যেভাবে নবী মুহাম্মদের চিত্রকল্পের ওপর ‘নিষেধাজ্ঞা’র আবির্ভাব ঘটল, মূল: ক্রিশ্চিয়ান গ্রুবার

ভুমিকা:ক্রিশ্চিয়ান গ্রুবার ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের অধ্যাপক; তাঁর গবেষণার জায়গা হচ্ছে ইসলামি বুক আর্টস, নবী মুহাম্মদের চিত্রকল্প, ইসলাম সম্পর্কিত পাঠ ও চিত্রকল্প। আধুনিক ইসলামি ভিজুয়্যাল সংস্কৃতি, ইরানের বিপ্লব পরবর্তী ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতি ইত্যাদি তার আগ্রহের জায়গা।এইসব নিয়ে তাঁর বহু গবেষণা প্রবন্ধ/বই প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর The Praiseworthy One: The Prophet Muhammad in Islamic Texts and Images গ্রন্থটি।

গ্রুবার  How the “Ban” on Images of Muhammad Came to Be শিরোনামের আর্টিকেলটি লিখেছিলেন ২০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি, প্রকাশিত হয়েছিল নিউজউইকে। অলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে লেখাটির অনুবাদ করেছেন শুদ্ধস্বরের অনুবাদ টিম।  

 

শার্লি হেব্দোর উপর হামলার পরপরই বহু নিবন্ধে/প্রবন্ধে এই অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল যে, ইসলামে নবীজীর (নবী মুহাম্মদ) ছবি আঁকা ‘নিষিদ্ধ’ কি না। কেউ কেউ কঠোরভাবে বলার চেষ্টা করলেন যে এই ক্ষেত্রে ইসলামি আইন কঠোরভাবে প্রযোজ্য, আবার অন্যরা (এর মধ্যে মুসলমান ও অ-মুসলমান সবাই আছেন) সতর্ক করে দিলেন যে বিষয়টা তেমন নয়।

এই তথাকথিত নিষেধাজ্ঞার উপর অধিকাংশ আলাপ-আলোচনা কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালিয়েছে, কিন্তু কোনটাই নিষ্পত্তিমূলক বা চূড়ান্ত ফায়সালা দিতে পারেনি। তাছাড়া এই পাঁচমিশালী আলাপের মধ্যে যেটা হারিয়ে গিয়েছে সেটা হচ্ছে ইসলামি আইনের মধ্যে পাওয়া প্রামাণিক অনুসন্ধান। প্রকৃতপক্ষে কেউ যদি কোনো ‘নিষেধাজ্ঞা’ বিষয়ে কথা বলতে চান, তাহলে ইসলামি ঐতিহ্যে নবীজীকে উপস্থাপনের আইনি বৈধতা বা অবৈধতা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে অবশ্যই তাকে ইসলামি আইনশাস্ত্রের বিচিত্র সূত্রগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলাপে নিয়ে আসতে হবে। এবং কেউ যদি সতর্কভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করেন তাহলে ফলাফলগুলো আরো অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠবে, এবং একই সাথে আমাদের পূর্বানুমানের চাইতে আরো বেশি জটিল হয়ে উঠবে।

ইসলামি আইন বিষয়ে বহু কিতাবাদি রয়েছে যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের আলাপ-আলোচনা-মতামত সঙ্কলিত হয়েছে। ছবি বা চিত্রকল্প তৈরির ব্যাপারে সবচেয়ে প্রাচীন ও সংশ্লেষণাত্মক সূত্র হচ্ছে ইবনে ক্বুদামা (মৃ. ১২২৩) রচিত মধ্যযুগীয় আইনীয় কিতাব। ইবনে ক্বুদামা হচ্ছেন মধ্য যুগের একজন শীর্ষস্থানীয় ধর্মতাত্ত্বিক। এই কিতাবে ইবনে ক্কুদামা এমন বহু সম্ভাব্য ‘ন্যাক্কারজনক’ কাজের বিষয়ে আলোচনা করেছেন যেগুলো বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে ঘটতে পারে, যেমন গান বাজনা করা, দাবার ন্যায় বিভিন্ন খেলা, মদ্যপান এবং ছবি বা চিত্রকল্প বা ইমেজের উপস্থিতি। চিত্রকল্পের লিগ্যালিটি বা আইনি বৈধতার ক্ষেত্রে তিনি মন্তব্য করেন যে, এই প্রশ্নটা জটিল কারণ এটা নির্ভর করে চিত্রকল্পে কি চিত্রিত হয়েছে এবং কোথায় সেগুলো অবস্থিত- এর উপর। (১ নং পাদটীকা দেখুন)

তিনি তাই এই সিদ্ধান্তে টানেন যে, খোদ ছবি বা চিত্রকল্প নিষিদ্ধ নয়, বরঞ্চ এর বৈধতা নির্ভর করে বিষয়বস্তু ও পরিপ্রেক্ষিতের উপর।

এক শতাব্দী পরে কট্টোর সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিক ইবনে তাইমিয়া (মৃ. ১৩২৮) আইনিসংক্রান্ত বিস্তর লেখালেখি করেন। বর্তমান জমানার অতিরক্ষণশীল অংশ অর্থাৎ ওয়াহাবি ও সালাফি ধর্মতাত্ত্বিক আন্দোলনের উপর ইবনে তাইমিয়ার প্রচুর প্রভাব রয়েছে। তার ফতোয়ার সঙ্কলনে ইবনে তাইমিয়া সতর্ক করে দেন যে, ছবি বা চিত্রকল্পকে আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার যাবে না, এগুলোকে অছিলা ধরা যাবে না বা এগুলোকে ব্যবহার করে তার কাছ থেকে কোনো অনুগ্রহ আদায় করা যাবে না। তিনি আরো মন্তব্য করেন যে, মুসলমানদের চর্চা অবশ্যই খ্রিস্টানদের চাইতে আলাদা হতে হবে। এখানে গির্জায় ছবি বা চিত্রকল্পের প্রবল উপস্থিতি বা ব্যবহার দিয়ে খ্রিস্টানদেরকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

ফলে এমনকি মধ্যযুগের সবচাইতে রক্ষণশীল ফতোয়ার সঙ্কলনেও চিত্রকল্প বা ছবির ব্যাপারে ‘নিষেধাজ্ঞা’র কোনো একটি স্পষ্ট কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।এখানে বরঞ্চ আসল কথা হচ্ছে, খ্রীস্টীয় ঐতিহ্যের মতো করে অছিলা বা অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় পীর-আউলিয়াদের (সেইন্ট) ‘ছবি/চিত্রকল্প’ ব্যবহার করা যাবে না।

আরো কয়েক শতাব্দী পরে ছবি বা চিত্রকল্পের ব্যাপারে আইনি মতামত পাওয়া যায় মুহাম্মদ আব্দুহ (মৃত ১৯০৫) রচিত লম্বা একটি ফতোয়াতে।মুহাম্মদ আব্দুহ আধুনিক মিসরের সংস্কারবাদী প্রধান মুফতি হিসেবে পরিচিত। Images and Representations: Their Benefits and The Opinions About Them শীর্ষক গ্রন্থে (২ নং পাদটীকা দেখুন) মুহাম্মদ আব্দুহ যুক্তি দেখান যে, ছবি ও চিত্রকলার হেফাজত ইসলামি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্ঞানের সংরক্ষনকে উপস্থাপন করে। পাশাপাশি তিনি জোর দেন যে, যদি ছবি বা চিত্রকল্পগুলো পূজা (idolatry) করতে ব্যবহৃত না হয় তাহলে মানুষের ছবি আঁকা এবং গাছপালার ছবি আঁকা নিষিদ্ধ নয়।

তিনি আরো একটু এগিয়ে গিয়ে বলেন যে, ‘কোনো উলামাই (বা আইন বিষয়ক পণ্ডিত) এটার বিরোধিতা করেন না। পূর্বোল্লিখিত ক্ষেত্রে চিত্রকল্পের সুবিধার বিরুদ্ধে কোনো বিরোধিতা নেই।’ তিনি দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলেন, ‘আপনি একজন মুফতিকে এটা কখনোই বোঝাতে পারবেন না যে, ছবি বা চিত্রকল্প সকল ক্ষেত্রেই পূজার বস্তু’! এভাবেই তিনি সিদ্ধান্ত টানেন যে, শরিয়া ‘জ্ঞানের অন্যতম বৃহৎ এই মাধ্যমকে [অর্থাৎ চিত্রকল্প] অবৈধ বলা থেকে অনেক দূরে থাকে, যদি এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটা বিশ্বাস বা অনুশীলনের ক্ষেত্রে ধর্মের জন্য হুমকি নয়। প্রকৃতপক্ষে, নিশ্চিত ফায়দা রয়েছে এমন কোনো কিছু থেকে নিজেদের বিরত রাখতে মুসলমানরা মোটেই আগ্রহী নয়।’

সংক্ষেপে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেও এই প্রধান মুফতি দ্বিধাহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, ছবি (বা চিত্রকল্প) ও চিত্রগুলো যেমন উপকারী তেমন শিক্ষামূলক।

 

মোস্তফা আক্কাদের সিনেমা ‘দ্যা মেসেজ’ এর পোস্টার

 

মুহাম্মদ আব্দুহের আলাপগুলো সম্ভবত তৎকালীন মিশরে উদীয়মান মুদ্রণযন্ত্রের কল্যাণে ছবি বা চিত্রকল্পের বিস্তার ও সংখ্যাবৃদ্ধির একটি প্রতিক্রিয়া ছিল।  উনিশ শতকের পূর্বে ছবি বা চিত্রকল্পগুলো জনপরিসরে বা প্রকাশ্যে সহজলভ্য ছিল না। কেননা এগুলো বিরল বিলাসবহুল পাণ্ডুলিপিতে খচিত ছিল, এবং ফলে এগুলো খুবই ক্ষুদ্র একটি অভিজাত গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে গণমাধ্যম উদ্ভবের সাথে সাথে ছবি বা চিত্রকল্পগুলোর উৎপাদন ও ব্যবহারকে ঘিরে নতুন ধরণের উদ্বেগ দেখা দিতে থাকে। এই কারণে, নবীজীর ছবি ও চিত্রকল্পগুলোর উপর নতুন ধরণের আইনি নিয়ন্ত্রণ আইনি আদেশের আকারে হাজির হতে শুরু করে।

এর মধ্যে একটি হলো ১৯২৬ সালে জারিকৃত ফতোয়া; এটি কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্নি এলেমরা জারি করেছিলেন। এই ফতোয়া নবীজীর উপর নির্মিত একটি চলচ্চিত্রকে নিষিদ্ধ করা হয়, যেই চলচ্চিত্রটি  নির্মিত হয়েছিল সেকুলার তুরষ্কের অর্থায়নে। পঞ্চাশ বছর পর চলচ্চিত্র পরিচালক মুসতাফা আক্কাদ একই ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হোন যখন তিনি দ্যা মেসেজ (১ নং ছবি) নামক বায়োপিক বানানো শুরু করেন। যদিও তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্নি আলেমদের কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে গিয়েছিলেন, তবু মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ এটির অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানায় এমনকি যদিও সিনেমার পর্দায় নবীজীর সশরীরের উপস্থিতি কখনোই ছিল না। (চলচ্চিত্রটি নবীজীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুট করা হয়েছিল।) মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ পরিচালিত হয় সৌদি আরবের অর্থায়নে এবং ইসলামের সালাফি তাফসির বা ব্যাখ্যা অনুসরণ করে। বিংশ শতকের দুটো চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নবীজীকে চলচ্চিত্রে কীভাবে চিত্রিত করা যেতে পারে সে বিষয়ে মিশরী ও সৌদি আরবের সুন্নি আলেমরা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। এই মতভেদ স্পষ্টতই সুন্নি-শিয়া বিভাজনের মধ্যে পড়েনি।

কয়েক দশক পেরিয়েই, বিশেষত ১৯৯০ দশকের পর থেকে নবীজীর চিত্রকল্পের বিষয়ে আইনি জমিন আরো জটিল হয়ে উঠে। মনে হয়েছিল, এ ক্ষেত্রে ১৯৯৭ সালটা যেন ছিল একটি সন্ধিক্ষণ।

এই সময়ে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR) প্রধান বিচারপতি উইলিয়াম রেহনকুইস্টকে অনুরোধ করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ভিতরের দেয়ালে খোদাইকৃত নবী মুহাম্মদের ভাষ্কর্যমণ্ডিত চিত্রকল্প বা চিত্রায়নটা যেন সরিয়ে ফেলা হয় বা মুছে দেয়া হয়। (ছবি ২-৩)।সুপ্রিমকোর্টের ভিতরকার এই পিক্টোরিয়ালে ইতিহাসের মহান বিধানকর্তা বা আইনপ্রণেতাদের মাঝে নবী মুহাম্মদও অন্তর্ভুক্ত আছেন; জাস্টিনিয়ান ও শার্লেমাগ্নের মধ্যে পাগড়ি পরিহিত নবী মুহাম্মদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় যেখানে একহাতে রয়েছে ইসলামী আইনের উৎস হিসেবে কোরআন এবং অন্যহাতে রয়েছে ন্যায়বিচারের প্রতীকস্বরূপ একটি তলোয়ার।

 

অ্যাডলফ ওয়েইনম্যানের ডিজাইন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। যেখানে মধ্যযুগের মহান মহান আইন প্রণেতাদের ছবি রয়েছে।

 

রেহনকুইস্ট CAIR এর অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সময় (কারণ সুপ্রিম কোর্ট ভবনের স্থাপত্যসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যে শারীরিক আঘাত অবৈধ), এই বিষয়ে তাহা যাবের আল-আলওয়ানি ২০০০ সালে একটি ফতোয়া জারি করেন।এই সময়ে তিনি সৌদি আরবের আইনশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে এবং উত্তর আমেরিকার ইসলামি আইনি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

আল-আলওয়ানী আন্তরিকভাবেই ইসলামি আইনীয় যুক্তি প্রক্রিয়ার প্রচলিত রূপের মাধ্যমে যুক্তি দেখান যে, প্রথমত ইসলামে ছবি বা চিত্রকল্পের উপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার কোনো অস্তিত্ব নেই; এবং দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টে প্রদর্শিত নবীজীর চিত্রায়ন প্রশংসনীয় বৈ কিছু নয়। তিনি তাই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান:

 আমি সুপ্রিম কোর্টে যা দেখেছি সেটা আমেরিকার মুসলমানদের তরফ থেকে তারিফ ও কৃতজ্ঞতা পাওয়ার যোগ্য এটি ইসলামের প্রতি সুপ্রিম কোর্টের স্থপতি এবং এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের একটি ইতিবাচক মনোভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ এই দেশের মুসলমান ও ইসলামকে ঘিরে যে দুর্ভাগ্যজনক ভুল তথ্য ঘুরপাক খাচ্ছে তার কিছুটা ঘোচাতে এটি সাহায্য করবে, ইনশাল্লাহ

সহজভাবে বলতে গেলে, ২০০০ সালে সৌদি আরব ভিত্তিক অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এক আইনি পণ্ডিত নবীজীর ভাষ্কর্যমণ্ডিত চিত্রকল্পকে অনুমোদনযোগ্য ও প্রশংসনীয় বলে রায় দেন।

 

 

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে খোদাইকৃত কোরআন ও তলোয়ার হাতে নবী মোহাম্মদের ছবি

 

কিন্তু এরপরই ৯/১১, ইরাকে মার্কিন হামলা এবং ২০০৫ সালে ড্যানিশ কার্টুনের ঘটনা ঘটে যায়। কোনো সন্দেহ নেই, নবীজীর অবমাননাকর ক্যারিকেচারটি জড়িয়ে পড়ে জটিল ভূ-রাজনীতি, পরিবর্তনশীল ইউরোপীয় ডেমোগ্রাফিক প্রেক্ষাপট এবং নাইন-ইলেভেন পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সাথে। ইসলামের বিশ্বাসের উপর আক্রমণ এবং অবমাননা হিসেবে বিবেচনা করে ২০০৬ সালে সৌদি ইমামরা এই কার্টুনগুলোকে অপবিত্রকর হিসেবে সাব্যস্ত করে এর নিন্দা করেন। ঠিক এই সময়েই আমরা হঠাৎ করেই একেবারে সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য পেতে শুরু করি যে, ‘ইসলাম নবীজীর ছবি বা চিত্রকল্পকে অসম্মানজনক হিসেবে বিবেচনা করে এবং ক্যারিকেচারকে ব্লাসফেমীয় বলে মনে করে’। এই মার্কামারা নতুন আইনি ঘোষণার পাশপাশি সৌদি কোম্পানি ও সংগঠনগুলো ড্যানিশ পণ্য বয়কট করা শুরু করে। কয়েকশো কোটি ডলারের আর্থিক পেশিগুলোকে ব্যবহার করে সৌদি আরবের এই প্রত্যাঘাত ডেনমার্কের বিরাট আর্থিক ক্ষতি করে। সুতরাং নবীজীর ছবির বিরুদ্ধে তুলনামূলক সাম্প্রতিক এই সৌদি ফতোয়া অর্থের জোর কতটুকু সেটাও দেখিয়ে দিয়েছিল।

২০০৫ সাল থেকে ইসলামি আইনগুলো সমসাময়িক পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে বিবর্তিত হচ্ছে, এবং নবীজীর ছবি বা চিত্রকল্পের বিরুদ্ধে আরো ফতোয়ার উদ্ভব ঘটে। এগুলোর একটা বিরাট অংশ সহজেই পাওয়া যায় কারণ অনলাইনে ইলেক্ট্রোনিক ফতোয়া বা ই-ফতোয়া হিসেবে এগুলো সহজলভ্য। দুইটা প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ প্রকাশ করে দেয় যে, ইসলামি দুনিয়ায় নবীজীর চিত্রায়নের বৈধতা-অবৈধতার প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, সালাফি অবস্থান সম্পূর্ণ আপোষহীণ: কোনো অবস্থাতেই নবীজী ও তার সাহাবিদের ছবি বা চিত্রকল্প জায়েজ নয়। অন্যদিকে, ইরাকের শিয়া আইনের কর্তৃপক্ষ আয়াতুল্লাহ আল-সিসতানি মতামত দেন যে, নবীজীর চিত্রায়ন ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা তাজিম (সম্মান) ও তাবজিল (শ্রদ্ধা) এর সহিত উপস্থাপন করা হয়। এটা তাই মোটেও কোনো অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয় যে, আজ নবীজীর সশ্রদ্ধ চিত্রায়ন পাওয়া যায় শিয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই, বিশেষত ইরাক, ইরান ও লেবনন (ছবি ৪)। প্রকৃতপক্ষে এই ধরণের ভক্তিমূলক চিত্রকল্প, বস্তুদের একটি জলজ্যন্ত বাজারও বিদ্যমান; সালাফী ধারা মানেন না এমন মুসলমানরা এগুলো খরিদও করেন।

 

কোরআন হাতে নবী মুহাম্মদ, কোরআন থেকে বেরোচ্ছে নূর; তার আঙুল ঘোষণা করছে শাহাদা: ‘আল্লা ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, হযরত মুহাম্মদই  আল্লার প্রেরিত রাসুল’; তেহরানে বিক্রিত একটি পোস্ট কার্ড, ইরান। ২০০১

 

সুন্নি-সালাফি এবং শিয়া আলেমদের একেবারে সাম্প্রতিক এই তর্ক-বিতর্ক থেকে সহজেই অনুমেয় যে, কীভাবে কেউ কেউ যুক্তি দেখাতে পারেন, এই আইনি মতভেদ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। যদিও এটা আজ নিশ্চিত সত্য বলেই ধ্বনিত হচ্ছে, কিন্তু ২০০৫ সালের ড্যানিশ কার্টুনের পূর্বে বিষয়টা এমন ছিল না।

প্রকৃতপক্ষে, ২০০০ সালে সুন্নি মুফতি আল-আলওয়ানি সুপ্রিম কোর্টে খোদাইকৃত নবীজীর চিত্রায়ণের তারিফ করেন, যেখানে বিংশ শতাব্দীতেই মুদ্রণযন্ত্র ও চলচ্চিত্র শিল্পের বিস্তারের কারণে নবীজীর চিত্রকল্পগুলোর প্রসারকে মোকাবিলা করতে সুন্নি বিভিন্ন আইনি গোষ্ঠীই একে অপরের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছিল।

এরও অনেক আগে, ১২’শ শতকের দিকে ইসলামি আইনের পণ্ডিতেরা, বিখ্যাত সুন্নি আলেমরা ছবি বা চিত্রকল্পগুলোর (নবীজীর ছবিসহ) ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করেন নি। সুতরাং, নবীজীর ছবি বা চিত্রকল্পের উপর দীর্ঘকালীন ও অনড় ইসলামি ‘নিষেধাজ্ঞা’ একেবারেই সাম্প্রতিক উদ্ভাবন ছাড়া আর কিছুই নয়, যেখানে কিনা গণমাধ্যম কাজ করছে অনুঘটক হিসেবে, অবমাননাকর কার্টুন একে তরান্বিত করছে এবং সৌদি পেট্রোডলার এটি ছড়িয়ে দিচ্ছে সারাবিশ্বে।

 

পাদটীকা ১: Michael Cook, Commanding Right and Forbidding Wrong in Islamic Thought. (Cambridge: Cambridge University Press, 2000), 145-146, footnote 2.

 

পাদটীকা ২: Muhammad ‘Abduh, Ta’rikh al-Ustadh al-Imam al-Shaykh Muhammad ‘Abduh (Cairo: Manar Publisher, 1344/1925), vol. 2, 498-502.

 

 

 

 

More Posts From this Author:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
Scroll to Top