যেন আলো থেকে সরে নুয়ে ঝরে পড়তে চায় সূর্যমুখী

Share this:

 

গল্পের আদলে


কোনো কোনো স্বপ্ন থেকে আমরা উঠে দাঁড়াতে পারি না। পাশের রুমের আলো এসে পড়ছে জানলার হলুদ পর্দায়, তার প্রতিফলন তোমার মুখে। এমন হলদে আলোছায়ায় তুমি হেঁটে বেড়াও লাল মার্বেল মেঝেতে। তোমার মুখ বদলে যায় পুরনো প্রেমের আদলে। দেয়ালের গায়ে অযত্নে বেড়ে উঠা ফুলের ঝাড়ের কাছে আঠারো বছর ফিরে আসতে চায়৷ তুমি চাও না! শুনতে শুনতে তোমার মুখস্থ হয়ে যায় প্রেমিকদের বসে থাকার ভঙ্গি!


কারো না-থাকার সাথে থাকার অভ্যাস হয়ে যায়। তুমি চাও সে যেন ফিরে যায়, যদি বা সে এসে থাকে কখনো তোমার কাছে! তুমি চাও ভুলে যেতে তার স্পর্শের আবেশ! ভুলে থাকতে চাও অনুতাপ, সংশয়, সুন্দর সংকট- অদৃশ্য মিনতি—তার তো আর কেউ নাই ভালবাসার! তোমারও কি আছে? আর কেউ? ভালোবাসার?


আমরা গল্প বানাতে থাকি—খিলখিল হাসি! যেন আলো থেকে সরে নুয়ে ঝরে পড়তে চায় সূর্যমুখী।

 

জলিলগঞ্জ

অতীতকে অতিক্রম করে
চলে আসে এক জাহাজির হাত ধরে
কালো জাহাজ বোঝাই স্মৃতি
ডালা খুলে বসে
যেন সে অন্য এক পৃথিবীর গল্প

ঘর আছে তাতে,
আছে লাল মেঝেতে
সাদা আল্পনার পাশে
জায়নামাজ পড়ে থাকে

পেছনের উঠোনে
ছাতিমের ঘ্রাণে
মিশে-থাকা
কেমন আচমকা
নির্জনতা পেরিয়ে
সে দেখায়
নদীর ধারে
জমে থাকে কাঠের সার
জাহাজ ভাঙার আওয়াজ
চাঁদের আলোয় মিশে যায়
অন্ধকার ঢেউ

দূরে
শান্ত
খুব শান্ত
দাঁড়িয়ে থাকে
কর্ণফূলী  ব্রিজ
এবং
অনন্তকাল ধরে
গ্রাস করে রাখা
শৈশবের ফাঁদ

 

বিচ্ছিন্নতার গান

মানুষগুলো সব যেন অবিকল
মায়েদের কোলে ঘুমিয়ে পড়া তারস্বর
যেন এই শহরের সবকটা
নামহীন রাস্তার পাশে
নাক-চোখ-মুখ হাতের আছে
কোথাও একটা রাত
কোথাও একটা ভোর
কোথাও আছে কারো জন্য
হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরা
আড়ষ্ট দুপুর—
বাজিয়ে চলা খেয়ালী সন্তুর
সাত শ বছরের উন্মাদনা
মানুষের ক্লান্ত মুখ
বিযুক্ত হয়ে পড়ার ইতিহাস

 

বাবা

বাবা
গলা হাঁকাতে না পেরে
আজীবন ঝুঁকে চলা মুখ
বাবা
বাজারের থলে হাতে
বিকেলে ফেরা
মাছের দাঁতে আটকানো রশি ছিড়
যেন ছিঁড়ে ফেলতে চান ঘরে
দানা বেঁধে থাকা অভিযোগ
গরিবি হালত
কাতর চিৎকার
বাবা
উপড়ে ফেলতে পারেন না
সমস্ত দুঃখের কারণ
হয়ে উঠা ক্ষতবীজ

 

জোলিইন

তোমার সাথে আমার
দেখা হতে পারত
সংসার ভাঙার ছুতোয়
অবিশ্বাসে
তার সাথে করা ঠাট্টা তামাশার
পুনরাবৃত্তিতে স্বপ্নে
ভুল করে ডেকে ফেলা
সম্বোধনে

নইলে তোমার সাজানো বাগানে
ঝিঙে ফুলের হলুদ মুখ
বেচারা বেচারা মুখ করে
আমার  দিকে
তাকিয়ে  থাকা অসহায়ে

দেখা হয়নি
হতে পারত নিশ্চয়ই
প্রতারণায়

 

প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতা: ওশান ভুয়ঙ, স্মৃতি-সংকটের কবি

“তোমার পছন্দের স্মৃতিটাই তুমি মনে রাখতে চাও!” ওশান ভুয়ঙকে তার মা বলেছিলেন। আমরা তো আসলেই আমাদের সিলেক্টিভ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকি। নিজেদের পছন্দমতো মানুষ, কিংবা স্মৃতি মনে রাখি। বাকিগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিই।  ভিয়েতনামের সায়গনে জন্ম নেয়া ওশান যখন মাত্র ২ বছর তখন তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। তার আগে ১ বছর ফিলিপাইনের শরণার্থী শিবিরে থাকতে হয় শিশু ওশানকে নিয়ে তার পরিবারের। ছোট ওশান যার কিনা ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রত্যক্ষ স্মৃতি না থাকার পরেও নানী কিংবা মায়ের মুখে শুনে শুনে তিনি বাস করেন সেই স্মৃতির ভিতরে। সেই স্মৃতি ফুটে ওঠে কবিতায় যেখানে যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটা দেশে সাদা আমেরিকান সৈন্যদের দেখা যায়।

ওশান তার কবিতায় লিখেন,

“The song moving through the city like a widow.
A white …    A white …    I’m dreaming of a curtain of snow
falling from her shoulders.”

অথচ এখানে সাদা রঙ তা সৈন্য হোক কিংবা তুষার কখনো  শান্তির বার্তা বয়ে আনে না। বরং যুদ্ধ, মৃত্যু, হেনস্তা, যৌন সহিংসতার স্মৃতিকে নাড়া দিয়ে যায়।  তার কবিতায় তাই তিনি লিখেন,

“Inside my head the war is everywhere”

ওশানের কবিতায় ভিয়েতনাম যুদ্ধ মিশে আছে ভিয়েতনামের মানুষের সাংস্কৃতিক চরিত্র এবং অস্তিত্বের মধ্যে। যার প্রতিফলন ঘটে আরেকটি কবিতায়,

” American soldier fucked a Vietnamese farmgirl. Thus my mother exists. Thus I exist,”

তার প্রথম কবিতার বই Night Sky With Exit Sky প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। এই কবিতার সংকলন কিংবা তার সাম্প্রতিক প্রকাশনা Time is a Mother তে তার সমকামিতা থেকে শুরু করে যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভিয়েতনামের স্মৃতি, পরিবারের সাথে বিশেষত মায়ের সাথে সম্পর্কের উঠানামা উঠে এসেছে কবিতায়।কবি ওশান ভুয়ঙকে আমার প্রথম জানা হয়েছিল তার প্রথম উপন্যাস On Earth We’re Briefly Gorgeous দিয়ে। আমার সুপারভাইজার বইটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই উপন্যাসকে ইংরেজিতে বলা হয় এপিস্টোলারি ঘরানার উপন্যাস, যাকে বাংলায় পত্রোপন্যাস বলা হয়। এই ধরণের উপন্যাস চিঠির ভাষায় লেখা হয়ে থাকে।উপন্যাসটি এক ভিয়েতনামী বংশোদ্ভূত আমেরিকায় অভিবাসন নেয়া সমকামী এক এশিয়ান ছেলের গল্প।যার নাম লিটল ডগ বা ছোট কুকুর। ছোট ছোট নৌকায় করে ভিয়েতনামের  যেসব পরিবার সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় শরণার্থী  হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল তেমন এক পরিবারের ছেলের গল্প। যার নানী ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়  পতিতাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েন এবং যুদ্ধের পর এক সাদা আমেরিকান সৈন্যের সাথে বিয়ের ফলস্বরূপ রোজ মানে লিটল ডগের মায়ের জন্ম হয়। চিঠিটা শুরু হয় রোজকে “প্রিয় মা” সম্বোধনের মাধ্যমে। সেখানে সে বর্ণনা করে ভিয়েতনামের দুই নারীর প্রতিদিনকার সংগ্রাম, আমেরিকান হয়ে উঠতে চাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, ঠিকঠাক ইংরেজি বলতে পারার বাসনা, মায়ের কাছে ছেলের পরিচয় সংকট এবং গ্রহণযোগ্যতা পাবার যে দোটানায় সে কাটায় এমন ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে এই উপন্যাস। লিটল ডগের মা-নানী ছোট একটা নেইল সেলুন চালিয়ে উপার্জন করত। তার পরিবার ছিল যুদ্ধ পরবর্তী ভিয়েতনাম থেকে নৌকায় করে পালিয়ে আসা সেইসব রিফিউজিদের মধ্যে অন্যতম,  যারা ইংরেজি জানত না। তাদের নিত্যকার সংগ্রাম, ছেলেকে ভাল স্কুলে পড়ান, রোজের স্বামীর হাতে রোজের নির্যাতিত হবার গল্প সবই সে লিখে যায় তার নিরক্ষর মাকে। তার মা তাকে কিভাবে সবসময় ছোট করত ছোটবেলায় সে বলে। কিন্তু লিটল ডগ এও জানে তার মায়ের যুদ্ধপরবর্তি ট্রমার কথা। একবার সে মাকে চমকে দিয়ে “বুম” শব্দ করে তাতে তার মা কিভাবে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ে যুদ্ধবোমার স্মৃতি ভেসে উঠায় তার মনে পড়ে যায়। সে লিখে যায় তার বড় হবার মধ্যে কিভাবে সে নিজেকে অবাঞ্চিত, তুচ্ছ মনে করত প্রতিনিয়ত। তার ভালো লাগত পুরুষদের। তাদের প্রতি তার আকর্ষণ সে লুকিয়ে রাখত। এখানে প্রকাশিত হয় তার প্রথম প্রেমিকের কথা। সেই প্রেমিক কিভাবে লিটল ডগকে ছেড়ে গিয়েছিল। লিটল ডগের মায়ের কাছে স্বীকারোক্তি করা তার সমকামিতা নিয়ে। এরপর সে লেখক হয়ে উঠে। মা তাকে জিজ্ঞেস করে লেখক হবার অনুভূতিটা কেমন আসলে! লিটল ডগ যেন সেই প্রভুভক্ত কুকুর যার ভক্তি মূলত তার মায়ের প্রতি।মায়ের সাথে সম্পর্কের দ্বিধাবিভক্তি সত্ত্বেও একটা পর্যায়ে সে জানায়, “তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলে গেছি মা!”।

এখন আসি কেন ওশান ভুয়ঙ আমার প্রিয় কবি হলেন এবং কিভাবে তা এই উপন্যাসের সাথে সম্পৃক্ত বলি। এই উপন্যাসকে ধরা হয় ওশানের সেমি বায়োগ্রাফি। ওশানের উপন্যাসের ভাষায় যে লিরিক্যাল ব্যাপার আছে তা একজন কবি ছাড়া যেন আর কারো পক্ষে লেখা সম্ভব না। এই উপন্যাস পড়েই আমার ওশানকে জানতে আরো ইচ্ছে করে, তার আরো লেখা পড়তে ইচ্ছে করে। গুগল করে তার যে সমস্ত কবিতার সন্ধান পাই-  পড়া শুরু করি। দেখতে পাই তার প্রথম উপন্যাসের শিরোনামে আরো কয়েক বছর আগে ওশান লিখেছিলেন একটি সিরিজ কবিতা। যেখানে তিনি মায়ের প্রসঙ্গ আনেন, প্রেমিকের সাথে ভালবাসার কথা বলেন, ঘরে ফেরার বাসনার কথা লিখেন, একাকিত্বের, একা হয়ে পড়ার কথা লিখেন। উপন্যাসের ভাষায় যে লিরিক্যাল ব্যাপার আছে তা একজন কবি ছাড়া যেন আর কারো পক্ষে লেখা সম্ভব না। এই কবিতায়  তিনি লিখেন,

“I’ll tell you how we’re wrong enough to be forgiven. How one night, after

backhanding
mother, then taking a chainsaw to the kitchen table, my father went to kneel
in the bathroom until we heard his muffled cries through the walls.
And so I learned that a man, in climax, was the closest thing
to surrender.”

একই কবিতায় তিনি লিখেন,

“I wanted to disappear — so I opened the door to a stranger’s car”

ওশানের কবিতায় যে একা নিস্পৃহ মানুষের দেখা মিলে তাকে আমরা পুঁথিগত ভাষায় বলে থাকি marginalised বা ‘প্রান্তিক’। প্রান্তিক মানে কি প্রান্তে থাকা? প্রান্ত মানে কি যেখানে সে নিজেকে কোণায় পড়ে থাকা কেউ একজন মনে করে? সে হয়ত  কাঁচুমাচু হয়ে থাকে একইসাথে তার এশিয়ান এবং সমকামী পরিচয়ের জন্য। এই পরিচয়ের প্রশ্ন বা সংকট আরও বেশি তীব্র হয় যখন সাদরে তাকে তাঁর কাছের মানুষজনের গ্রহণ করতে পারে না, তার বেদনা থেকে। যে বেদনার উৎপত্তি হয় তার যৌন পরিচয় নিয়ে। সমকামী হিসেবে তাকে মানতে না পারার প্রকাশ যেন তিনি দেখতে পান বসন্তের ফুল ঝরে থাকা থেকে শুরু করে সবকিছুর মধ্যে। “Someday I’ll Love Ocean Vuong” কবিতায় এর কিছুটা প্রকাশ দেখা যায়। আবার “PRAYER FOR THE NEWLY DAMNED” কবিতায় তিনি লিখছেন,

Father,
how quickly the blade becomes
You. But let me begin again: There’s a boy
kneeling in a house with every door kicked open
to summer. There’s a question corroding
his tongue. There’s a knife touching
Your name lodged inside the throat.
Dearest Father, what becomes of the boy
no longer a boy? Please—
what becomes of the shepherd
when the sheep are cannibals?

কখন কোন কবি প্রিয় হবেন, কেন হবেন কিংবা কোন কোন কবিতা প্রিয় হবার পরেও কবিকে কেন ভালো লাগে না তার কোন ব্যাখ্যা সম্ভবত নেই। কারণ আপেক্ষিক। সময়, বয়স এবং মন মেজাজ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে, যার কারণে জীবনানন্দ কিংবা নাসিমা সুলতানা সবসময় মন আচ্ছন্ন করে না একটা সময় এসে। অথবা যেসব প্রেমের কবিতা প্রেমে পড়ার অনুভূতি দিতো এক সময়, এখন পড়লে মনে হয়, ‘কি সব ছাইপাশ!’ এখন কবিতা ভালো লাগলে কবিদের সাক্ষাৎকার পড়া হয়। জানার ইচ্ছা জাগে তাদের জীবন দর্শন, তারা কিভাবে জীবনকে দেখেন কিংবা চারপাশের ভিন্ন ধারার বা মতের মানুষকে কিভাবে নিচ্ছেন। এইভাবে দেখা যায় আগের অনেক প্রিয় কবি তাদের জীবনে আচরণে, যাপনে  যথেষ্ঠ সহানুভূতিশীল না হবার কারণে প্রিয় তালিকা থেকে  বাদ পড়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকের ব্যাপারে দোনামনা থেকেই যায়! গত কয়েক বছরে কবি ওশান ভুয়ঙ আমার পছন্দের তালিকায় আছেন। তার চিন্তা ভাবনা, জীবন যাপনের যে স্বচ্ছতা তার প্রতিফলন তার লেখায় আছে। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি বংশপরম্পরায় বয়ে বেড়ানো কিংবা যে পরিচয় সংকট তার লেখায় আসে তা আমাদের সবার গল্প কোন না কোন ভাবে।

  • More From This Author:

      None Found
  • Support Shuddhashar

    Support our independent work, help us to stay pay-wall free by becoming a patron today.

    Join Patreon

Subscribe to Shuddhashar FreeVoice to receive updates

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!