; আমরা অবিরাম একে অন্যের জামা, গয়না, চুলছাঁটা, প্রসাধন দিয়ে মাপতে থাকি। এমন একটা দুনিয়ায় কী ধরনের গভীরতা থাকতে পারে?

হ্যাঁ, আমার একটা শরীর আছে, এই দুনিয়ার বুকে একটা দৃশ্যমান প্রকাশ। কিন্তু এটা একই সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক মন আর দৃঢ় চেতনার আধার। এটা টীপ্পনি কেটে উপেক্ষার কোনো বিষয় নয় অথবা বীয়ার থেকে গাড়ি পর্যন্ত সব কিছু বিকানোর জন্যে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার্য্ নয়। কারণ চাকচিক্যময় জগতে যেখানে আমরা বসবাস করি, তাতে ব্যক্তির বাইরের দিকটা এতই গুরুত্ব পায় যে তার মুল্যবোধের প্রায় কিছুই বিবেচ্য হয় না।

আজকের সমাজে নারীর স্বাধীনতা একটি অতিকথন। এটা কোন ধরনের স্বাধীনতা যেখানে একজন নারী শরীরী সত্তার প্রত্যেকটি দিকে নিরীক্ষিত না হয়ে রাস্তায় হাঁটতে পারে না! যখন আমি হিজাব পরি তখন মনে হয় যেন আমি এসব থেকে নিস্তার পাই। আমি আরও আশ্বস্ত হই এই ভেবে যে, কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না এবং আমার স্কার্টের ঝুল দিয়ে আমার চরিত্র সম্পর্কে অনুমানের চেষ্টা করছে না। যারা আমাকে শোষণ করবে তাদের ও আমার মাঝে ‘হিজাব’ একটা প্রাচীর। প্রথমত এবং সর্বতোভাবে আমি একজন মানুষ, যে কোনও পুরুষের সমান এবং আমার যৌনতার কারণে অসহায় নই।

আমাদের সময়ের দুঃখজনক সত্য হলো নারীর ভাবমূর্তি ও সৌন্দর্য মিথ নিয়ে প্রশ্ন। জনপ্রিয় টিন-এজ পত্রিকা পড়লে তুমি সাথে সাথেই দেখবে কী ধরনের বডি ইমেজ চলতি বা সেকেলে। এবং যদি তোমার শারীরিক গড়ন বেঠিক হয়, বেশ, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি তা পরিবর্তন করতে চাইছো, তাই না? আসলে এমন তো কোনও উপায় নেই যে, তুমি নাদুস-নুদুসও হবে আবার সুন্দরীও থাকবে।

যে কোনও বিজ্ঞাপনের দিকে তাকাও। একজন নারীকেই কি পণ্য বিক্রিতে ব্যবহার করা হচ্ছে না? তার বয়স কত? সে কতটা আকর্ষণীয়া? সে কি পরেছে? প্রায় ক্ষেত্রেই সে হবে ২২/২৩-এর কম বয়সী, লম্বা, ছিপছিপে, গড়পড়তার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়া, স্বল্প-বসনা একজন নারী। কেন আমরা এভাবে নিজেকে অন্যের ব্যবহারের জন্য সুবিধাজনক করে তুলি? ৯০ এর দশকের নারী বিশ্বাস করুক বা না-ই করুক, তাকে জোর করেই একটা ছাঁচে ফেলে দেয়া হয়েছে। সে নিজেকে বিকোতে বাধ্য হচ্ছে, নিজের সাথে করা আপোষের মাধ্যমে। এজন্যই তো আমরা দেখি স্থূলতার কারণে ১৩ বছরের কিশোরী গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করে আর মুটিয়ে যাওয়া কিশোরী গলায় দড়ি দেয়।

আমি নিপীড়িত বোধ করছি কিনা লোকজন জানতে চাইলে, আমি সততার সাথেই না বলতে পারি। আমি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার এটা ভাবতে ভাল লাগে যে, অন্যরা আমাকে কীভাবে দেখবে তা আমিই নিয়ন্ত্রণ করছি। এই ব্যাপারটা আমরা কাছে আনন্দের যে, আমি আমাকে দেখার সুযোগ কাউকে দিই না এবং যেসব ফ্যাশন ইন্ড্রাস্ট্রি ও প্রতিষ্ঠান নারীদের ঠকাচ্ছে আর পেন্ডুলামের মতো ঝোলাচ্ছে তাদের বন্ধন থেকে আমি নিজেকে মুক্ত রেখেছি। আমার শরীর, আমার নিজস্ব ব্যাপার। কেউই বলতে পারবে না আমার চেহারা কেমন হওয়া উচিত অথবা আমি সুন্দরী নাকি সুন্দরী নই। আমি জানি আমি এর চেয়ে বড় কিছু। এমনকি আমি অনায়াসেই না বলতে পারি যখন মানুষজন আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি যৌন অবদমিত কিনা। আমি আমার যৌনতার কতৃত্ব নিয়ে নিয়েছি।

আমি আনন্দিত যে আমাকে ওজন বাড়ানো/কমানো নিয়ে অথবা আমার গায়ের রঙের সাথে কী রঙের লিপস্টিক যায় তা নিযে ভুগতে হয় না। আমি নির্ধারণ করেছি, কী আমার কাছে গুরুত্বের যা আবার ওসবের মধ্যে পড়ে না। তাই এরপর দেখা হলে, আমার দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাবে না। আমা উপর চাপ প্রয়োগ করা হয়নি বা আমি আরব মরুভুমির অসভ্য (?) পুরুষ-পূজারী বন্দি নারী নই। ইসলাম আমাকে মুক্তি দিয়েছে।

 

মূল লেখা: Sultana Yusufali, ‘My Body Is My Own Business’. Star Weekend Magazine. Dhaka, January 29, 1999। বাংলায় প্রকাশ: কর্তার সংসার: নারীবাদী রচনার সংকলন, সায়দিয়া গুলরুখ ও মানস চৌধুরী [সম্পাঃ], রূপান্তর প্রকাশনা, ঢাকা, ২০০০।

 

More Posts From this Author:

Share.

Leave A Reply

Translate »