রাষ্ট্র ভাষা বদলেছে, দুঃশাসনের ভাষা বদলায় নাই

এই ক্ষমতার মহামারীর বিরুদ্ধেও আছে ঐতিহাসিক ভ্যাক্সিন। যারা আমাদের উপর ক্ষমতার জুলুম চাপিয়ে দিতে চায়, তাদের কোনো আদেশ কিংবা নির্দেশ, শাসন অথবা শোষণ না মানাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ এই ক্ষমতার মহামারীর বিরুদ্ধে। তবে ঐতিহাসিক এই ভ্যাক্সিনের সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন পৃথিবীর সকল দুঃশাসকেরাও। তাই তাদেরও প্রবল চেষ্টা থাকে যেকোনো মূল্যে তাদের শাসন না মানার সুযোগ রুখে দেবার। আর আমাদের দেশে বিগত এক দশকে ‘মানি না’ শব্দ দুটো উচ্চারণ করার সুযোগ কেড়ে নেবার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে আইসিটি অ্যাক্ট ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। 

 

সম্প্রতি সারা দেশে শুরু হয়েছে করোনার ভাক্সিন যাত্রা, যেকোনো বিপর্যস্ত মানুষের মতো আমিও আশা রাখি সফলভাবে সম্পন্ন হবে এই যাত্রা। আশা রাখি করোনার মহামারী অতিক্রম করতে পারবে আমার দেশ। কিন্তু আরেকটা মহামারীর কথা বলবার আছে আমার, যেমনটা আমি প্রায়শই বলি। গত এক বছরের করোনাকালে আরেকটা মহামারী প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে আমাদের সামনে, “ক্ষমতা” সেই মহামারীর নাম।

করোনা বড়জোর কিছুদিন ভুগিয়ে চিরতরে স্থগিত করে দিতে পারে আমাদের নিরীহ নিশ্বাসের গতি। কিন্তু ক্ষমতার মহামারী এর চেয়েও অনেক বেশি নির্মম। ক্ষমতার মহামারী আপনার জীবনকে সহজেই করেই শেষ করে দেবে না, বরং ধীরে ধীরে কেড়ে নেবে আপনার জীবন থেকে মানবিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার সকল আশ্রয়। ক্রমেই পরিণত করবে আপনাকে ভাষাহীন, ভাবনাহীন, নির্জীব এক অর্বাচীন শরীরে।

এই ক্ষমতার মহামারীর বিরুদ্ধেও আছে ঐতিহাসিক ভ্যাক্সিন। যারা আমাদের উপর ক্ষমতার জুলুম চাপিয়ে দিতে চায়, তাদের কোনো আদেশ কিংবা নির্দেশ, শাসন অথবা শোষণ না মানাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ এই ক্ষমতার মহামারীর বিরুদ্ধে। তবে ঐতিহাসিক এই ভ্যাক্সিনের সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন পৃথিবীর সকল দুঃশাসকেরাও। তাই তাদেরও প্রবল চেষ্টা থাকে যেকোনো মূল্যে তাদের শাসন না মানার সুযোগ রুখে দেবার। আর আমাদের দেশে বিগত এক দশকে ‘মানি না’ শব্দ দুটো উচ্চারণ করার সুযোগ কেড়ে নেবার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে আইসিটি অ্যাক্ট ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।

শুধু এই করোনাকালেই স্কুল ছাত্র থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি, বাউল, শিল্পী ও কার্টুনিস্ট সহ বহু মানুষকে নির্মম বলি হতে দেখেছে আমরা এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। যাদের প্রত্যেকের প্রধান অপরাধ ছিল দুর্নীতি, অনিয়ম অথবা দুঃশাসন মেনে না নিয়ে সেসবের বিরুদ্ধে কথা বলা। ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সহ নানান শ্রেণি পেশার মানুষ ইতিমধ্যেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে চিহ্নিত করেছে গণবিরোধী আইন হিসেবে। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কেবলই গণবিরোধী আইন নয়, এটি মূলত মানবতা বিরোধী আইনের’ও জলজ্যান্ত এক উদাহরণ।

কয়েক লক্ষ বছরের প্রচেষ্টায় ভাষা নামক এক সার্থক যোগাযোগ মাধ্যমের আবিষ্কার করেছিল মানব প্রজাতি, যেন আমাদের মত, আমাদের, ভাবনা কল্পনা কিংবা আকাঙ্খা আমরা সাবলীল ভাবে প্রকাশ করতে পারি।
আজকের দিনে ফোর-জি জামানায়  বসে যখন আমি এই লেখাটা লেখছি, এবং আপনারা যারা পড়ছেন, শুদ্ধস্বরের পাতায় আপনার সাথে আমার যোগাযোগ হবার পুরো অবদানই তো হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা অনেক চিন্তার সমষ্টির। হাজার বছর ধরে তিলে তিলে এই সভ্যতা গড়ে ওঠার কারিগর হিসেবে যেসকল চিন্তা কাজ করেছে, সেই চিন্তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আমাদের ভাষা, আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীন অধিকার।

আর যখন শুধু মাত্র নিজের আকাঙ্খা, ভাবনা এবং মত প্রকাশের জন্য আইন করে কাউকে গ্রেফতার করা হয়, হেনস্তা করা হয় তখন সেটা শুধু একজন ভুক্তভোগী নাগরিকের জন্যই নয় বরং সমগ্র সভ্যতা এবং প্রজাতিগত ভাবে সমগ্র মানব জাতির জন্যই অপমানের।

আর যারা এই ধরণের আইন তৈরি করে, প্রয়োগ করে, প্রকৃত প্রস্তাবে তারা সকলেই মানবতা বিরোধী অপরাধী এবং সচেতন ভাবে তাদের সকল সমর্থক মানবতা বিরোধী অপরাধের দোসর ছাড়া আর কিছুই নয়।

গীতিকার আব্দুল লতিফের কালজয়ী এক গানের দুটো লাইন নিশ্চয়ই মনে থাকার কথা আপনাদের-
ওরা আমার মুখের ভাষা কাড়িয়া নিতে চায় /ওরা কথায় কথায় শিকল পড়ায় আমার হাতে পায়

এই গানটার বয়স ৬০ বছরের বেশি, পাকিস্তানি দুঃশাসনের আমলে লেখা হয়েছিল গানটি। এই মার্চে ৫০ বছর হবে পাকিস্তানি দুঃশানের থেকে মুক্ত হয়ে একটা গোটা দেশ স্বাধীন করেছি আমরা। অথচ স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও যখন আব্দুল লতিফের গানের দুটো লাইন একইরকম প্রাসঙ্গিক থেকে যায় তখন বুঝতে হবে স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে দেশের প্রধান শাসকগোষ্ঠী ছাড়া আমরা আর তেমন কিছুই বদলাতে পারি নাই। আমাদের রাষ্ট্র ভাষা বদলেছে, কিন্তু দুঃশাসনের ভাষা আজ’ও বদলায় নাই। স্বাধীন হয়ে একটা সংবিধান আমরা রচনা করতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু ৫০ বছর পরেও আমাদের দেশের মানুষ দুঃশাসন থেকে স্বাধীন হয় নাই, মত প্রকাশের স্বাধীনতা পায় নাই।

রীতিমত অন্ধ লোকটাও হয়তো খেয়াল করে থাকবে, সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবীদার নৈশ ভোটে বিজয়ী সরকারের বিপরীতে কেউ কিছু বললেই অদ্ভুতভাবে তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় আমাদের মৌলিক আশ্রয় মুক্তিযুদ্ধ’কে।
অথচ খোদ এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।

স্বাধীন দেশে সকল নাগরিকের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তৈরি করে যখন “সরকার বিরোধী মত পোষণ করতে পারে” এই সন্দেহে কাউকে গ্রেফতার করা হয়, মানবিক মর্যাদার প্রশ্নকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে কাউকে রিমান্ডে নেওয়া হয়- তখন সেটা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনাকে অপমান এবং ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন ও কোটি মানুষের আত্মত্যাগের সাথে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা করা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এটা স্পষ্ট যে- লাখো শহীদের রক্তের উপর ভিত্তি করে দাঁড়ানো এই রাষ্ট্রে যারা মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনাকেই বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে শাসন পরিচালনা করে- সেই বিশ্বাসঘাতকেরা আর যাইহোক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হতে পারে না।

আমার খুব অবাক লাগে, যখন আইন প্রণেতারা নিজেদের তৈরি আইন প্রয়োগ করে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা দমনের জন্য দেশের সাধারণ নাগরিকদের গ্রেফতার করে, রিমান্ডে নেয়।

আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনা, আইন দিয়ে কী করে ঘৃণা দমন করা যায়?

আইন দিয়ে বড়জোর যেটা করা যায়- তা হচ্ছে ঘৃণা বৃদ্ধি।  হয়তো সেকারণেই এই আইন তৈরির আগে মানুষ এইসব আইন প্রণেতাদের যতটা ঘৃণা করতো এখন তার চেয়েও দ্বিগুণ, তিনগুণ, শতগুণ বেশি ঘৃণা করে।

২৮১ দিবারাত্রি পার হয়ে গেল, ক্ষমতার মহামারীতে আক্রান্ত কার্টুনিস্ট কিশোর আজও কারাগারে।
দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কার্টুন আকা ছিল কিশোরের প্রধান অপরাধ, অন্তত তুলে নিয়ে যাবার পর এমনটাই জানিয়েছিল পুলিশ।

গ্রেফতার হবার আগে পর্যন্ত বিবেকের তাড়নায় কার্টুন এঁকে দেশের নিরন্ন মানুষের সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ জানিয়েছিল কিশোর। যে হাত দিয়ে সে ছবি আঁকত, হাতকড়া পড়ানো হয়েছিল তার সেই হাতে। যেন আর কেউ সাহস না করে ছবি এঁকে প্রতিবাদ করার।

অথচ তাকে গ্রেফতার করার পর যেন আরো বেশি অর্থবহ হয়ে উঠেছে তার প্রতিবাদের ভাষা, তার সবগুলো কার্টুন। সারা বিশ্বের সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, বুদ্ধিজীবী সহ লাখো মানুষ গত ৯ মাসেরও বেশি সময় ধরে ক্রমেই মহাদেশীয় সকল ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়ে যাচ্ছে তার কার্টুনগুলো। ৃসেটাই স্বাভাবিক। যেহেতু সব ফুল কেটে ফেললেও বসন্তকে দমিয়ে রাখা যায় না, বসন্ত অনিবার্য, বসন্ত আসবেই।

কিন্তু বসন্ত আসার আগে কুয়াশায় সূর্য ঢেকে থাকা এক বিষণ্ণ শীতকাল’ও পাড় করতে হয় আমাদের। হয়তো সেই শীতের ঋতুই পাড় করছি আমরা। ১২ বছরের দীর্ঘ কুয়াশায় সূর্য ঢেকে থাকা এক প্রবল শীত।
এই শীত’ও শেষ হবে, হতে হয়, হতে হবে।
শেষ হবে দ্রুতই, যদি আমরা কম্বল ছেড়ে পথে নামি, ঝেড়ে ফেলি এই শীতে গলায় আটকে রাখা/ দুঃশাসনের দৃশ্যে জমে থাকা কফ। অন্যথায় আমরা শীতেই অভ্যস্ত হয়ে যাবো, অভ্যস্ত হয়ে যাবো দুঃশাসনের দীর্ঘ কুয়াশায়। অভ্যস্ত হয়ে যাবো সূর্যহীনতার দিনে। আমাদের গলায় জমে কফ নিজেই পথ রোধ করে দেবে আমার কণ্ঠস্বরের। আমরা হয়ে যাবো ভাষাহীন, ভাবনাহীন, নির্জীব এক অর্বাচীন শরীর।

“এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয়নি, তুমি কথা বলো”

 

Shoikot Amin is an anti-authoritarian poet and activist from Bangladesh. He believes in equal rights for all human beings on this planet and the right of every other living being to live free.

 

More Posts From this Author:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
Scroll to Top