সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের বি-উপনিবেশয়ান

Share this:

ভূমিকা

সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। এক্ষেত্রে উপনিবেশায়নের ইতিহাস খুবই বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে উপস্থিত থাকে।উপনিবেশায়ন শাসনমালে পরিকল্পিতভাবে সমুদ্র বাস্তুসংস্থানকে জড়বস্তুকরণ করা হয়।অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, প্রগতি ইত্যাদি বিষয়ের ক্ষেত্রে সমুদ্র জড় কর্তাসত্তা হিসেবে হাজির হয়। সমুদ্র ব্যবস্থাপনাকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ও পুঁজিকেন্দ্রিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যে ধারাবাহিকতা এখন পর্যন্ত চলমান। যার ফলে সমুদ্রের প্রাণ-প্রকৃতি ও জীব বৈচিত্র রক্ষার আবেদন কার্যকরভাবে উপস্থিত নয়।সমুদ্রের সাথে মানব উচ্চাকাঙ্ক্ষার যে আধিপত্যশীল সম্পর্ক ক্রমশ গড়ে উঠছে তা প্রবলভাবে পরিবর্তনযোগ্য।

সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণ ও তার বাস্তুতান্ত্রিক কার্যকারিতাকে ক্রমশ ধ্বংসের পিছনে বৈশ্বিক উচ্চ বিলাসিতা,মনুষ্যকেন্দ্রিক বিভিন্ন জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্প ও পুঁজিকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে।এর সাথে সংযুক্ত রয়েছে ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ড। সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই বি-ঔপনিবেশ তৎপরতার প্রয়োজন। এজন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক বিদ্যা ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রপঞ্চসমূহকে পর্যালোচনামূলকভাবে দেখা উচিত। যেহেতু সমুদ্র বাস্ততন্ত্রের অবক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের উৎস হিসেবে রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যাবলি বিশেষভাবে দায়ী।রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যবস্থাপনা ও কার্যবলীকে পুনর্নির্মাণের মাধ্যমেই ধরিত্রীর সাথে আমাদের টেকসই সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব।

 

১) এনলাইটেনমেন্ট ও মানব-প্রকৃতি বিভাজন

আফ্রিকা এশিয়া যেসব আদিবাসীদের উপর ঔপনিবেশিক শক্তি আধিপত্য বিস্তার করে তারা ছিলো প্রকৃতির খুবই কাছাকাছি। প্রকৃতির মতো এদের প্রতিও  একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হতো যে তারা অসম্পূর্ণ ও অনগ্রসর।আফ্রিকা ও এশিয়ার লোকদেরকে প্রকৃতির কাছাকাছি হিসেবে  দেখার প্রবণতা এনলাইটেনমেন্টের অনেক চিন্তকদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। প্রসঙ্গক্রমে দার্শনিক হিউমের মন্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি এ ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন যে ‘মানব প্রজাতির অন্যান্য মানুষেরা….শেতাঙ্গদের তুলনায় নীচ’। অর্থাৎ এদের অবস্থান প্রকৃতির মতো যার মধ্যে যুক্তিবোধ, উন্নতচিন্তা ভাবনা নেই, কোন শৃঙ্খলিত নিয়মকানুন নেই। তাদের চিন্তাভাবনাও তা দ্বারা প্রভাবিত কার্যকলাপ অনেকটা সভ্য মানুষের বাইরে; পরিবেশের কাছাকাছি প্রাকৃতিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত। তারা হচ্ছে যুক্তি ও প্রজ্ঞার দিক থেকে সভ্যতার অগ্রগতি হতে পিছিয়ে থাকা লোক।

এনলাইটেনমেন্ট প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল জ্ঞান ও সংস্কৃতির সবকিছুকে একজায়গায় নিয়ে আসা।যার ফলে বিশেষ গুণাবলিগুলো সাধারণ মানে নেমে আসে।এডোর্নো এবং হরখেইমারের ভাষায় ‘এটি বিশেষ এবং সার্বিকের মধ্যে একটি অস্পষ্ট সম্পর্ক তৈরি করে’। প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণের জ্ঞানটি পরিণত হয় প্রকৃতি থেকে মানুষের বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপায়ে।এনলাইটেনমেন্ট প্রকল্প যেসব জ্ঞানকাণ্ড নির্মাণ করেছিলো সেগুলোর অবস্থান ছিলো এরকম যে; কোন বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের বিষয়টি নির্ভর করে তার উপর আধিপত্য বিস্তারের মাত্রার মাধ্যমে। । প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষ তার নিজেকে প্রকৃতির বহির্ভূত হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। এনলাইটেনমেন্টের যৌক্তিকতা নিজেকে পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।যান্ত্রিক যৌক্তিকতার আধিপত্যশীল ভূমিকার কারণেই এনলাইটেনমেন্ট প্রক্রিয়ার এ অবস্থান তৈরি হয়।প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রনে মাধ্যমে ব্যক্তি কর্তা হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের ফলাফল সমস্ত মানব অস্তিত্বকে ক্রমশ হুমকির দিকে নিয়ে যায়।যান্ত্রিক যৌক্তিকতার মাধ্যমে সেই কৃত্রিম বিপর্যয়কে স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা চালানো হয়। এডোর্নো এবং হরখেইমারের মতে এনলাইটেনমেন্টের এ প্রবণতার কারণে তা মিথে পরিণত হয়েছে। তাদের ভাষায় ‘মিথ ইতিমধ্যেই এনলাইটেনমেন্টে পরিণত হয়েছে; এবং এনলাইটেনমেন্ট মিথোলজির দিকে ফিরে গেছে’।

এই অর্থে এনলাইটেনমেন্ট মিথের সম্প্রসারণ। এনলাইটেনমেন্ট মানব জাতিকে পরিবেশ থেকে মুক্ত করতে চায়, মিথ থেকে নয়। মিথের কাজও একই। পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করা।আধুনিক ‘সেল্ফ’ এর ধারণা মিথিক অতীত থেকে নেওয়া।মিথের ক্ষেত্রে ‘সেল্ফ’ তন্ত্রসাধানা, যাদুবিদ্যাসহ অতিপ্রাকৃিত বিষয়কে ব্যবহার করে প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়,আধুনিক ‘সেল্ফের’ অভিপ্রায়ও একইরকম।সে বৈজ্ঞানিক সূত্রকে ব্যবহার করে প্রকৃতিকে নিজের দখলে নিয়ে আসতে চায়। মিথকে ব্যবহার করেই প্রগতিশীল সমাজের বিকাশ ঘটে।এই সমাজ মিথ ও প্রগতিকে বাইনারি অপজিশন হিসেবে উপস্থাপন করলেও সমাজ কাঠামোর মূলে ছিলো কাল্পনিক কতৃত্ব।কাল্পনিক কতৃত্বকে ইউরোপীয় সমাজ দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করে আসে।এর ফলস্বরূপ পরবর্তীতে ইউরোপে কতৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠে।মিথোলজির কেন্দ্রে যেভাবে আধিপত্য কাজ করে এনলাইটেনমেন্টের ক্ষেত্রেও একই বিষয় কাজ করে।এনলাইটেনমেন্ট একইসাথে যুক্তি এবং আধিপত্য কথা বলে।যৌক্তিক কাঠামোর মধ্যে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তি, পরিবেশ ও সমাজের আধিপত্যশীল সম্পর্ক তৈরিতে প্ররোচিত করে। এনলাইটেনমেন্ট যে যুক্তির কথা বলে সেটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন।কিন্তু সে ভিন্নতাকে খারিজ করে একক যৌক্তিক কাঠামোর মধ্যে সবাইকে নিয়ে আসতে চায়। এর ফলে এনলাইটেনমেন্টের যৌক্তিক কাঠামো মিথে পরিণত হয়।মিথ, এনলাইটেনমেন্ট ও পরিবেশের উপর কতৃত্বের প্রবণতা একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত হতে থাকে।এভাবে প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তারের ধারণা মানব সমাজে প্রকটভাবে  প্রবেশ।যার ফলে উপনিবেশিত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ সাথে প্রকৃতিকেও নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া একইসাথে চলতে থাকে।

 

২) উপনিবেশের কেন্দ্রস্থলে সমুদ্র

পৃথিবী পৃষ্ঠের অধিকাংশ এলাকাজুড়েই সমুদ্র বাস্তুতন্ত্রের অবস্থান। সমুদ্র হচ্ছে আমাদের গ্রহ ও মানব দশা রক্ষার্থে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান । সমুদ্র জীববৈচিত্রকে ধারণের মাধ্যমে বাস্তুতন্ত্রকে সক্রিয় রাখে। সজীব ও স্বাস্থ্যকর সমুদ্রের উপর আমাদের প্রকৃত অস্তিত্ব নির্ভরশীল।সমুদ্রের জীববৈচিত্রের উপর আমাদের সুস্থ জীবনের সংযুক্ত রয়েছে। সমুদ্রে প্লাঙ্কটন (Plankton) এর মতো আণুবীক্ষণিক জীবও অক্সিজেনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।সমুদ্র বাস্তুসংস্থান হচ্ছে অক্সিজেনের প্রধান সরবরাহকারী। কোটি কোটি বছর ধরে পর্যায়ক্রমে তৈরি হয়েছে সমুদ্র জগতের বাস্তুতন্ত্র।মহসাগরসমূহের উপকূলবর্তী এলাকায় দীর্ঘ সময়ের বিবর্তনে গড়ে উঠে বিশাল প্রবাল সাম্রাজ্য। সমুদ্রে বাস্তুসংস্থানে মানব প্রজাতির হস্তক্ষেপের পূর্বে তার জীববৈচিত্র এতো জটিলতাযুক্ত ছিলোনা। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সমুদ্রে পাড়ি দিচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্য ও বসবাসের লক্ষ্যে।পর্যায়ক্রমে মানব প্রজাতি হস্তক্ষেপ ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে সমুদ্র ব্যবস্থা ও বাস্তুসংস্থানের রূপায়ণ ঘটে।প্লাইস্টোসিন ও হলোসিন পর্যায় পরবর্তী সময়ে সমুদ্রে জীবনে মানুষের প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পশ্চিমা সভ্যতা যখন তাদের উপনিবেশের বিস্তার ঘটায় তার কেন্দ্রস্থল হিসেবে ছিলো সমুদ্র। উপনিবেশ বিস্তারের মাধ্যমে সমুদ্রকে জয় করার প্রবণতা শুরু হয়।সমুদ্রকে কেন্দ্র করে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার উত্থান ঘটে। এসময় বৃহত্তর সমুদ্রসমূহ উন্মুক্ত হতে শুরু করে।পৃথিবী পৃষ্ঠে সবচেয়ে বেশি থাকা সমুদ্র বাস্তুতন্ত্র ইউরোপের অধীনস্থ  হতে থাকে। উপনিবেশের বিস্তৃতির ধারাবাহিকতাই সমুদ্র নিয়ন্ত্রণে আইন প্রচলন শুরু হয়।সমুদ্র বিজয় ও নতুন নতুন জলপথ আবিষ্কারের পাশাপাশি প্রাণ-প্রকৃতির বিভিন্ন রহস্য উন্মোচন এবং তাকে বিভিন্ন সূত্রে সংঘবদ্ধের ব্যাপারে পশ্চিমারা আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর ফলে নতুন নতুন প্রাকৃতিক  বিজ্ঞানের উদ্ভব ঘটে । ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যেগুলো বিকাশ, নতুন নতুন ভূমি ও জলপথ আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই জ্যোর্তিবিজ্ঞান, উদ্ভিদ ও প্রাণীবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো সুসংঘবদ্ধ হতে শুরু করে৷ বিশাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য নতুন নতুন জাহাজ  তৈরি, ঔপনিবেশিক আফ্রিকা বা আমেরিকান দেশগুলো থেকে খনিজ পদার্থ উত্তোলন, এগুলোর জন্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিকাশের বিষয়টি অপরিহার্য ছিলো। জ্ঞানতত্ত্ব বিকাশের ফলে ইউরোপ তখন শুধুমাত্র সাম্রাজ্য হিসেবে নয় অধিকন্তু একটি  মানসিকতা ও চিন্তার ক্যাটাগরি হিসেবে হাজির হলো।এসময় সমুদ্র অভিযানের  একপর্যায়ে আবির্ভাব ঘটলো চার্লস ডারউইনের। ‘বিগল’ নামের জাহাজে পাঁচ বছরের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ও বৈচিত্র পরিবেশের সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের জন্ম দেন।

এসময় নৌচালন বিদ্যা ও মৎস আহরণের কৌশলের নবরূপান্তর  ঘটে ।মানব জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপ সমস্ত প্রাকৃতিক সমাজকে অধিগ্রহণ ও ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করে।   সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলীয় বাস্তুসংস্থানের হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে নতুন এক মাত্রা লাভ করে৷ নতুন নতুন দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার এবং এতে বিপুল সংখ্যক জনসাধারণের অভিগমন সমুদ্রের জীবক্রিয়া ও উপকূলবর্তীতে অঞ্চলকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।সেখানকার উদ্ভিদকুল এবং প্রাণীকুলের বিশাল সম্পদকে নিয়ন্ত্রণের অধিকারও ঔপনিবেশিক শক্তি লাভ করে। বৈশ্বিক ইতিহাস ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদ সমুদ্র জীবনের সাথে বিশেষভাবে সংযুক্ত হতে শুরু করে। আর এভাবেই সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলবর্তী বাস্তুসংস্থানের তাৎপর্যপূর্ণভাবে পরিবর্তন ঘটে। উপনিবেশায়নের সূচনাতে সমুদ্র ছিলো সবার জন্য উন্মুক্ত। সমুদ্র বাস্তুসংস্থান থেকে মাছ, লবণ, মুক্তা ইত্যাদি বিষয়  সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রত্যেক রাষ্ট্রের সমান সুযোগ ছিলো। পরবর্তীতে সমুদ্র শাসন ও তার সম্পদের ভোগ দখলের প্রতিযোগিতা জটিল হতে শুরু করে।

ভারতে ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ইউরোপের ছড়িয়ে পড়া ও সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করার প্রবণতা বিশ্বায়নের ব্যাপ্তির সূচনা।উপনিবেশের বিস্তার হচ্ছে বিশ্বায়ন নামক ক্যাটাগরির বিস্তার।কার্ল স্মিথের মতে ষোল শতকের পূর্বে এ গ্রহের মানুষের বৈশ্বিক প্রত্যয় সম্পর্কে কোন ধারণা ছিলো না।এসময় বৈশ্বিক ধারণার বিষয়টি ক্রমশ কাঠামোবদ্ধ রূপ লাভ করে।  দীপেশ চক্রবর্তী এ বিশ্বায়নের ইতিহাস নির্মিত হওয়ার পিছনে সাম্রাজ্য, পুঁজি ও প্রযুক্তির বিস্তারের যৌক্তিকতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। এ বিশ্বায়ন মানবকেন্দ্রিক মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস।বিশ্বায়নের মাধ্যমে  মানব রাজ্য খুবই কৌশলগতভাবে  ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছিল।

ইউরোপ বা ঔপনিবেশিক শক্তির এভাবে সাগরে বিচরণের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন প্রকারের মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির সংস্পর্শে আসা শুরু হয়।ইউরোপ মুনাফার লাভের পাশাপাশি নান্দনিক উপভোগের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের ব্যাপারে আগ্রহশীল হয়ে ওঠে।ষোড়শ শতকে ফ্রান্সিস ব্যাকন তাঁর লেখা একটি নাটকে একজন জ্ঞানী শাসককে চারটি স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করার কথা বলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো বাগান। এ বাগান তৈরি হবে উদ্ভিদ এবং  বৈচিত্র প্রাণীর সমন্বয়ে। বিরল ও বৈচিত্র প্রজাতির পশু পাখিদের খাঁচায় সংরক্ষণ করে রাখা হবে৷ বাগানের সাথে সংযুক্ত থাকবে মিঠা পানি ও লবণাক্ত পানির দুটি জলাশয়। উক্ত দুটি জলাশয়ে বিচিত্র প্রজাতির মৎস সংরক্ষণ করে রাখে হবে৷ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বৈচিত্র প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণের মাধ্যমে আভিজাত্য ও নান্দনিকতাকে লালন করার কার্যক্রম ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন হতে থাকে। এ সময় আধুনিক অ্যাকোয়ারিয়ামের ধারণা ও ব্যবস্থাপনার বিকাশ ঘটে। ১৮৫০ এর দশকে ইংল্যান্ডে আধুনিক অ্যাকোয়ারিয়াম ব্যবস্থাপনার উদ্ভব ঘটে। শোভাবর্ধক হিসেবে অ্যাকোয়ারিয়ামের ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ১৮৫৫ সালে ফিলিপ এইচ ঘোস তাঁর Handbook to the Marine Aquarium বইয়ে সমুদ্র থেকে মৎস আহরণ ও তা সংরক্ষণের পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ১৮৫৩ সালে ঘোসের সহযোগিতায় লন্ডনে প্রথম পাবলিক অ্যাকোয়ারিয়াম তৈরি করা হয় । পরবর্তীতে ইউরোপ এবং আমেরিকায় বিপুল সংখ্যক পাবলিক অ্যাকোয়ারিয়াম তৈরি করা হয়।১০ উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের স্থানান্তর ও শোভাবর্ধন জন্য তাদের প্রদর্শনের লক্ষ্যে আধুনিক বিশ্ব ক্রমশ বৃহত্তর চিড়িয়াখানায় পরিণত হয়।প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি মানুষের এরূপ নান্দনিক আগ্রহ ও মনোভাব প্রকৃতি থেকে আরো বিচ্ছিন্ন করেছে। এই মনোভাব পৃথিবীর সবকিছুর প্রতি মানুষের ভোগ ও উপভোগের আত্মঘাতী চরিত্রকে চিহ্নিত করে। বাণিজ্যিকভাবে তৈরি মৎস খামার বা বাগান স্থানীয় মৌলিক বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মাধ্যমে পরিবেশ বিপর্যয়ের মাত্রা  ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে তুলছে।

 

২.১) উপনিবেশায়ন ও বঙ্গোপসাগর

ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক দিক থেকে বাংলাদেশ শুধু নদীমাতৃক দেশ নয় , সমুদ্র সংলগ্ন দেশও। ব্রক্ষপুত্র, বরাক ও গঙ্গা নদী মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। মিঠা পানির পর্যাপ্ততার কারণে বঙ্গোপসাগর উপকূলে বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাস্থলে পরিণত হয়। ঔপনিবেশিক শাসকরা বঙ্গোপসাগরের নৌশক্তির প্রাচুর্য ও ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থেকেই এ অঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থানকে বিশেষ বিবেচনায় নেয়।বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক প্রাকৃতিক প্রাচুর্য ও প্রাকৃতিক গতিপথকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ঔপনিবেশিক শাসকরা কলকাতা নামক নগরীর পত্তন ঘটিয়ে সেখানে তাদের রাজধানী স্থাপন করে।ব্রিটিশ শাসনামলে বঙ্গোপসাগর ছিলো অর্থনৈতিক কেন্দ্রিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ব্রিটিশদের সহযোগিতায় সমুদ্র বাণিজ্যের বৈশিষ্ট্যসূচক প্রসারের ফলে বাংলায় নতুন বানিয়া শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে।বানিয়া শ্রেণীর স্থানীয় বাজার সম্পর্কিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই ব্রিটিশরা তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে। বানিয়া শ্রেণীরা ছিলো ইউরোপীয় ও দেশীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যকার অন্যতম যোগসূত্র।পারস্পরিক স্বার্থ সমৃদ্ধির ফলে বানিয়া শ্রেণীদের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ব্রিটিশ শাসকরা বানিয়াদের বুদ্ধি, শ্রম ও সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে এশীয় বাণিজ্যে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির বিস্তার ঘটায়। সমুদ্র অঞ্চলের লবণ ব্যবসাকে বানিয়া ও ব্রিটিশ শ্রেণীর লোকেরা তাদের একক আধিপত্যে নিয়ে আসে।১৮৩০ এর দশক থেকে ব্রিটিশ-ভারতের এজেন্সি হাউজ যে ব্যবসায়ীক কার্যক্রম শুরু করে তার পিছনে তিনজন বানিয়া ও তাদের কোম্পানির ভূমিকা ছিলো উল্লেখযোগ্য। তারা হলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর,রুস্তমজী কোয়াসজী ও মতিলাল ঠাকুর।বানিয়া ও ব্রিটিশ শাসকরা তখন বাষ্পচালিত মালবাহী জাহাজ, নীলশিল্প, বাষ্পচালিত নৌঁকা ও রেলপথ নির্মাণের মতো বিভিন্ন প্রকল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করে।১১ পুরো ঔপনিবেশিক শাসনজুড়ে ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও এখানকার বানিয়া শ্রেণীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপথ গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা পালন করেছে।তাদের কাজে বঙ্গোপসাগর ছিলো পুঁজি বিকাশের নিছক এক মাধ্যম যার কোন জীবতাত্ত্বিক সত্তা নেই।

বঙ্গোপসাগরের উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের বাস্তুতান্ত্রিক সম্পর্ক এখানকার জলবায়ুকে সবসময় প্রভাবিত করে চলছে। এ বঙ্গোপসাগরের সাথে সাইক্লোন ও সুন্দরবনের দীর্ঘকালের তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।সাগরের বা উপসাগরের বাস্তুতন্ত্রের সাথে বনভূমির বাস্তুতন্ত্রের যে মিথোজীবী সম্পর্ক রয়েছে তার একটি উদাহরণ হচ্ছে সুন্দরবন এবং বঙ্গোপসাগর।বঙ্গোপসাগরের জোয়ার- ভাটার ফলেই সুন্দরবনের উপকূলীয় বনাঞ্চল তার সজীবতাকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম৷

১৮৪৮ হেনরি পিডিংটন নামক ব্রিটিশ নাবিক কলকাতায় থাকাকালীন সাইক্লোন শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। তিনি বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় নিয়ে বিশেষভাবে গবেষণা করেন। ব্রিটিশ শাসনামলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাইক্লোন হচ্ছে ১৮৭৬ সালের সাইক্লোন।এতে প্রায় দুই লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে  এবং এক লাখ লোক দুর্যোগ পরবর্তী মহামারী এবং দুর্ভিক্ষে মারা যায়।১২ বেঞ্জামিন কিংসবারি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এটি নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয় বরং এর পিছনে মানুষের কিছু কার্যক্রম অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো অর্থনীতিকেন্দ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নির্মমভাবে বৃক্ষ নিধন।বিশেষত সুন্দরবন খুবই দমনমূলকভাবে এর আওতায় ছিলো। সুন্দরবনের প্রতি ব্রিটিশ শাসকের যে দৃষ্টিভঙ্গি তা ছিলো ‘উন্নয়নকেন্দ্রিক’।১৩ এ উন্নয়নকেন্দ্রিক ধারণার ফলে ব্রিটিশ শাসকরা সুন্দরবন এলাকায় কৃষিক্ষেত্রের বিস্তার ঘটায়।তাদের ধারণা ছিলো উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা এখানকার সমুদ্র, বন ও ভূমি বাস্তুসংস্থানের প্রাচুর্যকে দক্ষভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম। সুন্দরবনে চাষাবাদের লক্ষ্যে বিস্তৃত এলাকায় বৃক্ষনিধন করা হয়।১৪ এর প্রভাব পড়ে ১৮৭৬ সালের ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাসে। যে জলোচ্ছ্বাস দ্বারা সমুদ্র উপকূলবর্তী মানব-প্রকৃতি ভীষণভাবে আক্রান্ত হয়। গৃহপালিত পশু, বিপুল শস্য, বৃক্ষ ও সুন্দরবনের বনাঞ্চল এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অনেক মানুষ জলোচ্ছ্বাস পরবর্তী অনাহারে মারা যায়। তবে এ ব্যাপারে কেন্দ্রিক শাসকদের সাড়াদান খুব বেশি আন্তরিক ছিলোনা।কেন্দ্রিক শাসনকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার স্থানীয় পরামর্শকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।যার ফলে তখন উত্তর-পশ্চিম বঙ্গে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।১৫

ব্রিটিশ শাসনামলপূর্ব ও তার সূচনায় সমুদ্র উপকূলের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পেশা ছিলো লবণ চাষ।সমুদ্র উপকূলের মৌলঙ্গি সম্প্রদায় লবণ চাষের   বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।ব্রিটিশ শাসকরা সর্বপ্রথম এ সম্প্রদায়ের লবণ চাষের অধিকার কেড়ে নেয়।লবণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে স্থানীয় অনেক জনগণ সমুদ্র উপকূল ও বসতবাড়ি ত্যাগ করে অন্যত্র গমণ করে।১৬ ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলের সাথে ইউরোপের  লবণ বাণিজ্যের সূচনা ঘটে। একপর্যায়ে ব্রিটিশ শাসকরা লবণকে তাদের চূড়ান্ত দখলে নিয়ে আসে। এর ফলে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে লবণ অমান্য আন্দোলনের সূচনা ঘটে৷ ঔপনিবেশিক শাসনামলে মৎস আহরণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকীকরণ বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় অধিবাসীরা প্রয়োজনীয় মৎস আহরণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হত থাকেন। মৎসজীবীদের আয় ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়।

 

২.২) বঙ্গোপসাগরে পুঁজিকেন্দ্রিক উন্নয়ন

মোট আটটি দেশের সীমানার সাথে বঙ্গোপসাগরের সীমানা রয়েছে। প্রায় দুইশত মিলিয়ন লোক বঙ্গোপসাগরের উপকূলে বাস করে, যাদের অধিকাংশই মৎস আহরণের উপর নির্ভরশীল।১৭

পুঁজিকেন্দ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরে মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এখানকার জীববৈচিত্রের ব্যাপকভাবে অবনতি ঘটছে৷এ অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে বঙ্গোপসাগরের বাস্তুতন্ত্রের যে খাদ্য শৃঙ্খলা রয়েছে তার অবনতি ঘটছে৷ ডলফিন,হাঙ্গর, সমুদ্র সাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাণিসমূহ বিলুপ্তির সম্মুখীন। একসময় বঙ্গোপসাগরে ২৭ প্রজাতির হাঙ্গরের উপস্থিতি থাকলেও বর্তমান সময়ে অনেক প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটেছে৷ এর কারণ বঙ্গোপসাগর থেকে বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে হাঙ্গর আহরণ করা। মূলত বাণিজ্যিকভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, বরগুনা জেলার সমুদ্র উপকূলে থেকে এসব হাঙ্গর শিকার করা হতো। বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে প্রায় ৬০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে আবিষ্কৃত হয়েছে ‘ডেড জুন’। এখানে অক্সিজেন,নাইট্রোজেন জলজ প্রাণের অস্তিত্ব খুবই নগন্য।আয়তনে এটি প্রায় বাংলাদেশের অর্ধেকের সমান।প্রাকৃতিক ও প্রধানত মানুষের বিভিন্ন কার্যক্রমের ফলে এ ‘ডেড জোন’ ক্রমশ তৈরি হয়েছে।১৮ এ ‘ডেড জোন’ সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের গভীর বিপর্যয়ের চিত্রকেই তুলে ধরে। রাসায়নিক সারের পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ বঙ্গোপসাগরের বাস্তুসংস্থানের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হচ্ছে।১৯

বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে সমুদ্র অর্থনীতির এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করা হয়েছে। সমুদ্র অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে টেকসই উন্নয়নের কথা বলা হয়।এই টেকসই উন্নয়নের ধারণা তৈরি হয়েছে মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন ধারণা থেকে, ধরিত্রকেন্দ্রিক উন্নয়ন ধারণা থেকে নেয়৷অর্থাৎ যখন সমুদ্র অর্থনীতির বিশাল সম্ভাবনাকে বিশ্লেষণ করা হয় তখন মানুষের সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশলই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।মানুষের সাথে সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের সম্পর্ক এখানে মুখ্য নয়। এই উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে গ্লোবকেন্দ্রিক।

দিপেশ  চক্রবর্তীর মতে হানা আরেন্টই বিশেষভাবে টেকসই বিষয়টিকে জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন।২০ তাঁর দৃষ্টিতে এটি হচ্ছে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা।আরেন্ট তাঁর লেখায় টেকসই পৃথিবী নিয়ে তাঁর আশঙ্কার কথা আলোচনা করেন।টেকসই আমাদের তাৎক্ষণিক যাপিত জীবনের সুবিধার পাশাপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মের সুযোগ সুবিধার ব্যাপারে বিশেষভাবে সচেতন।জাতিসংঘের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রথম এই সংজ্ঞাটিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু করে। তবে টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ধরিত্রীর চেয়ে মানবকেন্দ্রিকতার বিষয়টিই প্রবলভাবে বিদ্যমান।

প্রাকৃতিক প্রাচুর্য ও ভৌগোলিক পরিবেশকে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অধিগ্রহণ করে বন্টন ও ভোগ করার মধ্যে কোন ধরণের  টেকসই উন্নয়নকে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ক্ষমতাচর্চা ও পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচ্যুত হয়ে পরিবেশের সাথে যখন মানুষের সম্পর্ক পারস্পারিক সহযোগিতা,  নির্ভরশীলতার ও উপকারিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠে সেখানেই প্রাণ-বৈচিত্র বজায় থাকে।

বঙ্গোপসাগরের সাথে উপকূলীয় অঞ্চলের জনসাধারণের রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক ।সমুদ্রের প্রাকৃতিক নিরাপত্তার উপর তাদের জীবনধারণের নিরাপত্তা নির্ভরশীল। সমুদ্রের বালিয়াড়িতে যেসব মিউন্দ্যার জন্ম হয় এগুলোকে স্থানীয় অধিবাসীরা জ্বরের প্রতিষেধক ও খাবারের রুচিবর্ধক হিসেবে ব্যবহার করে।২১ সমুদ্র অববাহিকা ও তার তীরের অবস্থান উল্লেখযোগ্য কৃষি চাষের সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এখানকার কৃষি জমিগুলোতে শহুরে লবণ কোম্পানিগুলোর দখলের ফলে জনজীবন ও পেশার ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটছে। একসময় যেসব এলাকার জমিগুলো চাষাবাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো এখন তা লবণের মাঠে পরিণত হয়েছে। এই ধরণের কর্পোরেট লবণ বাণিজ্য স্থানীয়দের খাদ্য সুরক্ষাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে৷২২

বঙ্গোপসাগর উপকূলে যেসব জেলেরা বাস করে তাদের জলদাস হিসেবে অভিহিত করা হয়। সমুদ্র থেকে মৎস আহরণ করাই তাদের একমাত্র অবলম্বন।নৌকা, জালসহ বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক খরচের জন্য তাদের মহাজনের কাজ থেকে উচ্চ সুদে  ঋণ নিতে হয়।এভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঋণ নেওয়ার ফলে জেলেদের অর্থনৈতিক অবস্থার কোন ধরণের  উন্নতি হচ্ছেনা।২৩ সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই তাদের জীবন যাপন।বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলা হয় তাতে জলদাসদের সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের কোন গুরুত্ব বহন করে না। এ জলদাসদের সাথে সামুদ্রিক পরিবেশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, সমুদ্র বাস্তুতন্ত্রের সাথে মানুষের সম্পর্ক গড়ার বিষয়টি তারা নিবিড়ভাবে লালন করে।

 

৩) পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে অ্যানথ্রোপোসিন যুগ

মানবপ্রজাতির নতুন এক যুগে প্রবেশের কথা বলছেন ভূতাত্ত্বিকরা। তারা এর নাম দিয়েছেন অ্যানথ্রোপোসিন যুগ।প্লাইস্টোসিন ও  হলোসিন যুগ পার হয়ে মানবপ্রজাতি এ যুগে প্রবেশ করেছে।ভূতাত্ত্বিকদের মতে ১৯৫০ এর দশক থেকে এ যুগের সূচনা হয়েছে। এ যুগে পরিবেশের উপর মানুষের সবোর্চ্চ প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।অ্যানথ্রোপোসিন ধারণাটি পরিবেশের ওপর মানুষের  প্রভাবশালী আচরণের প্রতি মনযোগ দিতে সাহায্য করে।২৪ যে প্রভাবের ফলে সাগর পৃষ্ঠের উচ্চতা ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।পরিবেশের উপর মানুষের অসংযত ও অনিয়ন্ত্রিত প্রভাবের ফলাফল হচ্ছে এটি। সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের এপোক্যালিপটিকাল পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা বরাবরই স্মৃতিবিভ্রমে ভুগি। এপোক্যালিপটিক পরিস্থিতিকে আংশিকভাবে উপস্থাপন করা, অস্বীকার করা, তাকে এড়িয়ে যাওয়া বা ভুলে যাওয়ার কৌশলগত তৎপরতাই বাস্তুতান্ত্রিক স্মৃতিবিভ্রম। পরিবেশের ন্যায্যতার বিষয়টি শুধুমাত্র উন্নত, উন্নয়নশীল; ধনী, দরিদ্র মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় অধিকন্তু এটি জীবিত ও অনাগত প্রজন্মের সাথে সংযুক্ত।

ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা যখন কোন একটি ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানকে উপস্থাপন করেন (প্রধান সাগর ও মহাসাগরের ক্ষেত্রে) তখন তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে সেখানকার প্রাকৃতিক অবস্থান ও  সম্পদের উপর।এগুলোকে কিভাবে দখল করে চূড়ান্তভাবে মানব ব্যবহারের উপযোগী করা যায় তাই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সমুদ্রকেন্দ্রিক ভৌগলিক অবস্থানকে মহিমান্বিত করা ও প্রাকৃতিক সম্পদের চূড়ান্ত উপভোগের মধ্যেই তাদের বিচার বিশ্লেষণ সীমাবদ্ধ। তারা সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণের যে প্রক্রিয়া বাতলে দেন তা একান্তই সমুদ্রকে জড়বস্তুকরণের প্রক্রিয়া।এ প্রক্রিয়ায় সমুদ্র এক নিষ্ক্রিয় কর্তাসত্তা, যার মধ্যে কোন প্রাণ নেই।এটি শুধুমাত্র মানুষের উন্নয়নের উপায় বা পন্থা।   পশ্চিমা একাডেমিতে ভূ-রাজনীতি বিদ্যা একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে উদ্ভব ঘটে যখন বিশ্বায়নের বিভিন্ন সংকট(বিশ্বযুদ্ধ,সন্ত্রাসবাদ, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব)  দেখা দেয় তখন থেকে।ভূ-রাজনীতি বিদ্যায় হার্টল্যান্ড ও রিমল্যান্ড তত্ত্বের মতো প্রভাবশালী তত্ত্বগুলো তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশ্লেষণে হিসেবে দাবী করা  হলেও যে পরিবেশকে কেন্দ্র করে এর রাজনৈতিক ব্যবস্থা চলমান তার প্রতি কোনধরনের ন্যায়সংগত দৃষ্টিভঙ্গি তাদের নেই। সমুদ্র ও ভূমিকেন্দ্রিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যেই ইতিহাসকে আবদ্ধ রাখাই তাদের লক্ষ্য ।যেনো এর বাইরে সমুদ্রের কোন ইতিহাস নেই৷ সমুদ্রের প্রাণ-প্রকৃতির গতিশীলতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ইতিহাসের কোন অবস্থান নেই এতে। তাদের এ ধরণের ইতিহাসতত্ত্বের উৎস হিসেবে অ্যানথ্রোপোসিন ও ক্যাপিটালোসিন দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে সক্রিয় ছিলো। এ দৃষ্টিভঙ্গি মানবপ্রজাতিকে ধ্বসের দিকে নিয়ে যাওয়ার  আত্মঘাতী প্রবণতা।

নতুন এ ভূতাত্ত্বিক যুগ সমুদ্র বাস্তুসংস্থানেরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়ে যাচ্ছে।বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে দেড় ডিগ্রির তাপমাত্রায় সীমাবদ্ধ না রাখতে সক্ষম হলে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে কোটি কোটি মানুষ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর।  পরিবেশের উষ্ণায়ন ও সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি বঙ্গোপসাগর ও তার উপকূলীয় জীব-জড় সত্তাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে চলছে।জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়গুলো ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে।ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের উপকূলীয় জনসংখ্যার মধ্যে ১০ মিলিয়ন লোক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘর-বাড়ি হারাবে।ঢাকা বা বড় বড় শহরগুলোতে এসব শরনার্থী আশ্রয়গ্রহণ করবে।২৫ এর ফলে বিপুল পরিমাণ লোকের বাসস্থান ও বাস্তুসংস্থানের সাথে এক বিচ্ছেদ ঘটবে।

 

৪) বি-উপনিবেশায়নের প্রয়োজনীয়তা

পরিবেশেবাদী আলোচনা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে অতীতকে আলাদা এবং বিযুক্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ, লিঙ্গবৈষম্য ও পুঁজিবাদ বিকাশের মানব ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার সাথে বর্তমান পরিবেশ উষ্ণতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। উপনিবেশবাদ শুধুমাত্র পুঁজির জয়ের ইতিহাস নয় বরং প্রকৃতিকে উপনিবেশে পরিণত করারও ইতিহাস। এই গ্রহের জীব ও জড় জগতের প্রাকৃতিক সম্পর্ককে ক্রমশ বিনষ্ট করছে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ঔপনিবেশিক কার্যাবলির ধারাবাহিতা।

আমরা সমুদ্র ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রাসঙ্গিকতা ও বাস্তুসংস্থানের ন্যায্যতা বিষয়টিকে এড়িয়ে শুধুমাত্র এমন এক উন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপ করছি যা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নয়। ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার মতো অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণের যে মানসিকতা  তা থেকে বিচ্ছেদায়ন প্রয়োজন। আশঙ্কাজনক ভবিষ্যতকে  সুরক্ষার লক্ষ্যেই আমাদের জীবনযাপনের পদ্ধতি, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন প্রয়োজন।বাস্তুতান্ত্রিক সুরক্ষার জন্য কর্পোরেটতন্ত্র, আমলাতন্ত্রিক জটিলতার ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা থেকে গণতন্ত্র মুক্ত করা প্রয়োজন। বি-উপনিবেশয়ানের প্রথম ও প্রধান প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে মানুষ ও ন-মানুষের সমন্বয়ে আমাদের পরিবেশগত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা পুর্ণপ্রতিষ্ঠা করা৷ দ্বিতীয় প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের বি-উপনিবেশায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতকে টেকসই করে তুলা।কেননা পরিবেশ ধ্বংসের ধারাবাহিকতার মাধ্যমে  আমরা ভবিষ্যত প্রজন্মকে তাদের ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত করছি। তৃতীয়ত পুঁজিকেন্দ্রিক কর্তাসত্তা থেকে মানবমুক্তি ; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আধুনিক,প্রগতিশীল ও রুচিশীল হওয়ার চূড়ান্ত আদর্শবাদি ধারণা থেকে বিচ্যুত করে ধরিত্রকেন্দ্রিক প্রগতি নিশ্চিত করা।

 

৪.১) সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের বি-ঔপনিবেশিক তৎপরতা

সমুদ্র সম্পর্কিত আমাদের জ্ঞান পুঁজিকেন্দ্রিক, মনুষ্যকেন্দ্রিক, ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী উচ্চবিলাসিতা দ্বারা পরিচালিত।তাই রাষ্ট্র কতৃক সমুদ্র ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সমুদ্র আমাদের সামনে প্রাণ-প্রকৃতিহীন এক জড়পদার্থ হিসেবে হাজির হয়। সমুদ্র সম্পর্কিত জ্ঞানতত্ত্বের বি-উপনিবেশয়ানের মাধ্যমেই সমুদ্র ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।ক্রমাগত বাস্তুতান্ত্রিক সহিংসতাকে প্রতিরোধের লক্ষ্যেই নতুন ও উপযুক্ত বাস্তুকেন্দ্রিক জ্ঞানের প্রয়োজন।  দাইহিয়া বেলহাবিব (Dyhia Belhabib) নামক পরিবেশ বিজ্ঞানীর মতে বিউপনিবেশায়নের মাধ্যমে সমুদ্রবিজ্ঞান ও সমুদ্র সংরক্ষণ ভালোভাবে কার্যকর করা সম্ভব।এক্ষেত্রে সমুদ্রের মৎস ব্যবস্থাপনার ঔপনিবেশিক জ্ঞান থেকে বিচ্ছেদায়ন  জরুরি।২৬ প্লাস্টিক দূষণ থেকে সমুদ্রকে রক্ষা করতে হলে এর বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার ও সঠিক ব্যবস্থাপনার  উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।

পরিবেশবান্ধব শিপ রিসাইক্লিং শিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাস্তবিক ও কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সমুদ্র ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমুদ্র স্বাস্থ্য, জীব বৈচিত্র রক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা কেন্দ্রে থাকবে। সুমদ্র ব্যবস্থাপনাকে উচ্চ বিলাসী ও আত্মঘাতী পরিকল্পনার হাত থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।যেখানে স্থানীয় জনসাধারণের জীবিকা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে৷

বঙ্গোপসাগরের যে উপকূলীয় জেলেরা রয়েছে তাদের চিরায়ত জ্ঞানকে সমুদ্র বাস্তুসংস্থান রক্ষার কাজে লাগানো প্রয়োজন।তাঁরা জানে কোন এলাকায় মাছের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে, কোন সময় মাছ ডিম দেয়। পাশাপাশি তাদের জীবন ও জীবিকা সবোর্চ্চ নিরাপত্তা দিতে হবে। সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা লক্ষ্যেই ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতার কেন্দ্রিয় ব্যবস্থাপনা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিকেন্দ্রীয় ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ঢাকা শহর বড় বড় শহরগুলোতে অভিবাসীদের চাপ সামলাতে অভিবাসী-বান্ধব শহর তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।  অভিবাসীদের জন্য আবাসন নির্মাণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সুবিধা, স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে আমলে নিয়েই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে৷এক্ষেত্রে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ,প্রকৌশলী থেকে শুরু করে জনসাধারণের অভিজ্ঞতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

 

উপসংহার

সমুদ্র জগতের সাথে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্পের যেভাবে পরিচয় ঘটে এবং তাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় তা খুবই একরৈখিক। সমুদ্র বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে সমুদ্রের প্রতি আমাদের যে আধিপত্যশীল মনোভাব রয়েছে তা পরিবর্তনের প্রয়োজন।সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের সাথে মানুষের সম্পর্ক পারস্পরিক নির্ভরশীলতার। সমুদ্রের প্রতি আধিপত্যশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও তাকে কেন্দ্র ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনৈতিক-অর্থনীতি মানব প্রজাতি বা ধরিত্রীর জন্য কোন সুফল বয়ে নিয়ে আসবে না। বরং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জলবায়ু পরিবর্তন, জৈববৈচিত্র,জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার উপর।পুঁজিকেন্দ্রিক সমুদ্র অর্থনীতির ফলে ইতিমধ্যেই সমুদ্রের খাদ্য শৃঙ্খলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের বিলুপ্তি সমুদ্র বাস্তুতন্ত্রকে গভীর ও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।

সমুদ্র বাস্তুসংস্থানের সাথে আমাদের নতুন এক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে যেখানে সমুদ্র কোন নিষ্ক্রিয় কর্তাসত্তা হিসেবে নয় বরং সমুদ্র সেখানে  সক্রিয়, প্রভাবশালী, প্রাণ-বৈচিত্রের কর্তাসত্তা। রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা,পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির পাশাপাশি, পরিবেশকেন্দ্রিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা গড়ে তুলতে হবে।যেখানে প্রকৃতিকে সমাজ থেকে এবং মানুষকে অন্যান্য প্রজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা অপর করে দেখার সুযোগ থাকবে না। মানব সমাজকে প্রকৃতি একটি বর্ধিত রূপ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।পরিবেশেকেন্দ্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাও চর্চার মাধ্যমে প্রকৃতভাবে বাস্তুসংস্থানের মুক্তি সম্ভব।

 

 

তথ্যসূত্র

১) Edited by Emmanuel Chukwudi Eze, Race and the Enlightenment: A Reader,Blackwell Publishers Inc,UK, 1997, p.29 [David Hume, “Negroes . . . naturally inferior to the whites” b. Edinburgh, 26 April 1711;d. Edinburgh, 25 August 1776]

২)Max Horkheimer and Theodor W.Adorno,Dialectic of Enlightenment Philosophical Fragment, Translated by Edmund Jephcott, 2002, p.125

৩)Ibid, Page XVI

৪)Editor: Richard K. F. Unsworth,The Future of the Oceans Past: Towards a Global Marine,Seagrass Ecosystem Research Group, Swansea University, United Kingdom,July 2014 Volume 9 Issue 7 p.2

www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4079652/

৫)Carl Schmitt,The Nomos of the Earth in the International Law of the Jus Publicum Europaeum, Translated and Annotated by G. L. Ulmen , Telos Press Publishing, New York 2006, p.352

৬)Ibid, p.351

৭)Dipesh Chakrabarty, The Climate of History in a Planetary Age, The University of Chicago Press Chicago and London, 2021, p.58

৮)Edited by Vernon N. Kisling, Jr.Zoo and Aquarium History Ancient Animal Collections to Zoological Garden,New York, 2001, p. 30

৯)Ibid, p.40

১০)Ibid, p.41

১১)মুর্শিদা বিনতে রহমান, বাংলার বানিয়া, উউত্তরাধিকার, বাংলা একাডেমি, ফাল্গুন ১৪২৫- চৈত্র ১৪২৫, পৃ.৭৪

১২)Benjamin Kingsbury, An Imperial Disaster: The Bengal Cyclone of 1876, Oxford University Press,2018, p.xiii

১৩)Ibid, p.29

১৪)Ibid,p.32

১৫)Ibid,p.82

১৬)পাভেল পার্থ, নিম্নবর্গের সমুদ্র-জিজ্ঞাসা: বাংলাদেশের সমুদ্র প্রতিবেশ, বৈচিত্র্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে এক নিম্নবর্গীয় বয়ান,প্রতিচিন্তা,December 04,2017

১৭)Amitav Ghosh and Aaron Savio Lobo,Bay of Bengal: depleted fish stocks and huge dead zone signal tipping point, The Guardian,Tue 31 Jan 2017 www.google.com/amp/s/amp.theguardian.com/environment/2017/jan/31/bay-bengal-depleted-fish-stocks-pollution-climate-change-migration

১৮)Ibid

১৯)ইফতেখার মাহমুদ,বঙ্গোপসাগরে ৩০০ ধরনের প্লাস্টিক পণ্য, দিনে ৭৩ হাজার টন,প্রথম আলো, নভেম্বর ৩০, ২০১৯

২০)Dipesh Chakrabarty, Ibid, p.81

২১)প্রতিচিন্তা, প্রাগুক্ত

২২)প্রাগুক্ত

২৩)রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর,জলদাস কি জলদাসই থেকে যাবে,প্রথম আলো, জুন ৮, ২০২১

২৪)Dipesh Chakrabarty, Anthropocene Time,

History and Theory Volume 57, Issue 1 p. 5-32, Wiley Online library, Published: 09 March 2018

onlinelibrary.wiley.com/doi/full/10.1111/hith.12044

২৫)By Hadriana Lowenkron,Bangladesh Offers a Model for Climate Migration,18 June 2021www.bloomberg.com/news/articles/2021-06-18/bangladesh-offers-a-model-for-climate-migration?fbclid=IwAR2vNtO9JRA2FsfcnlzLwrwm7BFafgt1w7quLWeG5KUdmJt7ZojJF8G7nFo

২৬)Dyhia Belhabib, Ocean Science and Advocacy  Work  Better  When  Decolonized,Nature Ecology & Evolution volume 5, p. 709–710 (2021),Published: 12 May 2021.

www.nature.com/articles/s41559-021-01477-1#:~:text=Ocean%20conservation%20is%20needed%20within%20various%20and%20complex%20contexts.&text=With%20an%20attitude%20that%20some,simply%20to%20stop%20eating%20fish.

 

 

 

 

 

 

 

 

More Posts From this Author:

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top