শরণার্থী শিবিরের সর্বব্যাপী দুর্গন্ধের ভারে

Share this:

 

তেইশের অক্টোবরে গাজা

সেই রাতে
ভোরের আলোকরেখা লক্ষ্য ক’রে
একান্তে ঘুমিয়ে ছিলো
পরিশ্রান্ত প্রশান্ত মানুষ।
তারাদীপ্ত রাত্রির বিজনে
হঠাৎই গর্জন শোনা গেলো;
যেন লক্ষ দানবের  ক্রুদ্ধকণ্ঠ
যন্ত্রের নির্ঘোষ হয়ে
দিগ্বিদিক আতঙ্কে কাঁপালো;
মুহুর্মুহু বিরাট বীভৎস  শব্দে
পুঞ্জ পুঞ্জ কৃষ্ণ ধোঁয়া
অভ্রংলিহ পীতবর্ণ অনলে অনলে
আর অসংখ্য নারীর নাড়ীছেঁড়া আর্তনাদে
মূর্তি পেলো ধাতব পাণ্ডব
আনৃশংস্য, জান্তব, প্রাচীন।
বিধ্বস্ত বিল্ডিং থেকে ধীরপদে বহির্গত
ভস্ম-লিপ্ত নাগা সন্ন্যাসীর মতো
ওরা কারা লাশ কোলে নিহত শিশুর,
মেডুসার দৃষ্টির ছোবলে
হঠাৎই  প্রস্তরীভূত তাদের দৃষ্টির সামনে দাঁড়ালেই
ঝলসে যাবে রেটিনা তোমার।
আকাশে বাতাসে আর
মৃত্তিকার আতঙ্কিত ঘাসে,
চারিদিকে পরিব্যাপ্ত ধাতব ধ্বনির উপকূলে,
রক্তের আংরাখা-পরা
সম্ভাব্য মৃত্যুর উল্কি-চিহ্নিত শিশুরা,
মাতাল  বৃদ্ধের  মতো দুলে দুলে
একে একে উত্তীর্ণ হয়েছে দেখো
ধুম্র-কলঙ্কিত এক দিবসের
প্রেতায়িত রাত্রি-সীমানায়
তাদের কান্নার শব্দ
বোমারু প্লেনের পেটে যায়;
অসহায় বিশ্ব দেখে নিষ্পলক
শতাব্দীর জঘন্য অন্যায়,
ওপড়ানো বৃক্ষের মতো
গাজার আক্রান্ত ভূমি
অতলান্ত খাদের সীমায়।
কংক্রিটের কঠিন  শয্যায়
শুয়ে আছে মায়ের  শরীর
বিচূর্ণ রক্তের ভাণ্ড স্তনদ্বয়,
ধবল দুগ্ধের ধারা হারালো কোথায়,
শিশুরা কি ভ্যাম্পায়ার হবে?
জল নাই জ্বালানি  নিঃশেষ–
শরণার্থী  শিবিরের সর্বব্যাপী দুর্গন্ধের  ভারে
বাতাসেরও ফুসফুস হাঁপায়
অলৌকিক নিষ্ঠুর লজ্জায়।
মেশিন গানের থেমে থেমে
উদগীর্ণ ধ্বনির মতো,
সমস্ত স্বজন-হারা কিশোরীর
কান্নার আওয়াজ
বিদ্যুৎ বল্লম হয়ে দীর্ণ করে
শ্রুতির আকাশ,
ট্যাংকের চাকার নীচে
বেঁচে আছে শুধু পোড়া ঘাস।
ধুলাচ্ছন্ন অয়োময় ইটের স্তূপের বহু নীচে
বালকের ভগ্নকণ্ঠ আকুতির  অস্ফুট
কান্নার ধ্বনি শোনা যায়
যেন এক দূরাগত মন্ত্রের স্বনন,
সেই ধ্বনি লক্ষ্য ক’রে পিতা
তাঁর অনাবৃত হাতে
খুঁড়ে চলে ধ্বংসের পাহাড়
যেন সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ শুধুমাত্র দু’হাতের
রক্তঝরা অঙ্গুলিচালনে
সস্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেবে
অবরুদ্ধ পুত্রের খোঁয়াড়।
অর্ধদগ্ধ অসনাক্ত শরীরের মাংসের নশ্বর গন্ধ
তখনও বাতাসে আর শ্বাসে;
কৃষ্ণবর্ণ ধোঁয়ার কুণ্ডলী
যেন এক অন্তহীন ভুজঙ্গের মতো
ঊর্ধ্বাকাশে উত্তরঙ্গ ছিলো।
বিচূর্ণ স্তম্ভের নীচে আলুথালু  মায়ের ক্রন্দন,
বিপুল ধ্বংসের মঞ্চ
ঘিরে আছে ক্রমশ বর্ধনশীল
বৃত্তের ওপারে বৃত্ত আরো বৃত্ত
শূন্যদৃষ্টি মানুষের ঢল,
হিংসার ছোবলে দীর্ণ মানবতা
ক্রমাগত হিংস্র হয়ে ওঠে;
মনে হয় যেন তারা পর্যুদস্ত  নিরন্ন হতাশ,
এখনই ফুরিয়ে যাবে তাহাদের
সমবেত বাঁচার নিঃশ্বাস;
যদিও তাদের অন্তরের অন্তরালে
ধমনীর শোণিত ধারায়
অবরুদ্ধ অন্ধ ক্রোধ
মাইল মাইল ব্যাপ্ত ম্যাগমার মতোন
ভিসুভিয়াসের ছন্দে একদিন উদ্গীর্ণ হবেই,
সেই প্রলয় ধ্বংসের লালা,
দুর্ণিবার মৃত্যুজ্বালা থেকে
পিশাচের কোনো মুক্তি নেই।

 

অনেক ঝড়ের পরে

অনেক ঝড়ের পরে দেখা হলো
স্তব্ধতার আকাশের নীচে এক
বৃষ্টিসিক্ত সমুদ্রবেলায়,
যখন তোমার চুল এলায়িত, দোল খায়
মন্দাক্রান্তা আলোর বাতাসে
দূর শূন্যে তোমাকে বন্দনা কোরে
সাগরের বলাকারা চক্রাকারে ভাসে,
কোটি কোটি তরঙ্গের অনাহত ধ্বনি
মন্ত্র হয় তোমার পূজার,
সূর্য নেই, চন্দ্র নেই, নক্ষত্রের আলোও দেখি না,
অথচ এ ক্রন্দসীর সবটুকু
আপ্লাবিত হলো আজ
তোমার চোখের আলো পেয়ে।

 

তোমাকে দেখার পরে

তোমাকে দেখার পরে সূর্যোদয়
পূর্বতন সৃষ্টির প্রলয়,
আকাশের নির্গলিত সোনা
যেন পূঞ্জীভূত আলোর ঝনঝনা।
বায়ুভূত ছিলো যেই দেহ
মূর্তি পেলো অগ্নির শিখায়,
অগণ্য নক্ষত্রবীথি পার হয়ে
বারম্বার জ্বলে ওঠে স্পর্শের সীমায়।
অন্ধতমসার গর্ভে উৎপাদিত যে বাসনা
বিসর্পিত ছিলো সেই তৃষাদীর্ণ শূন্যের বাতাসে,
লক্ষ বছরের পরে লক্ষ্য পেলো
তারাদীপ্ত তোমার উচ্ছ্বাসে।

 

শব্দের বিপুল রাত্রি

পাখিদের উড়ে-যাওয়া
নিশ্চিহ্ন বাতাসে
শোনা গেলো কৃষ্ণ কোলাহল,
শব্দের বিপুল রাত্রি
ধেয়ে এলো ধ্বনির ধারায়,
চারিদিকে ছলচ্ছল
স্তব্ধতার সুরাপ্লুত জল,
কোনো এক অব্যক্ত বিশ্বের বিন্দু, প্রতিবিন্দু
কেঁপে ওঠে মুহুর্মুহু
প্রকাশিত হওয়ার ব্যথায় ।

 

একদিন নদীর আত্মায়

নদীর আঁচল ধরে হেঁটে চলি
অভিযাত্রী আমরা ক’জন।
আমাদের সম্মিলিত হাসির আওয়াজ শুনে
কল্লোলিত ফেনার  মুকুট-পরা ঢেউ
বারংবার চুম্বনে চূর্ণিত করে
বেগুনি বালুর তটরেখা ।
মনে হয় সৃষ্টির আরম্ভলগ্ন হতে
নদীর আত্মার জল ভেঙ্গে ভেঙ্গে
সম্মুখে চলেছে শান্ত , অকম্পিত
আমাদের তীর্থযাত্রীদল ।
চারিদিকে  রক্তবর্ণ জলের হিল্লোল স্পর্শে
উথাল পাথাল নাচে
আমাদের ধমনীতে ধমনীতে প্রবাহিত তরঙ্গলহরী;
আমাদের ফুলে-ওঠা চুলে চুলে
বাঁধভাঙ্গা বাতাসের গন্ধর্বের বালিকারা দুলে;
ঊর্ধ্বাকাশে ঊর্ধ্বাকাশে
যেন সেই বিশ্বদেবতার
ঘনীভূত নীলিম নিঃশ্বাসে,
আলোর বিচিত্রবর্ণ বাতাসে বাতাসে,
যুগ হতে যুগান্তরে ছুটে-চলা
আমাদেরই মতো সব
বিগত ও অনাগত মানুষেরই
জয়ধ্বনি ভাসে ।
ক্রমশ ম্লানতা পায়
ক্ষীয়মান সংগীতের মতো
এই দিনান্তের দ্যুতি,
অস্পষ্ট রেখার মত দেখা যায়
একঝাঁক উড়ন্ত সারস,
আঁধার সবুজ ঢেউ ভেঙ্গে ভেঙ্গে
যতোটা সম্মুখে যাই
তমসা ও আলোকের সন্ধিলগ্ন
ততোটা প্রকট হয়ে ওঠে ওই
চরের মরুর শুভ্র সুবিস্তীর্ণ দিগন্তরেখায়
দিগম্বর যেখানে অম্বর ।
অস্পষ্ট রহস্যপৃষ্ট ওলটানো বাটির মতো
আকাশের বিরাট প্রাঙ্গণে ,
আঁধার আলোর বক্ষে দিশাহারা
আলো যেন তমসার তারা ,
সেইখানে জগন্মাতা খুলেছে দুয়ার
মৃত্যুহীন মৃদুহাস্যে তাঁর
আপ্লাবিত জলের পাথার,
যেন এক মায়া-সৃষ্ট হিমায়িত স্ফটিকের
নিস্তব্ধ মুকুর,
সন্ধ্যার নদীর জল পান করে
নির্জন কুকুর ।

 

জননীর নিজস্ব ভাষায়

মেলে ধরো সপ্তপদ্ম
জননীর নিজস্ব ভাষায়,
যেন এই রূপবিশ্ব
ক্রমোদ্ভিন্ন হয়ে ওঠে
অমূর্ত জ্যোতির ইশারায় ।
জ্বলে ওঠো
যন্ত্রনার জলদর্চি  গানে,
যেন এই রক্তের মন্থন শেষে
উঠে আসা বর্ণমালা
শব্দমান হয়ে ওঠে,
প্রাণ হতে প্রাণান্তরে,
নিরবধি সময়ের
অনির্ণেয় ঝড়ের অন্তরে।
উড়ে চলো
বিপুল সুদূর ঊর্ধ্বে ,
মুক্তবেণী মহামাতৃকার
প্রসন্ন দৃষ্টির থেকে সমুদ্ভূত
সেইসব অনিবার্য অক্ষরের
অমৃত-ডানায়,
যেন ওই স্তরে স্তরে সুবিন্যস্ত
চতুর্দশ ভুবনের রহস্যের
রাশি রাশি আনন্দসম্ভার,
প্রকাশিত হয়ে ওঠে
ধ্যানদৃষ্ট শিখরে শিখরে আর
মৃত্যুশীল শিরায় শিরায় ।

 

  • More From This Author:

      None Found
  • Support Shuddhashar

    Support our independent work, help us to stay pay-wall free by becoming a patron today.

    Join Patreon

Subscribe to Shuddhashar FreeVoice to receive updates

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!