আমার সমকালের রাজনৈতিক কবিতাগুলো মূলত মসনদের কাছে পরাজিত এবং রুটিন ওয়ার্ক বিপ্লবীর ইশতেহার

Share this:

প্রশ্নোত্তর:

শুদ্ধস্বর: কবিতা লিখতে হবে বা কবিতা লেখার জন্য তাড়না বোধের ব্যাপারটা প্রথম কিভাবে অনুভব (মানসিক অবস্থা, পরিবেশ-প্রতিবেশের সাথে সংশ্লেষ) করতে শুরু করলেন?

মামুন অর রশীদ: লেখালিখির শুরু মফস্বলের শৈশব থেকে। নব্বইয়ের দশকে আমার শৈশব। তিতাস নদীর তীরে বাড়ি। প্রচুর বই পড়তাম, কবিতার ক্যাসেট শুনতাম। ক্লাস এইটে থাকতে একটা পত্রিকা বের করতাম। সেই পত্রিকায় নিজেরা লিখতাম। যেগুলো মূলত বাংলা আবৃত্তির ক্যাসেট থেকে কবিতাগুলোর ইন্সপাইরেশনে লেখা। ক্যাসেট শুনে যার কবিতা ভালো লাগতো, তার কাব্যগ্রন্থ বা রচনাবলি কিনতাম, পড়তাম। প্রথমদিককার লেখায় থাকতো অন্য বিখ্যাতদের ছাপ। বিশেষ করে, নির্মলেন্দু গুণ, জীবনানন্দ দাশ, হেলাল হাফিজ, সুমন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের শব্দাবলি দিয়ে রিপ্রডিউজ করা হতো।

এরপর জাহাঙ্গীরনগর বাংলা বিভাগে ভর্তি হলে শাহবাগকেন্দ্রিক দৌঁড়ঝাপ দেওয়া শুরু হয়। পত্রিকায় ছাপা দেখা অনেক কবির সঙ্গে পরিচয় হয়। লেখালিখির ধরনটাও বদলে যায়।

 

শুদ্ধস্বর: আপনার কবিতার সমসাময়িকতা, রাজনৈতিক বোধ, নিজস্ব ভাষাশৈলির বিষয়গুলো যতটুকু সম্ভব বিস্তারিত ভাবে শুনতে আগ্রহী।

মামুন অর রশীদ: আমি খুব সচেতনভাবে অ্যাপলিটিক্যাল হওয়ার চেষ্টা করেছি, কারণ আমাদের রাজনৈতিক কবিতা বলতে আমরা যা বুঝি মানুষের অধিকার বা ন্যায়বিচারের ভাষ্য থেকে সেগুলো অনেক দূরে। আমার সমকালের রাজনৈতিক কবিতাগুলো মূলত মসনদের কাছে পরাজিত এবং রুটিন ওয়ার্ক বিপ্লবীর ইশতেহার। আমি বিশ্বাস করি, আপনি যতই সত্য বলুন না কেন, তা যদি ক্ষমতার সঙ্গে মার্চ করে তাহলে আপনি মিথ্যা বলছেন। ফলে আমি বাংলাদেশের সোকলড রাজনীতিকে পাশ কাটিয়েছি কবিতার ভাষ্যে। এর একটা আপাত ছোট কারণ হতে পারে, মধ্যবিত্ত হিসেবে পুনর্বাসন চিন্তা আমাকে প্রবলভাবে রাজনীতি সচেতন হতে দেয়নি। কিন্তু অ্যারিস্টটলতো আমাদের স্পষ্ট করেই রাজনৈতিক প্রাণী বলেছিলেন, সেখানে আমিও দ্বিমত করি না। কিন্তু ক্ষমতার মসনদের কাছে নত মানুষদের রাজনৈতিক সচেতনতা দেখে দূর থাকি।

নিজের কাব্যভাষা নিয়ে কথা বলা কঠিন, এ অন্যের মূল্যায়নের বিষয়। তবে অতটুকু বলতে পারি, আমি যে জীবন যাপন করি, যেভাবে কথা বলি, আমার কবিতার ভাষা তা থেকে পৃথক না। তবে ডিকশনারি থেকে খুঁজে নেওয়া কঠিন তৎসম শব্দ; নতুন ট্রেন্ড হিসেবে আরবি, উর্দু শব্দ আমি ব্যবহার করতে চাই না। তবু যোগাযোগের প্রয়োজনে তৎসব, আরবি-উর্দু, ইংরেজি কোনো প্রচলিত শব্দে আমার বিরাগ নেই। মূল উদ্দেশ্য সৌন্দর্য সৃষ্টি করা অথবা প্রতিষ্ঠিত সৌন্দর্য্যে আঘাত দিয়ে  আরেকটা সৌন্দর্য তৈরি করা। মানুষের কাছ থেকে যে কবিতা দূরত্ব তৈরি করে সে কবিতা লিখতে চাই না। আবার লোকরঞ্জনের কবিতাও লিখি না। নিজের কবিতা নিয়ে এর চেয়ে স্পষ্টায়নের সামর্থ্য আমার নেই।

 

শুদ্ধস্বর:  কবিতার শ্লীল অশ্লীল ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আপনার ধারণা ও অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

মামুন অর রশীদ: শ্লীলতা-অশ্লীলতা মূলত কনটেক্সট, পারসপেকটিভের ওপর নির্ভর করে। অধিকাংশ সময় এগুলো  কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যেমন জনসম্মুখে শরীর দেখানোর মান্যতা ইয়োরোপের বা আফগান সমাজে ভিন্ন। কখনো কখনো সময় বা ট্রেন্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, প্রযুক্তি আমাদের বিভিন্ন সমাজের পার্থক্যগুলো মুছে দিচ্ছে। যেমন, টিকটকের একটা ট্রেন্ড বিভিন্ন দেশের মেয়েরা তৈরি করে দেখায়। ধীরে ধীরে মানুষ এগুলো অভ্যস্ত হতে শুরু করে, ব্যক্তিগত পরিসরে হলেও।

অশ্লীলতা আমার কাছে কেবল শারীরিক নয়। এর আরও মাত্রা আছে, কয়েকটি বলছি। একটা নিরীহ প্রাণীকে দৃষ্টিকটুভাবে আঘাত করে তা লাইক পাওয়ার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিওটি আমার কাছে অশ্লীল। বন কেটে সাফারি পার্ক তৈরি করে মাইক বাজিয়ে পিকনিক করা আমার কাছে অশ্লীল। একজন পরিচিত ক্ষমতাবান হবে এমন অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে- তিনি আমার ব্যক্তিগত কাজে লাগতে পারে তাই তাকে শেয়ার দেই, কমেন্ট করি- এমন ভাবনা অশ্লীল। বই প্রকাশের পর পরিচিতদের দিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বই কিনিয়ে তা প্রকাশক বা জনসম্মুখে জনপ্রিয়তার চেষ্টা করা অশ্লীল।

এমন কবিতাও অশ্লীলতা আসতে পারে। টেক্সটের সে ক্ষমতা আছে। সচরাচর নারীর শরীরের বা ইন্টারকোর্সের বিভিন্ন জারগন ব্যবহার হলেই অশ্লীলতা হতে পারে আমি তা মনে করি না। পরিবেশনের কৌশল ও অভিপ্রায়ই বিষয়টি অশ্লীল করতে পারে। অর্থাৎ এটা পুরনো কথা যে, যৌনতা থাকলেই অশ্লীলতা নয়। একথা সত্য, যৌনতা মানুষের সহজাত সঙ্গী। মানুষ ও প্রাণীরা এর চর্চা করে। কিন্তু কবিতায় যদি লেখকের অবদমন অথবা চরিত্রকে অবদমিত পাঠকের যৌনবাসনার উদ্দেশ্যে পরিবেশিত হয় তবে তা কখনো কখনো অশ্লীল হতে পারে, নাও হতে পারে।  আমার সমকালে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমি মিসোজিনি ও সেক্সিস্ট অ্যাপ্রোচ টের পাই।

 

শুদ্ধস্বর:  বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের বাংলা কবিতা নিয়ে আাপনার নিজস্ব মূল্যায়ন/ বিশ্লেষণ জানতে চাই। এটা যে কোনো সময় ধরে হতে পারে, আপনার যেমন ইচ্ছে।

মামুন অর রশীদ: জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আল মাহমুদের কবিতা আমার ভালো লাগে। আমার মনে হয়, বাংলা কবিতা দুই হাজার সালের আগে স্বর্ণ এমনকি রৌপ্যযুগ ফেলে এসেছে। আগে লেটারপ্রেসের যুগে সে সাধনা, প্রুফ, সম্পাদনা হয়ে কবিতা প্রকাশিত হতো। তাতে সংখ্যায় কম হলেও কবিতা শিল্প হিসেবে একটা মান রক্ষা করতো। এখন ওয়েবে মুক্তপ্রকাশের যুগ। সবাই লিখছে, সবাই সার্টিফিকেট দিচ্ছে।  লেটারপ্রেসের যুগের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কবিতার জনমানসের পৌঁছানোর ক্ষমতা বেড়েছে, তবে গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। কবিতা শিল্পের ভোক্তা চিত্রকলার ভোক্তার সমপর্যায়ে চলে এসেছে, মানে কমেছে। দুই বাংলার কবিতার ক্ষেত্রেই একথা সত্য।  তবে ভার্চুয়াল দুনিয়াতে একটা সমস্বরে অনেক প্রচারণ দেখি। আমার কাছে সেগুলো  চিৎকার মনে হয়। এই চিৎকারের ফলে মানুষের কাছে সেই চিৎকারীদের কবিতা পৌঁছায় না।

কী রাজনৈতিক সমকালীন কবিতা, কী ধ্রুপদী ভাবনার কবিতা, কী উইট-হিউমার-দুষ্টামি ভরা কবিতা সবকিছুতেই এই বিশ বছরে মনে রাখার মতো কম কবিতা পেয়েছি।  এখনো তারাপদ রায়ের ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’ বা আবুল হাসানের ‘তবে কি বউটি রাজহাঁস?’  আমাকে টানে। ব্রাত্য রাইসুর বড়লোকদের সঙ্গে আমি মিশতে চাই কবিতার মকারি, আর ইমতিয়াজ মাহমুদের উইট-ফিলসফি-অন্ত্যমিল ভালো লেগেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সমকালীন কবিতার চেয়ে গানের লিরিকগুলো বেশি কবিতা মনে হয়, উৎকৃষ্ট শিল্প মনে হয়, তা সুমন-অঞ্জনের লিরিক বা সৃজিতের সিনেমার লিরিক যাই হোক। তবে সবমিলিয়ে এই বিশ-বাইশ বছরে আমির আজিজের মতো ‘সব ইয়াদ রাখা জায়েগা’ কবিতা কই, দুই বাংলায়?

 

শুদ্ধস্বর: খুব সাম্প্রতিক সময়ে আপনার পাঠ অভিজ্ঞতা (যে কোনো বই বা লেখা) নিয়ে কিছু বলুন।

মামুন অর রশীদ: ইউভাল নোয়াহ হারারির ‘স্যাপিয়েন্স: অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব হিউমানকাইন্ড’ বইটা আমাকে খুব আঘাত করেছে। চিন্তার ও দেখার দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বইটি দারুণ, মানুষের বিবর্তনের আর অন্য সব বই থেকে আলাদা।  আর শিকাগোর অধ্যাপক থিবো দুবের ইন দ্য শ্যাড অব দ্য গোল্ডেন প্যালেস চমৎকৃত করেছে। বাংলা কাব্যতত্ত্বের জন্য চমৎকার বই এটি। বইটর রিভিউ লিখছি, আগ্রহীদের পড়তে আমি রিকমান্ড করি। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য নিয়ে এমন বই আর নাই।

 

 

কবিতা: 

১.

মানুষের কাছে আমার কোনো প্রত্যাশা নেই। এমনকী

বারান্দার টবে বেড়ে ওঠা ফার্নটির ওপরও নেই। একটা

টেবিলের ওপর ভীষণ ভরসা ছিল আমার, একদিন সে

বোঝালো ভার বইবার দায় নেই তার। যেকয়টা বিড়াল

নিয়ে দিন কাটতো, একটা গেল মরে এক শীতের সকালে।

আর কটা কার কার বাসায় আছে জানি না।

যে গাছগুলো আমার সবুজ আর প্রশান্তি দেওয়ার কথা

ছিল ওরা কেমন ধূসর আর ফ্যাকাশে হয়ে থাকে বছরের

বেশির ভাগ দিন। আমি যে বৃদ্ধকে মালী ভেবেছি এতদিন

সে মূলত কাঠুরিয়া আর চারাগাছের দিকে চেয়ে সে চুলার

জ্বালানির হিসেব করে। যে ভেড়াগুলোর জীবন আমার

জীবনের সঙ্গে মিলিয়েছিলাম, ওদের খাসী হিসেবে

কেজি দরে কিনে নিয়ে গিয়েছে বাসস্ট্যান্ডের রেস্তোরাঁর ম্যানেজার।

আম্মা যেসব স্বর্ণবণিকদের কানের দুলের নকশা সুন্দর বলেছিল,

ওরা এখন পলাতক। আইপিএলের জুয়ায় হেরে ফিরবে আর

অলংকার বানাবে না। শৈশবের হাঁসগুলোকে যে শ্যাওলা রঙা

পুকুরটায় দেখতাম, সেখানে একটা মসজিদ হয়েছে, তার পাশে

টাইলসের দোকান।

মানুষের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই, তোমার কাছেও।

 

২.

সুপুরুষ প্রেমিকদের সঙ্গে পাল্লা দিতে যাইনি, আর আত্মম্ভরী কবিদের সঙ্গেও নামিনি কম্পিটিশনে, এমনকি রাঙা যুবতীদের মাতৃজ্ঞান করে বিশুদ্ধ উচ্চারণে আমি আম্মা ডেকেছি। তাঁদের পায়ের কাছে অবনত হাতির শুড়ের মতো দমিয়ে রেখেছি পৌরুষ। যেহেতু আমার সমস্ত অরগ্যান ভদ্রবালকের মতো শাসিত। কারণ দুধের কথা বললে দোলনচাঁপার রঙ ভেসে ওঠে আমার মনে।

আর সবর্দা যত্ন করে অ্যাপলিটিক্যাল থেকেছি যেন সব রাজার আমলে ভালো থাকি। সকালে উঠে আমি মনে মনে বলতে থাকি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। ডাইনিং টেবিলেও মাছের সবচেয়ে ছোট পিস আর তলানির ঝোল নিয়ে থাকি যেন কারো না-বলা ঈর্ষায় হাশরের দিন ঝামেলায় পড়ে যাই।

আর প্রায়শই ভদ্রগোছের কুকুরদের কাছে কৃতজ্ঞতা শিখতে গিয়ে দূরে গিয়েছি মানুষের। একসময় যে উড়তে চেয়েছিলাম এখন আর উড়বার কথা মনে পড়ে না, যেহেতু ডানাগুলো গলে গ্যাছে তাই সূর্য থেকে দূরে থাকি, আলো থেকেও।

 

৩.

মানুষকে মুগ্ধ করার বাসনা মরে যাওয়ার পর, আমি প্রায়ই কাঁচাবাজারে যাই। সবজির বাজার পেরিয়ে যে ছেলেগুলো ফার্মের মুরগি জবাই করে ড্রেসিং করতে দুই টাকা নেয় প্রতি পিস, তাদের পাশে বসে থাকি। আমি তাদের আদর করে হত্যা করার বুদ্ধি দিতে আর যথেষ্ট অনুশোচনা তৈরির ‍জন্য বসে থাকতাম। কিন্তু ওরা জানে হন্তারক না হলে নিজে বাঁচা যায় না। ফলে আমাদের ডাইনিং টেবিল যে কয়েকটা হত্যা ব্যতীত শোভিত হয় না- এই কথা ওরা আমাকে কখনো বলেনি।

কিন্তু আমি এই হিপোক্রেসি আমলে নিয়ে স্টিললাইফ পেইন্টারের পাশে বসে থাকি। ওরা কাচের বোতল, দু একটা আপেল আর নেতিয়ে যাওয়া পাতা নিয়ে কাজ করে। ওদের পাশে বসে আমি সিভিলাইজড হওয়ার চেষ্টা করি। ভাবি, মানুষকে মুগ্ধ করার বাসনা মরে যাওয়ার পর আমি কেমন প্রশান্ত হয়ে গেছি। চশমার বাইরে সৌম, স্থির।

কিন্তু তোমার সাইনবোর্ডের মতো উৎসবমুখর আলিঙ্গনের ছবি আমাকে কাঁচাবাজারে নিয়ে যায়। সেখানে আমি সেই বালকদের সঙ্গে বসে থাকি।

 

৪.

দাদি আর নানির কথা মনে করার চেষ্টা করেছি সারাদিন। তাঁরা কীভাবে কথা বলতেন, সে দৃশ্য মনে করার চেষ্টা করেছি। যদিও চুপ থাকার বাইরে আর কোনো মুখের ছবি ভেসে আসছে না। তারা রান্নার কড়াইয়ের টেংরা আর বাইম মাছগুলোর ডিস্ট্রিবিউনের বাইরে আর কী ভাবতেন। মেয়েদের দিয়ে দেওয়ার তাদের ঔজ্জ্বল্য হারানো কানপাশা দেখতে কেমন ছিল—মনে আসছে না। মায়ের কাছে শুনেছিলাম, আমাদের জন্মানোর পর শিশুলালনে আমার মার অনভিজ্ঞতার অভিযোগে নানি ভীষণ চুপ ছিলেন, তেমনি ফুফুর বিষয়ে দাদি। চুপ থাকার বাইরে আর কোনো ছবি মনে আসছে না। তারা যখন বেড়ে উঠেছিলেন, ধরে নিচ্ছি তখন ব্রিটিশ আমল, ছিপছিপে গড়ন আর ছিপাড়া পড়তে পড়তে সংসার শুরু করে শিখেছিলেন, চুপ থাকা।

আজ সারাদিন এই রোজ ডেতে তাদের চুপ থাকা মুখের বাইরে আর কিছু মনে পড়ছে না।

 

৫.

এই অনন্ত জেগে থাকা মানে

স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে

তোমাকে পাওয়ার বাসনা

 

৬.

দূরত্ব

তোমার সঙ্গে যেসব কথা হতে পারে

কোন রঙের টিপ তোমাকে বেশি ভালো লাগে,

করোনা চলে গেলে জাভা সাগরের কোন দ্বীপে বেড়াতে যাব

স্টারবাকস খুললে কফিকাপে তোমার আমার শর্ট কীভাবে লেখা হবে

তুমি আজকে যে পারফিউমটা ইউজ করছো সেটা পাগল করার মতো।

তোমার সঙ্গে যেসব কথা হয়

ব্যাসিনের কল ঠিক করার মিস্ত্রি কোথায় পাওয়া যাবে?

পাসপোর্টের কি কোনো স্ক্যান কপি করা হয়েছিল

ভ্যানওয়ালার ক্যাপসিকাম থেকে সুপারস্টোরেরগুলো কত উন্নত

গরমের দিনে আরামদায়ক মোজার দাম কত হতে পারে

জার্নাল

 

৭.

যেহেতু তুমি বলেছ, চুপ থাকতে আর ফ্রিজ ভরে রাখতে কাঁচাবাজারে

তাই আমি মূলত চৈত্র-সংক্রান্তিতে যেসব ফুল মরে যায়, তাদের কথা

যেসব পাখিরা ইন্সটাগ্রামিক হয়ে উঠেছে, তাদের কথা বলি। আর

কোপা দেল রেও ফিরে এসেছে বার্সায়- আমাদের ড্রয়িংরুম জুড়ে

আনন্দের শেষ নেই। আজ ওভেন বেকড পাস্তা হবে তাই এই সব মৃত্যুর

ভেতর ঢুকব না। তবে যারা চলে যাচ্ছে তাদের সুন্দর ছবিগুলো পোস্ট

করব আর টাইমলাইনজুড়ে যারা কাঁদতে চাইবে তাদের বাঁধা দিব না।

তুমি বলেছ চুপ থাকতে, আমি তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হুট করে একটা

কামান নষ্ট হওয়ার কারণ বের করার চেষ্টা করছি। আর নেটফ্লিক্সে কী দারুণ

উড়ন্ত মাছেদের একটা ডকু বের করেছে। যেহেতু কোথাও কিছু ঘটছে না,

আমি আর তুমি সেইসব মাছের সঙ্গে উড়তে যাব।

অথচ তুমি বলেছে ইস্তানবুল যাবে, সেখানে দশপদের কেবাব আর বাকলাভা

খাব, তুমি আয়া সোফিয়ায় সামনে ছবি তুলবে, এরপর নামায পড়ব আর

এই পিকচারেস্ক প্রার্থনা নিয়ে ব্লগ লিখব। তারপর আর সেখান থেকে চলে

যাব কাপাদোসিয়ায়। সেখানের বেলুন উড়ব আর মদ খাব আর বিকালে

রাস্তায় চুমু খাব যেহেতু ফ্রাস্টেটেড বাঙালি আমাদের রি রি করতে খুঁজে পাবে না।

যদি আমাদের পুরনো আক্ষেপগুলো মনে আসে, তবে সারারাত মদ খেতে খেতে

কনফেশন আর জড়িয়ে কান্নাকাটি করব। সকাল বেলা আবার আমরা ভালো

মুসলমান হয়ে উঠব।

যেহেতু তুমি বলেছ, চুপ থাকতে এর বেশি আর কিছু বলব না।

 

More Posts From this Author:

    None Found

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top