আমিও ইচ্ছেমতো জ্বালাই নেভাই তার চোখ

Share this:

 

কে কাঁদে, কে গো

কলকাকলিত দ্বিধামুকুলিত একটি বায়স।

কঁকিয়ে উঠল কাক। কাশফুলে রক্তের ছিটে। টুপিয়ে টুপিয়ে নামে লোহিতের জল। ডাস্টবিনে ডাস্টবিনে এসেছে নতুন কুঁড়ি। ফুটে উঠছে ক্রান্তির ফুল।

ওই ফুলে শরীর সাজাও সখী, এ-শরীর পণ্যবাজার, ঝিলিমিলি আলো। নখরা লেখার আগে মেতে ওঠো নাথনি ভাঙায়।

পোড়োবাড়ির ভেতর ফিসফিস করছে চাঙড়, পুরোনো ইটের দল মেতে ওঠে শ্লোগানে শ্লোগানে। তারা সব মিছিলের মুখ। হাঁয়ের ভেতর থেকে ঝলসে উঠছে মশাল। পেট্রোল বাজারে যাব, শুষে খাব গতির মহিমা। ছ্যাকরা গাড়ির এক জিরজিরে ঘোড়া, সে-ও বায়না করে, করছে বাহানা। হাঁকাও চাবুক। মুছে যাক ঘোড়া, খড়ের বাছুর এনে জুতে দাও গাভীটির বাঁটে।

মাঝে মাঝে ভাবি, হেমন্তে এবার আমি চলে যাব শুকনো নদীর খাতে, তাঁবুতে বসত করে কুড়োব রঙিন। মাঝরাতে হঠাৎ চমকে যাব একা শেয়ালির চিৎকারে।

কে কাঁদে, কে, কে কে ওই মাঝরাতে কেঁপে ওঠে, মাঝরাতে ভেঙে পড়ে কান্নায়!

 

ঘর

মানচিত্র ভরে যাচ্ছে হাড়ের স্তূপে
আমি নই, বই-ই আমাকে পড়ে
ভিজে যায় শাদা পৃষ্ঠা শোণিত-প্রপাতে

স্নান হয় খুব খুব

ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে দেখি মোচার স্তবক
অন্ধকার সারা ঘর
প্রদীপ বসেছে একা পিলসুজে
এ-ঘরে আছড়ে পড়ে সাগর
এ-ঘরে আছড়ে পড়ে পাহাড়
ধেয়ে আসে পাঙাশ রঙের মথ
লোহার ডানায় ভর করে
আজরাইল এসেছে ঘরে
এসবই গল্পগাছা, ভাবতেই পার
শুধু গল্পগাছটির ডালে পাখি-শব
করে রব
করে রব
করে রব

 

নক্ষত্রবাজার

পকেটে শূন্যতা ভরে চলে যাই নক্ষত্রবাজারে
কুয়োর ভেতর থেকে তুলে আনি পুরনো কলস
মিনাকারি কাজে তার গায়ে বাজে মেঘের দ্যোতনা
রশ্মিজাল জমে আছে মনে
মন হাতড়ে তুলে আনি জমানো পলল
কাননে বাগানে তারা আলোফুল হয়ে ফুটে ছিল
মাছের কাঁটাটি যেন গিটারের তার হয়ে বাজে
তখন আনন্দ ছিল খুব, মাঞ্জা হয়ে লেগে ছিল
সুতোছেঁড়া ঘুড়িটির ছায়ায় ছায়ায়, লেবুফুলে
লেগে ছিল আঙুলের পরম বাসনা, টুসকিতে
পাপড়ি ঝরে যায়। দু-হাতে ধরেছি সব
ধারালো বাটালি দিয়ে ছিলেছি তাদের
পুড়ে যায় প্রজাপতি কোকুন-কফিনে
ভলকে ভলকে ওড়ে ধোঁয়া আর ছাই
নিজেই নিজের ভস্ম মেখে নিই ভাতের থালায়

 

দীপাবলি

রাত নামে, গহিন ভেড়ার লোম ঘিরে।

ও তামস, হে আঁধার, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে শীতফুল। মণিচক্রের থেকে ওংকার, বৃদ্ধ লামার মুখে খাঁজে খাঁজে রাত লেখা, লেখা আছে শীতল আগুন।

গ্যাঁজলা উঠছে, কষ বেয়ে নামছে তিমির। জুম করে দ্যাখো এই রাতের প্রহার। কলসে কলসে তুলে ঢেলে দাও ঘরে, বালিশে তোষকে জমা শীতকে ধুনছে কোন আজব ধুনুরি! আমি দেখি ভলকে ভলকে ওই ছিটকে ছিটকে পড়ে কালো, পেঁজা পেঁজা, রাশি রাশি ভাসছে হাওয়ায়।

রাতের রেসিপি আমি আজও শিখিনি, স্নায়ুতে স্নায়ুতে মাখামাখি, চটকে মাখার আগে কিছুটা গল্পের বীজ, কুচোনো তমিস্রাগোলা জল ঢেলে বেক করে নেব তাকে আমার খুলিতে, এমন রন্ধনপটু হতে আর পারলাম কই!

দীপাবলি রাত এলে প্রদীপে প্রদীপে আমি জ্বেলে দিই অমানিশা…

 

সেদিন আসবে রাত

কাশির দমকে ভেঙে পড়ছে ইট
ইটের পাঁজার থেকে জুলজুল করে সাপ দেখছে আমাকে
উড়ো চুমু ছুড়ে দিয়ে আমাকে চাটতে চায় সাপ
আমিও তাকিয়ে আছি, সাপটিও…
হোক তবে শুভদৃষ্টি
শঙ্খলাগার পরে বঁটিতে টুকরো করি
খুবলে তুলছি ওই চোখ
চামচে চোখের গুলি
কী মজার মার্বেল খেলা
এক-পা এক-পা করে হাঁটি
শখ খুব দৌড় দৌড় দৌড়…
একদিন জিতে যাব রেসে
জকিরা বাহবা দেবে, বলবে সাবাস
কী মোহন আঠায় আমাকে জড়ালে ওগো সাপ
বাঘের গর্জনে দ্যাখো লুকিয়ে বসেছে হাস্কিং মেশিন
ব্যাটারিচালিত বাঘ আমার প্রাণের কাছে
বশ মেনে বসে থাকে
আমিও ইচ্ছেমতো জ্বালাই নেভাই তার চোখ
আর শুধু বান ডাকে, ফুঁসে ওঠে পাহাড়ি নদীর জল
নদীটিকে বেঁধে দেব, তাকেও মানাব বশ
পোষমানা পোষমানা খেলা
আমার ভেতরে জাগে দলপতি, শনশন কুঠার চালায়
‘আমি’টিকে বেঁধে দেব
‘আমি’টিও একদিন পোষমানা কুকুরের মতো দোলাবে লাঙ্গুল
থেমে যাবে সব গরগর
সেদিন ঘুমোতে যাব, সেদিন আসবে রাত এই ঘরে

 

 

প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতা: মজনু শাহ’র কবিতা, আগুন ওড়ায় জাদুকর

তখন ধীরে ধীরে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দিচ্ছে চাঁদ, আর সেই অনচ্ছ আলোয় ফুটে উঠছে তারই শরীরের ক্ষতদাগ। সেই বেপথু জ্যোৎস্নায় এলায়িত পাহাড়ের নিবিড় খাদের ধারে ফুটে উঠছে একটি গুম্ফার ছবি। ছবিতে এক তরুণ শ্রমণ তাঁর থাঙ্কায় এঁকে চলেছেন জটিল অথচ অপরূপ-সব চক্রের ছবি। কখনও কুয়াশার তন্তুতে ঢেকে যাচ্ছে ছবি, কখনও উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে মাখনের প্রদীপের মতো শীতল আলোয়। কবি মজনু শাহ’র ‘বাল্মীকির কুটির’ বইটি পড়তে বসে আমার প্রথমবারের অনুভূতি ঠিক এমনটাই হয়েছিল।

মজনুর কবিতা পড়তে গিয়ে যে-কথাগুলি মনে এসেছে, পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা ও শব্দের অলৌকিক ভুবন—এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই  হলো এ-কবির সবচাইতে বড়ো সম্পদ। তিনি তৈরি করেছেন আধুনিক রূপকথার এক জগৎ। আবার একথাও সত্যি যে, মজনুর কবিতা শুধুমাত্র শব্দের তুলিতে আঁকা সাররিয়্যাল ক্যানভাস নয়। তাঁর লেখার মধ্যে লুকিয়ে আছে দেশ ও বিদেশের পুরাণকথা, লোককাহিনি, রূপকথা, ইতিহাস, সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের জটিল মনস্ত্বত্ত্ব; লুকিয়ে আছে তার নিজস্ব বিপণ্ণতা ও অস্তিত্ত্বের সংকট। আবার ঠান্ডা-নীল-হিম বরফের মাঝখানে  আচমকা ঝলসে ওঠে মেরুজ্যোতি। তাই কবিতাবইয়ের ভূমিকায় অবলীলায় মজনু লেখেন,

‘কাজুবাগানের মধ্যিখানে গাঢ় কোনো ঘুম তোমাকে পায়। পৃথিবী, অতিকায় জিগজ্যাগ পাজল, তার মধ্যে ঘুরছ, থামছ, ঘুরছ…’

আবার, এই সমস্ত দূরারোহ বিষয় তাঁর লেখায় এসেছে খুব প্রচ্ছন্নভাবে, কখনই উচ্চকিতভাবে নয়। মজনু যেন এক আলট্রামেরিন নীল আয়নার ভেতর থেকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন শব্দের বিভা। বহু শব পেরিয়ে তিনি পৌঁছতে চাইছেন একটি শিউলিগাছের কাছে, তাই তাঁর সমস্ত পঙ্‌ক্তি থেকে ক্রমে ফুটে ওঠে এক সন্ত-ড্রাগন। এই সন্ত-ড্রাগনটিই কি মজনু, যিনি একদিকে সুফি দরবেশের মতো নিস্পৃহ, অন্যদিকে নিরন্তর দগ্ধ নিজস্ব আগুনে!

ভূমিকাতে মজনু আক্ষেপ করেছেন, হয়তো বা বক্রোক্তিও বলা যেতে পারে, ‘অজস্র কবিতা লেখা হল পৃথিবীতে, শোনো, আজও তবু এর সার্থক কোনো ম্যানুয়েল নাই।’ কোনো স্বর্গীয় বাণী (Divine commands) থেকে কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলি উৎসারিত হয়, এমন তত্ত্বে  মজনু বিশ্বাস করেন না। বরং এক ‘লৌকিক স্বরপ্রবাহকে’ তিনি কবিতা বলে মনে করেন। একক ঈগলের রাজসিক উড়ানের লীলাই তাঁকে আকৃষ্ট করে।

একজন শিল্পী বা ভাস্কর যখন তাঁর পেইন্টিং বা মূর্তি সৃজনের সময় এক প্রকাণ্ড ঘোরের মধ্যেও ভীষণ সচেতন তাঁর রং ও রেখা সম্পর্কে, ছেনি ও হাতুড়ির প্রতিটি আঘাত সম্পর্কে, মজনুও তেমনই সচেতন তাঁর প্রতিটি শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে। যা কেবল পাঠককে মগ্নই করে না, ভাসিয়ে নিয়ে যায় মহাজাগতিক সমুদ্রের ঢেউয়ে, যেখানে গ্যালাক্সির পর গ্যালাক্সি, যেখানে মিল্কিওয়ের মধ্যে উড়ে যাচ্ছে শব্দকণারা।

‘বাল্মীকির কুটিরে’ যে বইগুলো সংকলিত হয়েছে, সেগুলোর নাম দেখলেই বোঝা যায়, এ-কবি অন্য জাতের, অন্য মানের। ‘আনকা মেঘের জীবনী’, ‘লীলাচূর্ণ’, ‘মধু ও মশলার বনে’, ‘জেব্রামাস্টার’, ‘ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না’, ‘আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া’, ‘বাল্মীকির কুটির’—এই নামগুলো শুধু মুগ্ধই করে না, পাঠককে চমকে দ্যায়, তাড়িত করে।

বেশিরভাগ কবিতাই গদ্যছন্দে বা পয়ারে লিখলেও ছন্দের ক্ষেত্রেও মজনু যে কিছু কম মুন্সিয়ানা দেখাননি, তা মোটেও বলা যাবে না। তাঁর ‘লীলাচূর্ণ’ বইটির সব কবিতাই সনেট-এর আঙ্গিকে লেখা। দু-একটা পঙ্‌ক্তি পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার লোভ আমি সামলাতে পারছি না,

আমাকে নিক্ষেপ করো পৌরাণিক গল্পের অরণ্যে

ওগো রক্তমাখা বীর, কোনো যোনিপুষ্প ঢেকে দিতে
আমাকে বলো না আর, শাদা স্তব্ধ পিয়ানোর কাছে
আমার কবিতা তবু মূর্চ্ছা যেতে যেতে জেগে ওঠে…

অথবা,

রাত্রি মেখে এইখানে পড়ে আছে অর্ধেক পৃথিবী,
আর আমি স্বরচিত নরকের থেকে উঠে এসে
দেখি এক ভণ্ড কবি স্নানসূত্র শেখাচ্ছে দেবীকে…

 

পুরাণকল্প বা ইতিহাস ফিরে ফিরে এসেছে মজনুর কবিতায়। সে তাঁর প্রথম বই ‘আনকা মেঘের জীবনী’ই বলি বা পরবর্তীকালে লেখা বইগুলির কথাই বলি। এবং মিথকে ডি-মিথ, অর্থাৎ পুরাণের কাহিনিকে বিনির্মাণ করে লৌকিক রূপ দেওয়ার এক ঈর্ষণীয় পারদর্শীতা এই কবির লেখায় পাই,

খ্রিস্টের রুটির মতো অমীমাংসিত ওই মেডুসার মাথা (‘আনকা মেঘের জীবনী’)

 

অকল্পনীয় এক তুলনা, স্পর্ধাও বটে, যা কেবল একজন কবিই লিখতে পারেন। খ্রিষ্টের রুটির পরেই এক শাপগ্রস্ত সর্পকেশী দানবীর কথা লিখে ফেলা এক আশ্চর্য জারণক্রিয়া। যে কবির প্রথম বইতেই এমন সব কবিতা পাই, তিনি বাংলা কাব্যসাহিত্যের জগতে শুরু থেকেই এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করবেন, তাতে আর কোনও দ্বিধা থাকে না। আবার দেখি,

… লেডা আর তার হাঁস কেলি করছে দূরে। আমি তবে
এখন পরে নেব গিলগামেশের পোশাক।

 

এরপরই মজনু লেখেন,

                               … লো লোধ্ররেণু, রে অস্তাচল,
জুতো হারানোর পর, কেন যে আমি তমসাতীর তাক করে আছি
ভাষাময়ূরের কাঠামোর দিকে! (‘আনকা মেঘের জীবনী’)

এই যে গ্রিক পুরাণের লেডা ও জিউসের কাহিনিকে, প্রাচীন সুমেরীয়/মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার এক আশ্চর্য চরিত্র গিলগামেশকে মজনু মিশিয়ে দিয়েছেন বর্তমান সময়ের এক কবির বিষাদের সঙ্গে, তা বিস্মিত করে। বিস্মিত করে অনুপ্রাসের ব্যবহার।

আবার ‘ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না’ বইতে মজনু লিখছেন,

 

প্রকৃত ভিক্ষার জন্য নাকি রওনা দিতে হয় আকাশে। পাকদণ্ডী বেয়ে উঠে যেতে যেতে কখন যে তুমি বরাহ অবতার, মনে হবে বুঝি অনাদৃত, কূপিত মনে হতে পারে, তবুও টার্গেট ঐ চূড়া বা চূড়ান্ত নিঃসঙ্গতা।

এভাবে পুরাণের বরাহ অবতার মিশে যান নিঃসঙ্গ কবির সঙ্গে। ওই যে প্রথমেই বলেছিলাম, এত প্রচ্ছন্নভাবে মজনু মিথকে ব্যবহার করেছেন ওঁর লেখায়, এমনকী তন্ত্রসাধনা ও বাউলতত্ত্বও এসেছে অতি সূক্ষ্মভাবে, জল মিশিয়ে ফিকে করে দেওয়া মদিরার মতো,

অচেনা উন্মাদ মৌমাছিরা। কেননা আমার অবচেতনের পুষ্পচিত্রনাট্যের ভিতর, হারাকিরি, তমসা, উজাগর গান ও যৌনভবিষ্যদ্বাণীর ভিতর রয়ে গেছে। অতি ভোগের ভৈরবীচক্র ফুরাবে কবে, না-জানতে পারাটাই অধিক স্মার্ট বিবেচিত এখন! হেঁইয়ো হো সারেং, পারাপার কালে মর্ম কি কেঁপে ওঠে না? বীজ, বীজসাধনের নক্সা বহুদূর পেছনে তপ্ত বালিতে পড়ে থাকে। ও চিত্তহরি, দেখো দেখো আমরা কেউ কেউ ফের কীভাবে সাপের চামড়ার ব্যবসার দিকে তীব্র ঝুঁকে পড়ি।

ছবির পর ছবি, যেন এক সিনে-পোয়েট্রি লিখে চলেছেন মজনু। যেন এক উন্মাদ পরিচালক লেন্সের ওপর ঢেলে দিচ্ছেন তরল কুয়াশা। এ-প্রসঙ্গে আরও বেশি করে মনে হয় তাঁর ‘ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না’ বইটির কথা। যে বইতে মজনু তাঁর ‘আমি’ ও ‘এন্টিআমি’-র এক দীর্ঘ সলিলোকি লিখে গেছেন এক দীর্ঘ কবিতার আঙ্গিকে। দীর্ঘ কবিতাই বা বলি কী করে! এ-বইটিকে আমি কোনও নির্দিষ্ট জঁর-এর আওতায় ফেলতে পারি না। কখনও মনে হয়, এ এক কাব্যোপন্যাস, কখনও কাব্যনাটক, কখনও বা মনে হয়, এ-বইটি এক দীর্ঘ স্বগতোক্তি, প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ, টীকা ও ভাষ্য সম্বলিত রিলিফ ম্যাপের ছবি। আসলে, এক ফর্মা ঝিঁঝিঁডাক, দশ ফর্মা পাখিডানা, চার-ফর্মা নদীবীজ,  গাছের বাকল দিয়ে বাঁধানো এ-বই, সারাদিন সারারাত হিম ঝরে, শাদাপাতা ঝরে।

যখন মজনু লেখেন,

 ঐ হাঁসমুখরিত ফোয়ারাকে বলো। উড়ন্ত সাপ, তাকে থামাও। আর, আর, দুলতে দুলতে মাটিতে মিশবে একটু পরে যে টংঘর, তাকে দূর থেকে আশীর্বাদ কর। তার ভিতর থেকে নোটন নোটন পায়রাগুলো উড়ে যেতে দাও শুধু। প্রশ্নের আলো থেকে পালিয়ে এক স্বপ্নব্যাখ্যাকারী শৃগাল ঢুকে পড়ল তোমার আলখেল্লার ভিতর!

‘সরাইখানায় বসে থাকা তুমিও কি নও আরেক শৃগাল?’

 এ-প্রশ্ন হয়ে ওঠে যে কোনো সংবেদনশীল, সৃষ্টিশীল মানুষের প্রশ্ন, নিজেকে। ‘এই পুতুলের একখানা হাত আর মুণ্ডু কে খুলে নিয়েছে, বলতে পার?’ এ যেন আমাদের সকলের অস্ত্বিত্বের সংকট, আমরা সবাই, মুণ্ডহীন, হাত-পাবিহীন মানুষের সারি। একে একে আরও আরও সব অদ্ভুত দৃশ্যাবলি এসেছে বইটিতে। হাতের সবকটি জাদুতাস মজনু যেন উজাড় করে দিয়েছেন এ-বইতে।

একইসঙ্গে সাহিত্যজগতের সুচতুর আক্রমণ, যা মজনুর কবিতায় হয়ে উঠেছে ব্যক্তিমানুষের প্রতি সমাজের যূথবদ্ধ আক্রমণ, বারবার এসেছে বইটিতে।

কলহমুগ্ধ পাখিরা উড়ে গেলে পর সেদিন এক কাব্যনিন্দুককে দেখেছি, বইপত্রের টিলায় বসে বসে ল্যাজ নাড়ছে।… এখানে প্রথমে মূষিকের সঙ্গে সমস্তরকম সন্ধি, বাহ! কিছু পরে ঐ মূষিককেই ভক্ষণ।

জীবনানন্দ দাশের ‘সমারূঢ়’ কবিতাটি মনে পড়ে যায়, কিন্তু একই সঙ্গে খাদ্যশৃঙ্খলে দুর্বলকে সবলের ভক্ষণের কথা, এমনকী সামাজিক শোষণের কথাও মনে করিয়ে দ্যায়।

বহুকাল ধরে হিম নিসর্গের ভিতর এক ধিঙ্গি শিবলিঙ্গ পড়ে আছে

 হিম, নিসর্গ, শিবলিঙ্গ, কালের প্রবহমানতা এসবের বর্ণনার মাঝখানে ‘ধিঙ্গি’ শব্দটি বসিয়ে দেওয়ার ধক্‌ কিন্তু খুব কম কবিরই আছে। এরকমই আরও কিছু শব্দের ব্যবহার বিস্মিত করে আমাকে,

পানির শান্ত আয়নায় এসে মিশছে সাত আসমানের ঘুম, কখনো-বা, যষ্টিমধু।

 ‘যষ্টিমধু’ শব্দটিকে আপাত প্রক্ষিপ্ত মনে হলেও, আসলে এ আমাদের গভীর অসুখ প্রশমনের প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরও কয়েক পৃষ্ঠা এগিয়ে যাই, দেখি, মজনু লিখেছেন,

আমার ঘরের মধ্যে, এক আগন্তুক এসে বলে, আমি হাসি যেন আমি হত্যা করি। আমি হাসতেই থাকি, হত্যাকাণ্ড ফলে অব্যাহত আছে।

বস্তুত, কারো কারো থাকে গানের বাক্স। গভীর কোনো এক রচয়িতা বসে বসে সেই বাক্সের ভিতর দারুচিনির টুকরো চিবায়…

‘দারুচিনির দেশ কোথায়? স্বপ্নসমাধি কোথায়?’

রক্তবর্ণ সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে হয় সেই দেশে। সেখানে রৌদ্র, ছায়াভূমি, ধূলিঝড়, মুকুলগন্ধ ভরা উঠোন আর আখরোট বাগানের আশ্চর্য মেশামেশি। আর জীবন-মৃত্যুর অবিরাম টরেটক্কা। অজস্র ঘর। কনফেশনবক্স। অজস্র লকআপ। অজস্র লকআপে অজস্র যুবক যুবতীর কাটা মাথা। আর সেই কাটা মাথাগুলো ফুঁড়ে জন্ম নিচ্ছে একেকটা জবাগাছ। একেকটা জবাগাছ একেকটা স্বপ্নমূর্তি। একেকটা স্বপ্ন শেষপর্যন্ত সেখানে না-ফোটা স্বপ্ন বা অসমাপ্ত স্বপ্নযুদ্ধ।

জীবনের আলো-অন্ধকার, কালের ধর্মে লয় ও ক্ষয়ের এক আশ্চর্য বিমূর্ত ছবি এঁকেছেন মজনু এখানে। হাসি আর হাহাকারকে যেন আর আলাদা করা যাচ্ছে না। লিখতে লিখতে তাঁর ছাই হয়ে যাওয়া পরাভাষা উড়তে শুরু করেছে শেষ রাতের বাতাসে… চলে যাচ্ছে দিগন্তরেখার দিকে, কখনও বা কোনও এক মহাকৌতুকের দিকে।

প্রথম থেকেই ছিল, কিন্তু যত দিন গেছে, মজনুর কবিতায় তথাকথিত যুক্তিশৃঙ্খল ভেঙে দেওয়ার প্রবণতা আরও বেশি বেড়ে গেছে। কিন্তু কখনই তা গিমিক বা চমক হয়ে ওঠেনি। বরং এক ধ্রুপদীয়ানার সঙ্গতে তা হয়ে উঠেছে গভীর ব্যঞ্জনাময়। কিছু উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে,

হারামিই যদি হবে, এবার হও সমুদ্র-হারামি। গাবগাছ থেকে নেমে এসো। একজন ধুলোপণ্ডিত সতেরজন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মর্মজঙ্গলে, তাদের পেছন পেছন হাঁটো, হাঁটতে থাকো। আঙুরগুচ্ছ আর মাটিতে হরিণের পদচিহ্ন, শূন্যতার সাপেক্ষে এদের বুঝতে না পার যদি, তোমার জন্যে কমিক্স বই আর সাইকেল সারানোর কাজ অবশিষ্ট রইল। (‘ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না)

ঘাসের স্তবক থেকে পোড়া পঙ্‌ক্তি কুড়োবার কাজ শুরু হয় (‘মধু ও মশলার বনে’)

ঝাউবনে পড়ে আছে বোবাদের অভিধান (“বাগীশ্বরী”, ‘জেব্রামাস্টার’)

সমস্ত কুসুম, ঘাস, পাখি, পাখিব্রত, শিল্পপ্রহার, সবই কি ভালগার!

আমাদের অপরূপ জট খুলে যাবে আয়নাব্যাখ্যায়, চন্দ্রবিন্দু-ঘেরা কোনো গল্পরাক্ষসের আসরে মুক্ত হবে স্বর, সুর, আর সেই রঙের দেবতা, যাকে অযথাই ভয় পেয়েছিলে, ছদ্মকাঠুরে এক, এসেছে ছড়াতে আজ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নভোসংকেত, নীরবে। (“নভোসংকেত”, জেব্রামাস্টার’)

পতঙ্গ পালক পাপ আরও ঘন হয়ে ঘিরে ধরে। কেঁপে ওঠে চুম্বকের বিছানা। (“গদ্যরাণী”, ‘জেব্রামাস্টার’)

সময় শুষে নিয়ে তোমার ঘড়ি দুটো আজ এত নরম হয়েছে। (“গম্বুজের নিজস্ব পাখিরা”, ‘জেব্রামাস্টার’)

আজ হো হো হাসির এক কিংবদন্তী রাস্তায় এসে পড়েছি। ঐ যে দেখতে পাচ্ছ অসীম রক্তথিয়েটার, আমি তার কুশিলব।

সময়, অতিকায় গ্যাসবেলুন, আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়েছে। (‘ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না’)

কোনো কোনো ফুলের মধ্যে মহিয়সী ডাকঘর আছে। (‘আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া’)

 

ইতিহাসের পাতা থেকে শুধু নয়, মজনু তুলে এনেছেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের এক প্রাণীকে তাঁর লেখায়, কিন্তু তারই সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন নিজের অসহায়তা,

সেই কবে, একবার স্বপ্নে, কীভাবে যেন ঢুকে পড়েছিলে
দানব-জগতে।
প্রহরীর মতো দাঁড়িয়েছিল ব্রন্টোসোরাসের মূর্তি এখানে সেখানে।

… বালুতে মুখ গুঁজে রাখা
সেই উটপাখিটিকে কেন তুমি বলতে পার নি—
‘ওঠো, তুমি অপরাধী নও’

এখানেই কবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান পাঠক। কবির বিপণ্ণতা হয়ে ওঠে পাঠকেরও বিপণ্ণতা। পাঠকও হয়ে ওঠেন আয়নার মধ্যে অন্তরীণ এক ক্রৌঞ্চ। লাল এক কাঠের বাক্স ভরে ওঠে ডালিমদানার অবসাদে।

জাদুবাস্তবতার এক আশ্চর্য ভুবন তৈরি করেছেন মজনু শাহ। কিন্তু, তা বিদেশ থেকে আমদানিকৃত জাদুবাস্তবতা নয়। বরং ওঁর লেখা মনে করিয়ে দ্যায় ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় বা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের কথা। আমাদের শিশুকালে মা-ঠাকুমার মুখে শোনা গল্পগুলোর কথা, লোককাহিনির কথা। সেই যে প্রথমেই বলেছিলাম, এক আধুনিক রূপকথার জগৎ গড়ে তুলেছেন মজনু তাঁর লেখায়,

সাত আটটা বনবিড়াল এইমাত্র তোমার বিছানায় উঠে এল, তারা এখন

ছিঁড়ে ফেলবে বালিশ! (“বনবিড়াল”, ‘বাল্মীকির কুটির’)

ট্রান্সপারেন্ট জারের মধ্যে ডুবানো শিশু। সত্তার খুব ধূধূ কোনো অংশে আমার হারিয়ে যাচ্ছে কথা আর বুনোহাঁসগুলো। (“২৬১”, ‘আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া’)

যেসব শিশুজেব্রা পাতা খায় কিন্তু হজমের পর আর পাতার সংখ্যা বলতে পারে না, অংকে-কাঁচা ঐ জেব্রাগুলোই আমার বেতন। (‘জেব্রামাস্টার’)

 মজনুর কবিতার শব্দগুলি, দৃশ্যগুলি যেন বারবার প্রিজমের ভেতর দিয়ে প্রতিসরিত হতে হতে এসেছে, তাই এত বহুবর্ণ পালকের ছটা ঠিকরে ঠিকরে ওঠে। বাংলা কবিতার আবেগ-প্যাচপ্যাচে ধারাটিকে মজনু সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। তা বলে কি ওঁর লেখায় আবেগ বা বেদনার মূর্ছনা নেই? অবশ্যই আছে, কিন্তু তা যেন স্ট্যালাকটাইটের ঝুরি, ঝুলে আছে কবিতার করোটির থেকে, এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে চুঁইয়ে নামছে রক্ত, কিন্তু সে-রক্তের রং হিম শাদা। ওঁর কবিতা পড়ার আরও এক মজা, তা কখনও একঘেয়ে হয়ে ওঠে না, পড়তে গিয়ে ক্লান্তি আসে না, যদিও একেকটি কবিতা গহিন ধোঁয়াশায় মোড়া, বারবার পড়লেও টীকাকার বা তথাকথিত সমালোচকদের মতানুযায়ী কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যায় পৌঁছে দেবেই, সে-কথা বলা মুশকিল। বরং এই যে সম্পূর্ণ না-ছুঁতে পারা, হাতের মুঠোয় নিয়ে তার সবটা নির্যাস নিঙড়ে নিতে না-পারার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মজনুর কবিতার জাদু।

যাপন থেকেই তৈরি হয় একজন কবি বা শিল্পীর মানসলোক। ব্যক্তি মজনুকে চেনা তো দূর-অস্ত, ওঁর জীবন সম্পর্কেও প্রায় কিছুই জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় জীবন ও জীবিকার কারণে বাংলাদেশে জন্ম এবং বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকা, আর পরবর্তীকালে ইতালিতে ফ্লোরিনেটেড পলিমার তৈরির কারখানায় চাকরি নিয়ে চলে-যাওয়া, বাংলার প্রকৃতি, জনজীবন, বহু মানুষের সঙ্গে জীবনের বহুবিধ ঘাত-প্রতিঘাত, ইতালির নৈসর্গিক শোভা, এসবকিছু তাঁর শব্দভাণ্ডার ও দৃষ্টিসীমাকে আরও প্রসারিত ও ঋদ্ধ করে তুলেছে। করে তুলেছে আন্তর্জাতিক, মহাজাগতিক। তিনি যেন এক ঘাসফুল, অবিরত চিঠি পাঠিয়ে  চলেছেন নক্ষত্রের ডাকঘরে। তাই মৃগ নয়, মৃগনাভি ফিরে আসে তাঁর ঘুমে। ইগো এবং অল্টার-ইগোর দ্বন্দ্বে নিয়ত জর্জরিত হন। যেন এক বসন্তবন্দি, প্রতিফলিত হওয়াই যাঁর রম্যনিয়তি।

এরই সঙ্গে এক আশ্চর্য শ্লেষ বা ব্যঙ্গের ঝলক খেলে যায় মজনুর কবিতায়। যা তাঁর লেখাকে আরও আকর্ষক করে তোলে। আসলে ঝঞ্ঝাপ্রমত্ত পৃথিবীতে আমাদের এই বেঁচে থাকাটাই কি একটা আশ্চর্য কৌতুক নয়! আবার, মজনুর লেখায় সমস্ত ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মধ্যেও ঘাপটি মেরে বসে থাকে বিষণ্ণতা, তাই ওঁর কবিতার মধ্যে সুফিয়ালি ভঙ্গিমায় পাতা খসে পড়ে, তাই মজনু লেখেন, ‘মাঝে মাঝে আমার মনটাকে তুলো-ঠাসা মৃত খরগোশের মতো ঠেকে।’

আসলে কবি নিজেও জানেন না, কী বস্তু তাঁকে দিব্যোন্মাদ করে রাখে। আর তিনি লিখে ফেলেন আশ্চর্য সব পঙ্‌ক্তিমালা। বিস্মিত হই, স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি মজনুর শব্দবন্ধ ব্যবহারের অলৌকিকতার কাছে, কল্পচিত্রের কাছে, শব্দভাণ্ডারের বিপুলতার কাছে, ভাষার ওপর ঈর্ষণীয় রকমের নিয়ন্ত্রণের কাছে। কোন শব্দের পর কোন শব্দ বসিয়ে দেবেন মজনু, কীভাবে এক স্বর্গীয় আসবের ঘোরে মগ্ন, মত্ত করে তুলবেন পাঠককে, তা কিছুতেই আগের থেকে অনুমান করা যায় না। যেন ধুতুরার বীজ পিষে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে পাঠকের রক্তে, আর পরম আশ্লেষে পাঠক জড়িয়ে ধরছেন মৃত্যুকে।

 

[উৎস : ‘বাল্মীকির কুটির’, মজনু শাহ; প্রকাশনা: চৈতন্য, একুশে বইমেলা ২০১৮]

 

 

  • More From This Author:

      None Found
  • Support Shuddhashar

    Support our independent work, help us to stay pay-wall free by becoming a patron today.

    Join Patreon

Subscribe to Shuddhashar FreeVoice to receive updates

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!