মৈত্রীভাবনা ছুঁড়ে, রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার দিকে

Share this:

 

একা ম্যাজিশিয়ান

তামাম দুনিয়া হাতে ঘুরপাক
করে পিংপং একা ম্যাজিশিয়ান
কৈকুড়ির শেষ বেলার লোকে
নিখিল পথের পাশে
সরিষা বাগান, সবুজ পালং
অপত্য পাগলামী, আমাদের
নিজস্ব কথার প্রণালী
ক্ষান্তিহীন ছুটে যায় সে হেঁটে হেঁটে
গার্হস্থ্য রং-সব অনুগত পিছে পিছে
শত পিছুটান যেন
তাঁবু বাঁধা রশি টানটান
এত বাতাশ
তাতে জলাধার করে আহ্বান
উন্মাতাল ঢেউয়ের বুকে
দ্বিধায় ঝরে পড়ে পাতা
নাচে মাতাল, নাচে প্রতিবেশ
সাথে ম্যাজিশিয়ান।

হাটবার

বিকেলের মগ্ন নির্জনতা পেরিয়ে
অবিচ্ছিন্ন শেকড়তম উচ্ছ্বাসে, মোহে—
প্রতিফলিত হই চিত্রানদীর তীরে।
সেইখানে মস্তিষ্কের মতো বিক্ষিপ্ত
কলহ-আয়োজন পরিণত হয় তুমুল তরলে।
বিগত সমুদ্র যেমন সাক্ষ্য দেয় অন্তঃসার সমারোহ—
চিন্তাতোড়ন কৌশলে
চলে ঘুমহীন পথে রিকশা,
কেবল জেগে থাকে খনিজ
ব্রাত্য প্রক্রিয়ায়।
উন্মুক্ত— শোভমান, মহাবিস্তৃত
মানুষের শিল্পকলায়
যাত্রাপুরীর প্রাচীর করে সৌধনির্মাণ!
সুসজ্জিত পশুপাখি, খাবারের সমারোহ
বিরাট বিপণী এই— টাকার মণ্ডপ।
ঘুরে ঘুরে দেখা হলে, ধীরে, মহাদৈত্যরা
চলে যায় তীক্ষ্ন তীর ঘেঁষে। তথাপি জেগে থাকে
শুল্ক আদায়ের চোখ, পরখ করে দলবদ্ধ কণা।
নানারকম ধারনার পাহাড়ে
না, প্রকৃত টিলায় দাঁড়িয়ে আমরা
দেখি মানুষের বিবরণ। মহাপ্লাবনের
যাত্রীসকল, তুমুল ধুলায়, বিষণ্ন
রঙের ভেতর ম্লান হয়ে যায়।
হাতে ও মাথায় খাদ্যসম্ভার, আর কিছু গার্হস্থ্য
প্রেমভালোবাসা; যেন কয়েকশত বৎসরের এ যাত্রা।
ভৌগোলিক সৌন্দর্য কুয়াশায় বিচিত্ররূপ নিলে
প্রাচীরচিত্র থেকে মাত্রাযুক্ত যাত্রাপুর
মগ্ন হতে থাকে আত্মরতিতে, ক্রমে ক্রমে শব্দহীন!

ফাল্গুনের রোদে

সকালে মিষ্টি রোদের দিন—
কুম্ভ-সূর্য জাগে আদিবাভঙ্গিতে
বাড়ি ফিরে—নিস্তরঙ্গ তারা
ইশারাভাষায় ডাকে মাতৃভাষাবনে।
আচ্ছাদন পেরিয়ে যেতে চাই
দ্রুত!
চোখ বুজে শুনি— ডাকছে আকাশ
ছোট হচ্ছে আলো।
ফাল্গুনের বিকেলবেলায়
গতকালের বাতাশ— আজ খুব এলোমেলো।
মানতে চাই না তবু, কৈবল্য আঁকড়ে
ধরে হাত! স্বপ্নে চিৎকার করে উঠি
দেখেছি অবাক-পরিখা। এইমাত্র ডাকে
সাড়া দিলো যে— বলি, ব্যাগ গুছিয়ে দাও
দেরি হয়ে যাচ্ছে!

স্ববৈকুণ্ঠ

বদলে যাচ্ছো। জলবায়ু ঠেলে রোজ
অগ্রসর হচ্ছি তোমার দিকে।
সমস্ত দিনের ভ্রান্তি ভেঙে রাত্রির উষ্ণতা
ছিল জ্যোতিষ্মান, অতিসঙ্গত কাল্পনিক।
তবু অপরাধীদের সংকল্প আমার মধ্যে
ব্রাহ্মক্ষণে উচ্ছল চরিত্রের উদাসীনতা।
শিশু সওদাগর, আশাহীন মানুষ আর
তোমার মিষ্টিকণ্ঠ মোবাইলে লিখে রাখলাম।
জলধ্যানে জেগে ওঠা মনোরম ছবি
অন্তহীন প্রেমে স্বধর্মে প্রতিষ্ঠিত।
হালের কারুকার্য দেখে সতর্ক হয়েছি খুব
যৌক্তিক দেহে তবু বিষাদের শৌখিন অনুপ্রবেশ
যতই জীবন্ত হোক কাষ্ঠখণ্ড-আগ্নেয়গিরি
মৈত্রীভাবনা ছুঁড়ে, রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার দিকে
আমি তো যেতেই চাই, হৃদয় মানে না।

পতন

ফড়িংডানাতেও আছে না-দেখা সোনার শেকল!
তোমার সকলজুড়ে নির্জনতা,
না-জানা হাহাকার। কিংবদন্তি ফুলের মতো
আচমকা জেগে ওঠে আত্মহননের অভিপ্রায়।
এই মৃত গানের পাশে, উন্মাদ শরীর
নৃত্যরত; হারানো দিনের ভোজালি
পৃথিবীর গোলাকার ধারণার অধিক।
জেগে থাকা হলো অনেক আয়ুর ভাঁজে
দিনশেষে অকারণ প্রগাঢ় কম্পিত রাত।
বিদায়ী বৃক্ষদিনে ভুষোকালি আর খড়ের স্তূপ
অহেতুক ভোজনে কাটে এই মহাকাল।
পরিণত শবের পতন আস্তে নেমে যাক—
দিগ্বিজয়ী করুণতম সুর, আজ প্রাসঙ্গিক।

প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতা: কবিতার মায়াবী বাদ্যকর সুবীর সরকার

কথাসাহিত্যিক শওকত আলী উত্তরবঙ্গে গ্রামীণ এক কৃষককে মাটিতে কান পেতে বীজ-গজানোর ধ্বনি শুনতে দেখেছিলেন। আর কবি সুবীর সরকার, যিনি এক মায়াবী বাদ্যকর, বাংলার পথে-প্রান্তরে ঘুরে হেমন্তকালীন ভূমিতে কান পেতে শুনছেন,

মধ্যরাতের সঙ্গম শেষ হলে হেমন্তের মাঠে বেজে ওঠে সা রে গা মা। (“বিবাহ”)

পিকাসো বলেছিলেন, সব মহৎ শিল্পকলাই সংগীত হয়ে উঠতে চায়। অর্থাৎ, তিনি শিল্পকলার শাখাগুলোর মধ্যে সংগীতকে শীর্ষস্থান দিয়েছিলেন। এরকম উপলব্ধিও পাই যে, শিল্পের উত্তরণ সংগীতে উপনীত হওয়ার মধ্য দিয়েই ঘটে। অর্থাৎ শিল্পযাত্রায় সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে কবিজীবনে সুরের প্রভাব আলাদা করে উল্লেখ বাহুল্য। কবি সুরের হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো পাখি। এই সুর উপলব্ধি করতে হয়; আবিষ্কার করতে হয় প্রকৃতি ও জীবনের ভেতর থেকে। এই সত্যই রচনা করেছেন কবি—

বাদ্য লিখি। বাজনা লিখি। ম্যাজিকের মধ্য থেকে
উঠে আসে শিস। নির্জন প্রান্তরে একা একা জ্বলে ওঠে উনুন। (“গান”)

আমাদের জীবনের প্রতিক্ষেত্রে সুরের প্রভাব সুনিবিড়, অবিশ্ছেদ্য। সুরের প্রভাবে আগুন জ্বলে, বৃষ্টি নামে, ব্যক্তির চিত্তশুদ্ধি ঘটে, অসুস্থ স্নায়ুর ওপর ক্রিয়া করে সুস্থতা আনে। খরার সময় বৃষ্টির গান তো আমাদের লোকায়ত জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অনুষঙ্গ। সামগানে সাতটি স্বরের যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তার অর্থ হলো সুরের সাহায্যে বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন।

সব চিহ্ন মুছে যায়। শ্মশান পাহারায় পুরোন ছাতা।
হাতঘরিহীন হাতে রোদ পড়লে
হাডুডু ভুলে যাওয়া মাঠে বিকেল নামে। (“ডুব”)

কবি তো বাদ্যকর, বাজিয়ে চলেছেন জীবন—অপার সৌন্দর্য! কিন্তু হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা না, সত্যদ্রষ্টা। এতটাই সত্য—দৃশ্যমান সত্যের উপরে যার অবস্থান, নিঃসন্দেহে গভীরেও। তিনি লিখেন যেন আত্মপরিচয় কিংবা সেই মানুষ যাকে তিনি কল্পনায় লালন করেন আত্মপ্রতিভূরূপে—

আসলে তো বাদ্যকর।
লম্বা ও চওড়া মানুষ।
প্রেরিত বাক্য প্রত্যাখ্যান করে দুপুর

আমাদের যাপনে অন্তত কিছু গান জমুক। (“বাদ্যকরের জার্নাল”)

এই যাপনজুড়ে অন্য কিছুই নয়, কিচ্ছু না, শুধু গান! কবি উপলব্ধি করেন আমাদের এলিয়েনেশন, অনেকের সাথে থেকেও একা হয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সেই নিয়ন্ত্রকের চেহারা। ফলে তিনি লিখেন, ‘কী ভীষণ ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে আমাদের জীবন!’

সুবীর সরকার তাই ছুটে চলেন বাংলার পথে-প্রান্তরে; ভারতের, বাঙলাদেশের। তার এ-পথ চলাতেই আনন্দ! চলতে চলতে জড়িয়ে পড়েন বাঙলার ধুলোবালিপথে, নানা অনুষঙ্গে। কোনোকিছুই তার নজর এড়ায় না। একজন ব্যক্তি কত সামান্য বস্তুর সাথে জড়িয়ে যায় জীবনপ্রবাহে, যা কবির হাতে অসামান্য হয়ে ওঠে, মর্যাদা পায় লাইটার, হাতকুঠার, এরকম আরো কত কী!

এই যে জীবন যা যুক্ত হয়ে যাচ্ছে হাতকুঠারের সঙ্গে
এই যে জীবন যা আসলে বহন করে লাইটার
চাপা হাসিকে সূত্র ধরে একটা ফুলবাগান খুঁজে নিতে থাকি। (“সূত্র”)

সুবীর সরকার নয়ের দশকের গুরুত্বপূর্ণ নাম। কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্রভাবে। জন্ম জানুয়ারি  ১৯৭০, কোচবিহার শহরে। ইতিহাসে স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা। ১৯৮৭ থেকে লেখালিখি শুরু। কবিতার পাশাপাশি ভূমিলগ্ন জনমানুষের যাপন নিয়ে নিয়মিত গদ্যও লেখেন। রয়েছে কয়েকটি গদ্যের বইও।

জঙ্গল-জনপদ বারবার তাকে টানে অবিচ্ছেদ্য ভঙ্গিতে। প্রকৃতিতে মিশে যান কবি। লিখেন—
কিনে নিচ্ছি জল জঙ্গল জনপদ।
মানচিত্রের গায়ে হেলান দেয় ম্লান আলো
আমরা ফুরিয়ে যাই।
আর চারপাশে কথা ওড়ে। (“জীবন”)

কখনো এরকম অনুভূতিও ফুটে ওঠে তার লেখায়,
নদী দেখে ভয় পাই। এদিকে অন্ধ কুকুর স্নান সারছে।
আলো কমে আসলে জঙ্গল ক্রমে ভয়ার্ত হয়ে ওঠে। (“দুপুর”)

মানুষের অধিক অন্যান্য প্রাণী কতটা প্রকৃতিবর্তী তা ফুটে উঠেছে ‘দুপুর’ কবিতায়। ‘বাদ্যকরের জার্নাল’ বইয়ে অনেকগুলো পঙক্তি আমাকে বিসিম্ত করেছে। কয়েকটি উল্লেখ করছি :

১৷ গ্রাম ও গ্রামার ঘেরা নদী। (“গ্রামার”)

২৷ আমি লিখি, ডানা ভাঙার ইতিহাস। (“হাসপাতাল”)

৩৷ কান্না আসলে বিশ্রামাগার

খুব একা হয়ে যাওয়া মানুষেরা এটা জানেন। (“গল্প”)

সুবীর সরকার এক মায়াবী বাদ্যকর; মাটিবর্তী মানুষের গল্প ছড়িয়ে আছে যার কথায়, কবিতায়। ‘বাদ্যকরের জার্নাল’ এমনই এক কাব্য, যা পাঠককে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখতে সক্ষম।

  • More From This Author:

      None Found
  • Support Shuddhashar

    Support our independent work, help us to stay pay-wall free by becoming a patron today.

    Join Patreon

Subscribe to Shuddhashar FreeVoice to receive updates

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!