সামাজিক বিজ্ঞানের দর্শন

গ্রিক দার্শনিকদের একটি স্কুলের মতে পরিবর্তনই জগতের নিয়ম। তাই কেউ  একই নদীতে দুবার স্নান করতে পারে না। কেন পারে না? কারণ—কাল। কাল স্থানের ভেতর  দিয়ে নিয়ত বহমান। কালের ধর্ম গতি আর স্থানের স্থিতি। এই দুইয়ে মিলে স্থান-কালের ধর্ম গতিশীল কোনোকিছু। কিন্তু পরিবর্তনই যদি জগতের নিয়ম হয় তাহলে একবার পরিবর্তিত কোনোকিছুর আবার নতুন করে পরিবর্তিত হওয়ার অর্থ কি? না-কি পরিবর্তনশীলতার মাঝে এমন কিছু থাকে যা তেমন পরিবর্তিত হয় না, তাই একবার পরিবর্তিত হলেও পরবর্তীকালে তার পরিবর্তিত হওয়া সমভাবে প্রাসঙ্গিক। এই ‘লিগ্যাল ফিলসফি’র একটি উৎকৃষ্ট পরীক্ষাগার আমাদের সমাজ। সমাজকে ভিত্তি করে যে বিজ্ঞানের উদ্ভব তার দর্শন আমাদের আলোচ্য বিষয়।

 

দর্শন ও বিজ্ঞান হচ্ছে মানুষের অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধির অভিব্যক্তি। উভয়ের অন্তর্নিহিত উৎস মানুষ। এদিক দিয়ে দর্শনও বিজ্ঞানের গঠনমূলক প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবান্বিত। আমাদের জ্ঞানপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন বিষয় (Subject Matter) যেমন  আছে, তেমনি আছে বিষয়বস্তুর ভিন্নতা। কোনো বিষয়ের মূল আলোচ্য বিষয় ‘মানুষ’ আবার কোনো বিষয়ের ‘বস্তু’। এই জগৎ ও  তার সমুদয় নিয়েই বিশ্বজগৎ। মানুষ তার যুক্তি, বুদ্ধি, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির সমন্বয়ে বিশ্বজগৎকে মানবজগতে (Anthropocentic World) পরিণত করেছে। অবশ্য মানবজগৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনো কোনো জ্ঞান অধিকতর সু-সংঘবদ্ধ। এই সু-সংঘবদ্ধতা ও বিষয়বস্তুর আলোকে বিজ্ঞানকে প্রাকৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি অভিধায় বিভক্ত করা যায়। বিস্তৃতি, প্রসার ও সাফল্যের নিরিখে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে অন্যান্য বিজ্ঞান থেকে পৃথক করে দেখবার  একটি প্রবণতা আছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হয়ে উঠতে হলে তাকে অভিন্ন বৈশিষ্ট্য মেনে চলতে  হয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সঙ্গে অন্যান্য বিজ্ঞানের পার্থক্য পদ্ধতিগত নয়, বরং প্রয়োগ-কৌশল সংশ্লিষ্ট। আর এক্ষেত্রে দর্শনের ভূমিকা হচ্ছে বিজ্ঞানের পথ নির্দেশ করা, মূল্যায়ন করা এবং একই সঙ্গে তার নিজের বিষয়বস্তুরও মূল্যায়ন করা। তাছাড়া দর্শন বিভিন্ন বিজ্ঞানের প্রকৃতি, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা করে।

 

অভিজ্ঞতাভিত্তিক তথ্যের (Factual Information) সঙ্গে যৌক্তিক বা বৌদ্ধিক তথ্য ও সত্যের সংযোগ স্থাপনই বিজ্ঞান। যে বিজ্ঞান এই  সংযোগ যত সফলভাবে স্থাপন করতে সক্ষম সে তত কার্যকর। যেকোনো কার্যকর বিজ্ঞানে প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে যৌক্তিক বাস্তবতার (Logical Reality) সফল সংযোগ অনিবার্য। এই অনিবার্যতার ফলেই সেখানে কার্যকারণগত সংযোগ (Casual Connection) ও যৌক্তিক সংযোগের (Logical Connection) মাঝে ব্যবধান ন্যূনতম। যেখানে ব্যবধান যত ন্যূন সেখানে বিজ্ঞান তত কার্যকর।

 

প্রকৃতি সমরূপ আচরণ করলেই কেবল প্রাকৃতিক বিজ্ঞান কার্যকর থাকে। যদি প্রকৃতি সমরূপ আচরণ না করে তাহলে পদার্থ কিংবা রসায়নবিদ্যার কোনো সূত্রই কার্যকর থাকবে না। সাধারণভাবে অতিক্ষুদ্র জগৎ (Subatomic World) ব্যতীত প্রকৃতি সচরাচর সমরূপ আচরণ করে। তাই পদার্থ বিজ্ঞান কিংবা রসায়ন বিজ্ঞানের সূত্র এত কার্যকর। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে?

 

সামাজিক বিজ্ঞানের একদম কেন্দ্রে হচ্ছে মানুষ—তথা তার আচার-আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক, প্রথা, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে তাদের ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো তো প্রকৃতির মতো সমরূপ আচরণ করে না। সকালে অফিসে যাওয়ার তাগিদ না থাকলে  শীতের সকালে ঘুম থেকে ওঠার কল্পনা প্রায় অবান্তর। কিন্তু তাই বলে একদমই যে কেউ উঠবে না তা হলফ করে বলা যায় না। এজন্য মানবীয় আচরণের ওপর ভিত্তি করে যে বিজ্ঞান গড়ে ওঠে তার কার্যকারিতা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সূত্রের মতো হয় না। কিন্তু তাই বলে বসে থাকলে চলবে না। নিরন্তর চেষ্টা চালাতে হবে এর  কার্যকারিতা উন্নয়নে।

 

সাধারণত বিজ্ঞানের Theory গঠিত হয় কিভাবে? প্রথমে যেকোনো বিষয় কিংবা Topics-এর ওপর একটি Theory করা হয়, তারপর তাকে সাধারণীকরণ করে সূত্র তৈরি করা হয়। প্রয়োজন কিংবা উপযোগিতার নিরিখে তাকে Hypothetico Deductive প্রক্রিয়ার মাধ্যমে Theory-র মর্যাদা দেওয়া হয়। কিন্তু এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞান অনুমোদিত যেকোনো Hypotheses-কে পরীক্ষণযোগ্য হতে হবে। পরীক্ষার পরে পরীক্ষিত বিষয়বস্তুর ভুল কিংবা নির্ভুলতার মাত্রা কিংবা পরিমাণ পরিমাপ করতে হবে। যদি ক্ষেত্রবিশেষে পরীক্ষণ উপকরণ ও উপায়ের সীমাবদ্ধতা থাকে তাহলে অন্ততপক্ষে নীতিগত পরীক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। যেমন: মঙ্গল গ্রহে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব আছে কি-না পরীক্ষা করার মতো উপকরণ ও উপায়ের সীমাবদ্ধতার জন্য এইরূপ একটি নীতিগত পরীক্ষণ পরিকল্পনা করা যায় , পৃথিবী হতে মঙ্গলের দূরত্ব এত। তাই পৃথিবী হতে মঙ্গলে একটি লেজার রশ্মি পাঠাতে হলে তার ঐ দূরত্ব অতিক্রমের সক্ষমতা থাকতে হবে। তারপর প্রতিফলিত রশ্মির প্রকৃতি দেখে আমরা… ইত্যাদি, ইত্যাদি। কিন্তু অমুক স্থানে একটি ভূত আছে এই বাক্যের যথার্থতা নিরূপণের জন্য পরীক্ষণ পরিচালনা তো অনেক দূরের কথা পরীক্ষণ নকশাই প্রণয়ন করা যায় না। এজন্য এই ধরনের Hypotheses বিজ্ঞানের আওতা-বহির্ভূত। তাই ‘ডিমার্কেশন থিওরি’র মতো বিষয়গুলোকে অর্থপূর্ণ মনে করলে সে ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর বিজ্ঞানের জ্ঞানকাণ্ড নির্মাণে সচেষ্ট হওয়া শ্রেয়।

 

কেতাবি ভাষায় বললে বলতে হয়, আমাদের অবশ্যই Natural Phenomena এবং Logical Phenomena-র মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সক্ষম হতে হবে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস হচ্ছে, ভাষার নির্দিষ্ট কোনো অর্থ না থাকলেও (অর্থাৎ সে কোনো বিষয় বা ঘটনাকে উপস্থাপন করে মাত্র) সে ক্ষেত্রবিশেষে ঘটনা-অতিরিক্ত সত্যের আরোপ ঘটাতে সক্ষম। ফলে অভিজ্ঞ ও দক্ষ বিজ্ঞানীদেরও (অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজ বিজ্ঞানী) প্রকৃতিক এবং যৌক্তিক  Phenomena-র মধ্যে পার্থক্য করতে কষ্ট হয়। এমনকি দার্শনিকরা পর্যন্ত অনেক সময় এই Fallacy সফলভাবে অতিক্রম করতে সক্ষম হন না, যেমন; হেগেলের মত: What is rational is actual, what is actual is rational. কিন্তু যৌক্তিক হলেই তা বাস্তব হবে কিংবা বাস্তব হলেই তা যৌক্তিক হবে এমন কথা কি হলফ করে বলা যায়? বিশেষ করে দর্শনেরর পদ্ধতি(Epistemelog) মেনে?

 

তাছাড়া প্রত্যেক সমাজবিজ্ঞানীই তাঁর ব্যক্তিগত মতাদর্শ দ্বারা কম-বেশি নিয়ন্ত্রিত। তাই দর্শনের পরিভাষায় বলা যায় Ethics ও Congnition-এর মিশ্রণ ঘটিয়ে একজন বিজ্ঞানী Cognitionকে Ethics দ্বারা ম্যানুপুলেট করে ফেলতে পারেন। অর্থাৎ সামাজিক বাস্তবতার নির্মোহ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তিনি নিজের মনের রঙে সামাজিক ঘটনাকে দেখতে পারেন। পারেন তাঁর ব্যক্তিক বা সামষ্টিক ইচ্ছা-অভিরুচি অনুযায়ী (কিন্তু তাঁর নিজের অনিচ্ছায়) ঘটনা বয়ান করতে, সমস্যা সমাধান করতে বা পথ বাতলাতে।

 

সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে জরুরি তা হল, একটি অর্থপূর্ণ Operational Definition তৈরি করা। কোনো বিষয় কিংবা ঘটনা সম্পর্কে একেক জনের একেক মত, পথ থাকতে পারে। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু একজন সমাজবিজ্ঞানীকে সর্বপ্রথম একটা Operational Definition তৈরি করতে হবে। তারপর একটি পরীক্ষণযোগ্য Hypothesis দিতে হবে। এর আলোকে সে Prediction-যোগ্যতা অর্জন করবে। যদি একটি আপাত স্বাধীন পরিবর্তনের সঙ্গে আরেকটি পরিবর্তনে এই Prediction কাজে লাগে কিংবা মিলে যায় তাহলে বলতে হবে Casual Relation-এর ওপর তিনি Predictability অর্জন করেছেন। অন্যথায় তাঁর এই অনুমানযোগ্যতা হবে যৌক্তিক অনুমান। অবশ্য দুইটি অধীন পরিবর্তনের ওপর যে অনুমান তা অবশ্যই যৌক্তিক বা বৌদ্ধিক। সামাজিক বিজ্ঞানে পদ্ধতিগতভাবে আহরিত তথ্য-উপাত্ত হবে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তথ্য-উপাত্তের তুলনায় অধিক জটিল এবং তারা পরস্পরের সাথে আভ্যন্তরীণভাবে যুক্ত থাকবে। এইরূপ আভ্যন্তরীণভাবে যুক্ত থাকা তথ্য-উপাত্ত আবার বহিস্থঃভাবে প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত বা ঘটনার (Natural Phenomena, Fact, Data) সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

 

যদি তথ্য-উপাত্তগুলো এভাবে যুক্ত না থাকে তাহলে যেকোনো ঘটনার বিশ্লেষণ হবে অতিসরলীকরণ প্রবণতাযুক্ত, আংশিক কিংবা খণ্ডিত। যেমন : আমাদের অবশ্যই মনে করা উচিত না যে, কোনো জীবের শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়েই আমরা তার মানসিক বৈশিষ্ট্যকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হব। কিংবা আমাদের এটা মনে করারও তেমন কোনো কারণ নেই , অধিক অর্থ উপার্জনের নিশ্চয়তা একজন লোককে অধিক আধুনিকমনস্ক মানুষে পরিণত করবে।

 

একজন দক্ষ সমাজবিজ্ঞানীকে অবশ্যই মনে রাখতে  হবে, ক্ষেত্রবিশেষে Premise ভুল হলেও যুক্তির মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। যেমন: সকল বিড়াল ঘেউ ঘেউ করে। কুকুরগুলো হচ্ছে বিড়াল। অতএব, কিছু কুকুর  ঘেউ ঘেউ করে। উপরের Premise ভুল। কিন্তু এই Premise-গুলোর ওপর যুক্তিকে সঠিকভাবে প্রয়োগের ফলে যে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে তা কিন্তু সঠিক। কিন্তু সিদ্ধান্ত ভুল হলে এক বা একাধিক Premise ভুল হতে বাধ্য। তাই একজন সমাজবিজ্ঞানীকে অভিজ্ঞতার নিরিখেই দেখতে হবে কোনো বিড়াল ঘেউ ঘেউ করে কি না, কিংবা কখনো কুকুর বিড়াল হতে পারে কি না। অর্থাৎ তার Hypotheses অবশ্যই Verify-যোগ্য কিংবা নিদেনপক্ষে Falsify-যোগ্য হতে হবে। এবং তার ব্যবহৃত Premise-গুলোর সত্যতা অভিজ্ঞতার নিরিখে নিরূপিত হতে হবে, বুদ্ধির আলোকে নয়।

 

সাম্প্রতিক সময়ে এটা প্রায় মেনেই নেওয়া হয়েছে , সামাজিক বিজ্ঞান সম্ভব। শুধুমাত্র Operational Definition-এর মাধ্যমে নয় বিজ্ঞানের জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতির (Epistemology of Science) আলোকেই সমাজবিজ্ঞান কঠিন হলেও সম্ভব। কিন্তু গোল বেধেছে সমাজবিজ্ঞান মূল্যবোধ-মুক্ত না যুক্ত তাই নিয়ে।

 

মূল্যবোধ-মুক্ত সমাজবিজ্ঞানের পক্ষের লোকেরা বলেন, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান মানুষের কর্মকাণ্ড ‘নিয়ন্ত্রণের’ উদ্দেশ্য পরিচালিত। আর সমাজবিজ্ঞানে তা ‘মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে পরিচালিত’। তাদের মতে মূল্যের যথার্থতা জ্ঞানের নয় বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান ‘মূল্য’ অনুসন্ধানে ব্যস্ত, তাই ভবিষ্যতের জন্য তা কোনো আদর্শ নির্ধারণ করে না। অতএব, সমাজ বিজ্ঞান মূল্য-নিরপেক্ষ।

 

আর মূল্যবোধ-যুক্ত সমাজবিজ্ঞানের পক্ষের লোকের বক্তব্য, তাঁদের বিরোধীরা বিজ্ঞানকে ‘পদ্ধতিগত সন্দেহ’ দ্বারা সীমায়িত করে বলেন বিজ্ঞান মূল্য-নিরপেক্ষ জ্ঞানের বিষয়। তাঁরা ‘পদ্ধতি’ ও ‘প্রয়োগকৌশ’ শব্দ দুটির অর্থ সঠিক ভাবে হৃদয়ঙ্গম করেননি। তাছাড়া কোনো বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণও একধরনের মূল্যকে  স্বীকৃতি দেওয়া ইত্যাদি, ইত্যাদি…।

 

কোনো বিজ্ঞানী যখন কোনো প্রকল্প গ্রহণ বা বর্জন করেন তখন একধরনের নৈতিকতার অধীনে থেকেই তা করেন। একজন বিজ্ঞানী বা কোনো সংস্থা এমন প্রকল্প নিশ্চয়ই গ্রহণ করবেন না যা বাস্তবায়ন করার মতো আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সামর্থ্য তাঁদের নেই। এর অন্যথা হলে তাকে নৈতিক বলা যাবে না। কিন্তু ব্যক্তি বিজ্ঞানীর নৈতিকতাকে বিজ্ঞানের নৈতিকতা বলা সঙ্গত নয়। তাছাড়া দার্শনিকভাবে নৃত্যশিল্পী থেকে নাচকে পৃথক না করা গেলেও কবিতা থেকে কবিকে পৃথক করা যায়, ঠিক তেমনি, বিজ্ঞানকেও বিজ্ঞানী থেকে পৃথক করা সম্ভব।উপরন্তু একজন Natural Person-এর ওপর নৈতিকতা যেভাবে ক্রিয়াশীল Legal Person-এর ওপর তা নয়।

 

আমাদের অতিদ্রুত সরলীকরণের প্রবণতা থেকে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাই  মানুষের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ অর্থাৎ মানুষ-কেন্দ্রিক যে কোনো আলোচনা, তা প্রাকৃতিক বা সামাজিক যে বিজ্ঞানই হোক না কেন, মূল্যবোধ সন্নিবেশিত। কিন্তু এতে ব্যক্তি বিজ্ঞানীর মূল্যবোধ তার চর্চার বিষয়বস্তুতে আরোপ করা হয়। ফলে আমরা দেখি বিভিন্ন পেশাজীবী সমাজে অসহনীয় মাত্রায় বিভাজন এবং তাদের অধীত জ্ঞান কিংবা বিষয়ে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

 

প্রকৃত প্রস্তাবে একজন সমাজবিজ্ঞানীকে দেখতে হবে Hypothetico Deductive প্রক্রিয়ায় তিনি যে তত্ত্ব প্রদান করছেন তা অভিজ্ঞতার সাপেক্ষে যাচাইযোগ্য  কি-না। যাচাইযোগ্য হলে তা অভিজ্ঞতার সাপেক্ষে বাস্তবতার সঙ্গে কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ। তাঁকে অবশ্যই তাঁর অধীত বিষয়ের নিয়ম এবং কৌশলকে তাঁর কর্মে প্রয়োগ করতে হবে। তাঁর ব্যক্তিগত নীতি কিংবা আদর্শকে নয়। এই প্রক্রিয়ায় তিনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন তার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে যথোপযুক্ত রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের ওপর।

 

অনেকে মনে করেন সামাজিক বিজ্ঞান সম্ভব নয়। তাঁদের মতে মানবিক আচরণের কোনো সমরূপতা ও নির্দিষ্ট পরম্পরা নেই। তাছাড়া মানুষ সাধারণত কতগুলো নিয়ম দ্বারা বাহ্যত পরিচালিত হয়। আর স্থানভেদে নিয়মের ভেদ ও তার কার্যকারিতার রকমফের অনিবার্য। তাই মানবীয় আচরণের সর্বজনগ্রাহ্য কোনো সাধারণীকরণ সম্ভব নয়।

 

এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ভাবাদর্শ এবং মতাদর্শ। যেখানে নির্মোহ নৈর্ব্যক্তিকতার চাইতে বিশ্বাস ও ভাবাবেগ বড়। মানুষের প্রত্যেকটি কর্ম, আচার-আচরণ ইত্যাদি তার ঐতিহাসিক, সামাজিক ও শ্রেণিগত অবস্থান থেকে নিরূপিত হয়। অবশ্য Weber, Manheim প্রমুখরা মনে করেন মানুষ তার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার (Political Commitment) বাইরে সচরাচর যায় না।

 

সবকিছু মিলিয়ে এই মতাদর্শের অনুসারীরা বলতে চান সামাজিক বিজ্ঞানের অধীন  বিষয়ের (Subject Matter) ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’ সম্ভব নয়, যা বিজ্ঞানে অতি-অবশ্যই কাম্য।

 

যারা এইরূপ মনে করে তারা কার্যত তাদের ব্যক্তিগত ‘মানসিক চাওয়া’কে বিষয়ের ওপর আরোপ করেন। যদিও তারা বিষয়ের সীমাবদ্ধতার প্রতি ইঙ্গিত করেই তাদের বক্তব্য উপস্থাপনে সচেষ্ট। কিন্তু তাদের মানসিক চাওয়ার দরুনই তাঁরা এইরূপ কৌশলী কার্য সম্পাদন করে থাকেন। মন সবসময় চায় পরিতৃপ্তি লাভ করতে। মানবমন অন্য সব প্রাণির ওপর বৈজ্ঞানিকের ক্রিয়াকাণ্ডে তেমন আপত্তি উত্থাপন না করলেও নিজের ক্ষেত্রে বেঁকে বসে। তার অহং আহত বোধ করে। সে বলতে চায় মানবিক আচরণ ও কার্যকলাপের নৈর্ব্যক্তিক ব্যাখ্যা হাজির হয়ে গেলে তার সাথে যন্ত্রের মৌলিক তফাত থাকবে না, ইত্যাদি, ইত্যাদি…।

 

কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে—অর্ধসত্য, অসত্য এমনকি মিথ্যার প্রভাবেও মানবমন পরিতৃপ্তি লাভ করতে পারে। আমরা সাধারণভাবে ‘বিবেক’ বলতে যা বুঝি তারও সীমাবদ্ধতা আছে। সে ভাবাবেগমিশ্রিত। মানসিকভাবে পরিতৃপ্তি লাভ করা এক কথা আর বৈজ্ঞানিকের অনুসন্ধান পদ্ধতি, প্রবণতা, প্রয়োগকৌশল ইত্যাদি অন্য কথা। বিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের প্রথা, পদ্ধতি দ্বারা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করাই উত্তম। তাহলে সে তার পরিসর বৃদ্ধি করে নিজস্ব মৌলিক সমস্যা ও তাত্ত্বিক বিষয়কে প্রয়োগের ব্যাপারে অধিকতর মনোনিবেশ করতে পারবে।

 

মানবীয় আচরণ পুরোপুরি না হলেও অংশত ব্যাখ্যাযোগ্য। ১৮শ শতকের ইংরেজ দার্শনিক হিউমের(১৭১১-১৭৭৯ খ্রি.) A Treatise of Human Nature মানবীয় আচরণের অভিজ্ঞতাবাদী ব্যাখ্যার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিক ইউরোপের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গড়ে ওঠার পেছনে হিউমের এই প্রয়াসকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া কোনো সত্তার (Natural কিংবা Legal) শুধুমাত্র কর্মকে বিবেচনায় নিয়েও পদ্ধতিগত জ্ঞান চর্চা সম্ভব। যেমন: কোনো গাড়ি কিংবা ক্যালকুলেটর কিভাবে তৈরি হয় বা সচল থাকে তা না জেনেও এদেরকে ব্যবহার করে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় কাজ সারাতে পারি।

 

মানবীয় আচরণের ব্যাখ্যাত অংশের ওপর দাঁড়িয়ে  বিজ্ঞান কাজ করলে তা হবে বাস্তবঘনিষ্ঠ। আর ব্যাখ্যাত অংশটুকুর সাঙ্গে সঙ্গে অব্যাখ্যাত অংশকে নিয়েও যদি কোনো বিজ্ঞান কাজ করতে চায় তাহলে সেখানে Realism-এর সঙ্গে Operationalism-এরও মিশ্রণ থাকবে। সমগ্রের পরিচয় খণ্ডের মধ্যে না পাওয়া গেলেও খণ্ডের জ্ঞান না থাকলে সমগ্রকে চেনা যাবে না। বিজ্ঞান তো খণ্ডের সমন্বয়ে সমগ্রকে অনুসন্ধানের, অনুধাবনের একটি কার্যকর পদ্ধতি বৈ অন্য কিছু নয়।

 

 

সহায়ক রচনা/ গ্রন্থপঞ্জি

  1. Weber, M., The Methodology of Social Sciences, Tr. E.A. Shills and H. A. Finch, New York : The Free Press. 1949.
  2. Hodges, H. A., The Separarist Case : Basic Contrasts between the Social and Natural Sciences in L. I. Kimerman (ed.), The Nature and Scope of Social Science : A Critical Anthology, New York Appleton Century Crofes.
  3. R. K. Merton, Social Theory and Social Structure, rev. ed., Free Press, Chicago, 1957.

 

 

Ahmed Lipu is an author. The topic of interest in Philosophy. Published Books: Byaktikotay Nyorbyaktik(2011), Darshan(2017), Byakto : Bibidho Phenomena’r Darshonik Parzalochona(2018), Yugolsandhi : Muldhara-Bikalpodhara(2019)

 

If you want to start obesity treatment, yet the cost of Duromine 15 mg seems to be high, order this anti-obesity medication online. Many online pharmacies in Australia offer Duromine 15 mg capsules at a price affordable to the buyer. revatio 20 mg Duromine 15 mg is a safe medication that is tolerated by the body well, provides a feeling of satiety for a long time and helps to control appetite.

More Posts From this Author:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top